পাহাড়ের দুই পাশে দুইটা সৈকত। পাথুরে গা বেয়ে তর তর করে নেমে গেলাম এক দিকের বীচে। একটু দ্বিধা করে দামি স্যান্ডেলটা খুলে হাতে নিলাম। সাদা স্কার্টে বালু লাগবে মন মানতে চাইছিল না। তাই বাতাসের সাথে যুদ্ধ করতে করতে বালু ধরে একটু হাঁটলাম। প্রথমে শুকনো বালি, তারপরে ভেজা... তারপরে, হঠাৎই একটা দুষ্টু ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিয়ে গেল আমার বেশ খানিকটা। ব্যাস, আড় ভেঙে গেছে! এই বিকেলে হাঁটুর বেশি ভিজানো সম্ভব না বলে ওতটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো।
একটু পরে, কনে দেখা আলোতে তীব্র বাতাসের ডাকাতির সাথে পাল্লা দিয়ে ওড়না সামলে দেখছিলাম সাগর। আমি বিমুগ্ধ। কয়েক ঘন্টায় চেহারা পাল্টে গেল যে! কনে দেখা আলোতে প্রকৃতির সাথে পাল্লা দিয়ে সাগরকেও এত সুন্দর দেখায়! নীল সাগরটার উপরে কেউ সোনালী জরির গুড়ো ছিটিয়ে দিয়েছে... ঢেউয়ের তালে তালে সেগুলো নাচছে...
প্রথমে ঢেউ ঘেষে মীরার হাত জড়িয়ে অনেকদূর হাঁটতে হাঁটতে চললো গানের পালা।
"আমি শুনেছি সেদিন তুমি
সাগরের ঢেউয়ে চেপে
নীল জল দিগন্ত ছুঁয়ে এসেছ... " গানটার সুর সহ সব যেন এই মুহূর্তের জন্যই লিখা।
তারপরে, কাঠের বেঞ্চিগুলোতে বসে চললো প্রিয় মানুষদের ডাকার পালা, মনে মনে, মুঠো ফোনে।
এত ঠান্ডার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। সন্ধ্যার আগে সবার যখন জমে যাওয়ার উপক্রম, তখন বাসায় ফিরলাম। উদ্দেশ্য, রাতে খেয়ে দেয়ে আবার আসবো বীচে। সেটা হলো না। মাহমুদ আঙ্কেল ভয় ধরিয়ে দিল, কিছুদিন আগে নাকি ওখানে খুন হয়েছে। ততক্ষনে রাত দশটা বাজে। খুন হওয়ার আদর্শ সময়।
রাতের না পাওয়াটা মিটাতেই পরের দিন সাগর দর্শনে গেলাম ফজর পড়ে সাথে সাথেই। সে এক অন্য রকম পরাবাস্তবতা। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় সাগর অনেক শান্ত। বীচের মসৃণ বালু দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে দক্ষ কারিগরের হাতে সিমেন্টের ঢালাই করা প্রান্তর... একটুও ভাঁজ নেই, পদচিহ্ন নেই, পুরোপুরি ভার্জিন। কারো স্পর্শ পড়ে নি যে! পূব দিক থেকে একটু একটু সূর্য উঠে সাগরের রং বদলে দিচ্ছিল প্রতি মুহূর্তে। তেরছা আলোয় বিকেলের কনে দেখা আলোর সাগরের চেয়ে একদম অন্য রকম দেখাচ্ছিল সাগরটাকে।
হাঁটতে হাঁটতে এক পাশের পাথরে উঠলাম, জোয়ার উঠলেই যেগুলোতে যাওয়ার উপায় থাকে না। উঠেই চমক। সাগরের দুর্দান্ত ঢেউগুলো পাথরে এসে আছড়ে পড়ছে সাদা ফেনা তুলে। প্রান্তে দাঁড়ালেই সারা গা ভিজে যায় এক ঝলক পানিতে। সুখের শিহরনে গায়ে কাঁটা দেয়। সাথে সাগরের গান, পুরো ব্যাপারটাকে পূর্ণতা দেয়। ছবিগুলো দেখে কান্না পাচ্ছিলো... আসল ঘটনার সিকি ভাগও আসে নি। ভাষাকেও কেমন দুর্বল মনে হচ্ছে। পুরো কনটেক্সটা যদি কোন ভাবে প্যাকেট করে আনা যেত, তাহলে তাই যে এনে ব্লগে ভুস করে ছেড়ে দিতাম! এত সুন্দরকে একা একা দেখা যায়? না উপভোগ করা যায়?
সারা গা ভিজে গিয়েছিল তখনই। তবু পেটে টান পড়তেই বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। একটু পরে এসে সাগরে আদরে ডুবাবো নিজেকে! সে গল্প হবে পরের পর্বে...
(ওহ, সৌন্দর্যে অবগাহনে এত ব্যস্ত ছিলাম, যে ক্যামেরা হাতে নিতে ইচ্ছাই করছিল না। বেশির ভাগ ছবি মীরা আর ভাইয়ার তোলা। তাই কোন ছবির কপি রাইট মামলায় হেরে গেলে নামিয়ে ফেলতেও হতে পারে। আগাম ক্ষমাপ্রার্থী।)
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জানুয়ারি, ২০০৭ রাত ২:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






