যাচ্ছিলাম ন্যান্ডোজে। খাব দুপুরে। আগের বার খেয়ে আমার শিক্ষা হয়েছে, খাবার শেষ করতে খুব কষ্ট হয়েছে, শেষ মেষ পারিই নি। এবার তাই শুধু বার্গার অর্ডার দিলাম। কিন্তু ন্যাডুর অর্ডার আসার পরে আমাদের চক্ষু চড়ক গাছ, বার্গার, সাথে এক গাদা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, আর ইয়া বড় বাটি ভর্তি লতা পাতা মেশানো সালাদ এবং আরও মুর্গি। টেবিলে জায়গায় হয় না আর। ইশি বলেই ফেলল, 'য়ু গট অল দ্যাট?' ন্যাডু ভীষণ রাগ, কারণ অর্ডার নিয়ে আসা কিউট ছেলেটা সেটা শুনে হাসি চাপতে চাপতে গেল। ও একটু পর পর ঘাড় ঘুরিয়ে বলছে, 'আরে, কি কিউট একটা ছেলে, মেরে দিলি তো মান ইজ্জ্বত সব কিছু। এমনও হতে পারত, আমাকে আস্ক করতে পারতো, উইল য়ু বি মাই ভ্যালেন্টাইন?'
- ছেলেটা কিউট কোথথেকে রে? ঘাড় পর্যন্ত সিল্কি চুল মেয়েদের মত!
- চুপ, ওরে নিয়ে একটা কথাও বলবি না!
প্রথমে একটু মন খারাপ হয়েছিল, মানুষ বেশি। কিন্তু ইমু মনে করিয়ে দিল, কেউ বেশিক্ষণ থাকবে না, আমাদের চিৎকার চেঁচামেঁচিতে পারবে না। আসলেই চলে গেল পিছনের মেয়েগুলো। কিন্তু ও পাশে এক ভদ্রলোক নিতান্তই ভদ্রভাবে নিজ মনে খেয়ে যাচ্ছে টুক টুক। আমি তো বাবা চেষ্টা করছিলাম তাও ভদ্র ভাবে খেতে, পেটের ক্ষুধার আগুন তবুও। কিন্তু ন্যাডু? সালাদের বাটির উপর হামলে পড়লো, 'এই আমি পাতা খামু, ইমু ছবি তোল'! কাঁটা চামচে এক লেটুস পাতা, বাসিল ফাসিল তুলে নিবিষ্ট মনে খেতে লাগত কচ কচ। সাথে সালাদ ড্রেসিং প্যাকেট দেখে বলে, 'দোস্ত, তোদের এই সস দেয় নাই না? দেখছস, আমি বেশি দামী অর্ডার দিছি দেখে খালি আমারে দিছে।' বেশি হাসি পাওয়ার কারণ হল, ওর কথা গুলো ভাড়ামি না, বেচারী সত্যিই যা ভাবে তাই বলে।
বার্গারের জন্য যথেষ্ট বড় হা করতে কষ্ট হচ্ছিল আমারও। ন্যাডুর রাগ গিয়ে পড়ল পিছনের ওই ভদ্রলোকের উপর, এত ভদ্রতা করে খাওয়ার কি আছে? আচ্ছা, আমিও ভদ্র হয়ে যাবো--দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ন্যাডু ছুরি ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ছোট ছোট টুকরা করে কাটা চামচ দিয়ে আস্তে আস্তে মুখে ঢুকাতে লাগল। ইশি কি বলতেই নাহিদ গালি দিয়ে উঠল, 'এটা কি বলিস কুত্তা!' সাথে সাথে ইশির অভিমান ভরা প্রতিবাদ, 'এই তোরে না বলছি আমাকে মানুষের সামনে কুত্তা বলবি না, শয়তান?'
ইশি একটা ফাস্ট ফুড শপে কাজ করছে যেখানে বেশির ভাগ কর্মচারীই বাঙালী ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট। বাংলার বেশ ভালোই উন্নতি হয়েছে দেখলাম। 'র' কে 'ড়' বলছে না আর। কাজের কথা বলছিল তখন বুঝলাম আমার আর এই মেয়েটার কত্ত মিল। কাজে নাকি ম্যানেজার বাঙালী ভাইয়াটা (যার মডারেট সাইজের ভুড়ি আছে তাই ন্যাডু ডাকে পেট্টু) ওকে প্রায়েই ঠাট্টার ভাব করে নানা কথা বলে আর ও ক্ষেপে টেপে লেকচার শুরু করে দেয়। একবার হালাল খাবার নিয়ে কি বলতে ও তিন পেইজ প্রিন্ট আউট নিয়ে গেছে ভদ্রলোককে শিক্ষিত করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞায়। ইশি হাসতে হাসতে বলছে, সবচেয়ে মেজাজ খারাপ হয় যখন বুঝি আমাকে ক্ষেপায় ওই ব্যাটা খুব মজা পায়! আমি হেসে ফেললাম, তোর দু:খ আমি বুঝি!
হঠাৎ ন্যাডুর চোখ বড় বড়, বলে, দোস্ত, আমার টয়লেটে যাওয়া দরকার। কিন্তু ওখানে টয়লেটের দেখি একটাই দরজা। এখানে [ইটালিক]ফিমেইল[/ইটালিক] আর [ইটালিক]ওমেনদের[/ইটালিক] আলাদা টয়লেট নাই?
বাসায় ফেরার পথে আশে পাশের জনগণের হাতে ফুল গুণতে গুণতে যাচ্ছিলাম। কার হাতের ফুল কত বেশি সুন্দর? ফুল গ্রহীতার হাতে ফুল মানাচ্ছে তো? এই থেকে কখন বিয়েতে চলে গেল কথা বার্তা! ন্যাডুর মজা হল, ও এমনি ফাইজলামি করলেও বিয়ের কথায় নিদারুণ লজ্জা পায়! আমরা যতই চেপে ধরি ও ততই কান চেপে চিৎকার, 'আস্তাগফিরুল্লাহ, ছিহ, আমি বিয়ে করব না।' আমরা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাই। ওর জামাইটা খুব ভাগ্যবান হবে, একটু ধৈর্য্যশীল হলেই হবে, কখখনও বোরড হবে না, টিভি টুভির দরকার নাই!
বাসে খুব ভিড়। দাঁড়িয়ে আছি সবাই, এক একবার বাস থামে সবাই হুড়মুড় করে সামনের দিকে পড়ি। একজন উঠে যেতেই আমার কাছের খালি সিটটায় আমি বসে পড়লাম। সাথে সাথে নাহিদ চিৎকার, ওই কই বসলি? এদিকে আয়, এদিকে আয় বলতেছি। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দেখলাম দুই পাশে দুই ভারতীয় চেহারার যুবক। আরে বাবা, আমি কি অত দেখেছি? উঠে আসতেই ন্যাডুর মন্তব্য, 'তোর শেষ মেষ পছন্দ হইল ওই বুড়া ব্যাটা কে?' আমি বিব্রত, বাঙালী হলে কি হবে?!! হালকা স্বরে বললাম, 'আরে গাধা, পছন্দ হইলেই তো কাঁপাকাঁপির চোটে ওখানে বসতেই পারতাম না!'
সেন্ট্রালে গিয়েই সিদ্ধান্ত নিল ন্যাডু, আমাদের সবাইকে ফুল কিনে দিবে। 'আরে দোস্ত, আর কেউ ফুল দিচ্ছে না সো হোয়াট, আমি আছি না?' ফুলের দোকানে তো রমরমা অবস্থা। এডি এভিনিউয়ের দোকানে মানুষ উপচে পড়ছে। এক পাশে দেখলাম একটা মরিচ গাছে অনেক গুলো ঝুলন্ত মরিচ, সেটা সুন্দর রঙিন কাগজে মোড়ানো, দাম ঝুলানো পঁচিশ ডলার। বুঝলাম না, মরিচ গাছ মানুষ ডালিংকে গি্লফট করবে ক্যান? জিজ্ঞাসা করলাম ওদের, 'এর মানে কি? য়ু আর এজ হট এজ রেড চিলি?' ব্যাখ্যাটা সবার মন:পূত হলো!
দাম দেখে শিউরে উঠলাম, গলা কাটা দাম ফুলগুলোর! কিন্তু ন্যাডু ছাড়বে না, ফুল দিয়েই ছাড়বে। অগত্যা অনেক বেছে চমৎকার একটা হলুদ গোলাপ নিলাম। হলুদ গোলাপ নাকি বন্ধুত্বের প্রতীক। এমনিই হলুদ গোলাপ আমার অসাধারণ লাগে, তাছাড়া মনে ভয়--'পাছে লোকে কিছু বলে'! ইশি হলুদ, ন্যাডু গোলাপী আর ইমু লাল টকটকে গোলাপ নিল। দোকানওয়ালা অ্যাসিস্টেন্টকে বলছে, 'এই চারটা গোলাপ সুন্দর করে র্যাপ করে দাও এই ইয়াং লেডিগুলোর জন্য। প্রাপক চারজন গর্জিয়াস ছেলে।' আমরা হেসে ফেললাম। আমাদের কথা বার্তা শুনে সবাই বুঝেছে আমরা নিজেদের জন্যই ফুল কিনছি তাই আশে পাশের মানুষেরাও মুখ টিপে টিপে হাসতে লাগল।
সবার থেকে বিদায় নিয়ে, ক্লান্ত আমি ট্রেইনে এক ঘন্টার লম্বা ঘুম দিয়ে বাসার কাছাকাছি এসে স্টেশন থেকে নামলাম। বিকেলের সোনা রোদে হাতের গোলাপটা দুলিয়ে দুলিয়ে হাঁটছি আমি, মন ফুরফুরে। নির্জন কার পার্ক। হঠাৎ কোথুকে এক দঙ্গল টিনেজ পোলা আসল। আমার উলটা দিক থেকে আসতে আসতে গান ধরল, 'টেল মি বেইবী...'। বেইবী তে সে কি টান!
গম্ভীর মুখ করে ছেলেগুলোকে পার হতেই ফিক করে হেসে ফেললাম।রাত বারোটা একে দিনটা শুরু হয়েছিল বিশ্ব ভালবাসা মাখা এসএমএসে:
"তুমি তোমার মনের মত একজন অসাধারন মানুষের সম্পূর্ণ ভালবাসায় সারা জীবন সিক্ত হও এই কামনা করি"।
ম্যাসেজ দাতার আন্তরিকতার জন্যই চোখে জল এসেছিল। সুন্দর দিনটা শেষ করলাম আমার সব প্রিয় মানুষদের জন্য এই কামনা করে।
'সম্পূর্ণ ভালবাসা', একটুও কমে হবে না যে!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
