somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দি গ্যাপ = মাইনকা চিপা?

২১ শে এপ্রিল, ২০০৬ রাত ১:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শরতের মেঘহীন নীল, নীল আকাশ। সাদার ছিটে ফোঁটা মুক্ত সুষম নীলটা দেখে হঠাৎ অপার্থিব মনে হয়। গাঢ় নীল রং হালকা হয়ে এসেছে দিগন্তে। তারপরে সাগরের সাথে মিশেছে। উহু, মিশেছে বললে ভুল হবে। কারণ নীল সাগর আর নীল আকাশের মধ্যে পার্থক্যটা খুব স্পষ্ট। পিচ্চিরা যেমন হাত আসার আগ পর্যন্ত স্কেল বসিয়ে সব অাঁকে--গাছ, দিগন্তের সীমারেখা, ঠিক তেমন... মনে হচ্ছে কেউ স্কেল বসিয়ে সুনিপুণ সরল রেখা টেনে সাগরের সীমানা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। সীমানার এক পাশে নীল আকাশ। অন্য পাশে সুবিশাল সমুদ্র। ভীষণ নীল আকাশের প্রতিবিম্ব হয়ে সাগরটা খুব নীল। খেয়াল করেছেন, আকাশের সাথে সাথে যে সাগরের রং্ বদলায়? আজ সুনীল আকাশের সাথে পাল্লা দিয়ে তাই সাগরের জল প্রচন্ড নীল। সেই জলে কেমন হিসেবী ঢেউ। ক্র্যাপ করা কাপড়ের মত। খুব দুর থেকে শান্ত, ভদ্র সাগর বলে ভ্রম হয়।
এই শান্ত সাগরটাই আসল প্রমত্ত রূপ নিয়ে আছড়ে পড়ছে উপকূলের পাহাড়ের গোড়ায়। প্রচন্ড ক্ষোভের প্রকাশ ঘটছে সাদা সাদা ফেনায় আর কানে তালা লাগানো গর্জনে। পাহাড়টাও উদ্ধত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদম খাঁড়া হয়ে উঠে গেছে অনেকটুকু। স্যান্ডস্টোনের পাহাড়ের ক্ষয়ে যাওয়া ধার দেখে মনে হয়ে খুব যত্ন আর প্ল্যান করে করা কোন ভাস্কর্য। পাহাড় না ঠিক, অন্তরীপ। ডিকশনারীতে হেডল্যান্ডের অনুবাদ হিসেবে তাই দেয়া। তো অন্তরীপ, মূল ভূমি থেকে বাড়ানো অংশ, যার পরেই খাদ এবং নিচে অসীম সমুদ্র, তেমনি এক জায়গা থেকে প্রকৃতির বিশালত্বে হারিয়ে যাচ্ছিলাম আমি। যদিও পাহাড়ের ধারে রেইলিং দেয়া, আমি ছিলাম রেইলিঙের একদম পাশে পনের ফুট উঁচু স্যান্ডস্টোনের একটা পাথরে পা ঝুলিয়ে (স্কার্ট পড়ে পাথরটাতে উঠতে একটু কসরত করতে হয়েছে হে হে)। পাথরের কিনারায় পা এমন ভাবে ঝুলিয়ে বসে ছিলাম, যেখান থেকে পায়ের অনেক নিচে শুধু অনন্ত সমুদ্র দেখা যাচ্ছিল। নিচে তাকালে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে।
জায়গাটার নাম দি গ্যাপ। নামটার মধ্যেই একটা "ফাঁদ ফাঁদ" ভাব আছে। বাংলা করার চেষ্টায় প্রথম মাথায় আসলো 'মাইনকা চিপা'। এতো খোলা, সুন্দর জায়গার এমন নামকরণের পিছনে বেশ রক্তাক্ত ইতিহাস। উনিশ শতকের এক ঝড়ের রাতে যাত্রী বোঝাই জাহাজ এই জায়গায় এসে চোরা-পাথরে ধাক্কা খেয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। জাহাজের মোট একশ বাইশ জনের মধ্যে শুধু একজন জীবিত হয়ে কূলে উঠতে পেরেছে। ্ওই একশ একুশ জনের অভিশাপ এখনও জায়গাটাকে ছেড়ে যায় নি। 'দি গ্যাপ' জায়গাটা এখন কুখ্যাত "সুইসাইড স্পট" হিসেবে। এখানে এসেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ আত্মহত্যা করে... বুঝি না আমি, এত সুন্দর প্রকৃতি ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করে কি করে? ঘুরতে ঘুরতে দেখি এক জায়গায় রেইলিং ভাঙা (দ্রষ্টব্য ছবি)। আমাদের কন্সপাইরেসি থিওরি... এখান দিয়ে ঢুকেই মানুষ রওনা দেয় পরোপারের উদ্দেশ্যে... আপনাদের কারো ইচ্ছা থাকলে বলতে পারেন, দেখিয়ে দিব কোথায়...
সে যাক গে, আমরা পাঁচ জন--মা-বাবা-আমি-ভাইয়া-ছোটবোন সারা দিন কাটিয়ে দিলাম এখানেই। স্যান্ডস্টোনের বিশাল পাথরে গা এলিয়ে দিয়ে প্রচন্ড বাতাস আর সূর্যের মিষ্টি আলো গায়ে মেখে, নীল-জল-দিগন্তে চোখ রেখে। আমাদের প্ল্যান ছিল তিন দিনের ছুটিতে উপকূলীয় শহর পোর্ট ম্যাকওরিতে যাওয়া, কিন্তু বেরসিক আবহাওয়া বাগড়া দিল। তাই আজ সারা দিন সাগরের কাছাকাছি কাটিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে চলে এসেছি। অনেক স্মৃতিচারণ, গল্প, আড্ডাবাজী, চর্বিতচরণ চলল। মাঝে গান গেয়ে জনগণকে সন্তুষ্ট করতে হল। প্রকৃতির কাছাকাছি আসলে যা হয় আর কি, মন বেশি বিশাল হয়ে যায়। তাই মায়ের উদ্দেশ্যে নিবেদিত বাবার বেসুরে গলার গানকেও আমরা হাসিমুখে মেনে নিলাম।
সূর্য একটু হেলে পড়ার পরে আমরা নেমে এলাম। বিপুল বিষ্ময় এবং আনন্দের সাথে আবিষ্কার করলাম, সেখানেও হালাল খাবারের দোকান। আরবদের ধন্যবাদ... হাপুশ হুপুশ করে খেয়ে নিলাম। সাগরের বাতাস নাকি ক্ষুধা বাড়ায়, সত্যতা বুঝলাম।
অযু করার জন্য বাথরুমে গিয়ে দেখি সবগুলো টয়লেট বন্ধ। আমি অপেক্ষা করছিলাম বড় টয়লেটটা খালি হওয়ার জন্য, সেখানে ভিতরে বেসিন আছে। যদিও বাইরে দু'টো বেসিন আছে কিন্তু সেখানে সবার সামনে অযুর উদ্দেশ্যে পা তুলার প্রশ্নই আসে না। বিভৎস! আমি অপেক্ষা করতে করতেই একটা মা আসলো চার/পাঁচ বছরের একটা পিচ্চিকে নিয়ে। এর কিছুক্ষন পরেই ছোট একটা টয়লেট খালি হল, যেখানে ভিতরে বেসিন নেই। আমি আগে এসেছি আমার আগে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু মহিলাটাকে যেতে অনুরোধ করলাম। পিচ্চিটা শুনি যাওয়ার পথে মাকে বলছে, "এভরি ওয়ান ইজ নাইস এরাউন্ড হিয়ার, আরেন্ট দে?" ছোটদের এই ব্যপারটা আমাকে বার বার বিষ্মিত করে, ঈর্ষান্বিত করে। এত সহজে মানুষকে ভাল পেয়ে বসে! কয়েকদিন ধরেই অনুভব করছিলাম, ব্লগে আমি এত কিসিমের শিক্ষিত কিন্তু কুশিক্ষিত, অশ্লীল এবং অযৌক্তিক মানুষ দেখছি, শিক্ষা যাদের অন্তরে পৌছায়নি এক ফোঁটা... আমি এই মানুষগুলোর আসল চেহারা হয়ত সারা জীবনেও দেখতে পেতাম না সামহোয়্যারে না আসলে। মনটা ভার হয়ে ছিল এসব ভাবনায়। পিচ্চিটার ওই একটা কথা মন ভরে দিল...
দি গ্যাপের পাশেই ওয়াটসন বে। এক চিলতে সৈকত। নীল সাগরে অনেক মাছ ধরার সাদা সাদা নৌকা ভাসছে। সাথে গাঙচিলের উড়োউড়ি। তবে সৈকত একদম খালি। লোভ সামলাতে পারলাম না, স্যান্ডেল হাতে নিয়ে নেমে গেলাম। ভেজা মিহি উষ্ণ বালুতে পায়ের ছাপ রেখে আস্তে আস্তে হাঁটলাম। হঠাৎ হঠাৎ ছোট ছোট ঢেউ এসে পা ধুইয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। সাথে বালুগুলোকেও লুব্ধ করে নিয়ে যাচ্ছিল... পায়ের নিচ থেকে বালু আস্তে আস্তে সরে যাওয়ার সময় সারা শরীরে শিহরণ জাগে...
বিকেল হয়ে আসতে গাড়িতে বোঝাই হয়ে সবাই রওনা দিলাম বাইসেন্টেনিয়াল পার্কে। ছোট একটা লেইকের পাশে অদ্ভুত সুন্দর সবুজ পার্ক। সিডনী আলো করে তখন কনে দেখা আলো। সেই অপার্থিব সুন্দর সময়ে আমরা ক'জন মহোৎসাহে বারবিকিউ করে খেলাম জিভ পুড়িয়ে, ফুঁয়াতে ফুঁয়াতে। খাওয়া শেষ হতে না হতেই সূর্য মামা বিদায় নিল। তখন আসলো দিনের সবচেয়ে সুন্দর অংশটুকু। আলো অাঁধারির খেলা তখন চারিদিকে। সামনে ঝিরঝিরে সুন্দর লেইক। পানি-ছোঁয়া ঠান্ডা বাতাস এসে গা জুড়িয়ে দিচ্ছিল। সেখানেই, নরম সবুজ ঘাসে পা ডুবিয়ে আমরা ক'জন কাছের মানুষ জামাতে নামাজ পড়লাম। বাবা ইমামতি করলেন। প্রিয় একজন মানুষের পিছনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার অনুভতিটা কি যে অসম্ভব তৃপ্তিদায়ক... প্রকৃতির এত কাছাকাছি থেকে প্রকৃতির স্রষ্টার কাছে মাথা নুইয়ে আত্মসমর্পনে কি যে প্রশান্তি... বিশেষত তা যদি হয় প্রিয় মানুষদের সাথে, একাত্ম হয়ে... অসাধারণ...
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে এপ্রিল, ২০০৬ রাত ১:৫৩
৪০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন ভালো না

লিখেছেন সামিয়া, ০৬ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৭



চোরাবালির মতো টেনে ধরা নিঃশব্দ বিকেলে,
অদৃশ্য কিছু হাত ছুঁয়ে যায় ভাঙা স্মৃতির ধূলি,
বেঁচে আছি এইটুক স্বীকারোক্তি,
তোমারে দেখিনা বহুদিন, তবু রয়ে যাও ভীষণ ভুলই।

সমুদ্র ডাকে দূর থেকে নোনা হাওয়ার ভাষায়,
অপেক্ষারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়: সব কিছু ভেঙে পড়ে

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৬ ই মে, ২০২৬ দুপুর ২:২৮


"তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও - আমি এই বাংলার পারে
র’য়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে;
দেখিব খয়েরি ডানা শালিখের..."

জীবনানন্দ দাশ ''রূপসী বাংলা'র কবিতাগুলো বরিশালে তাঁর পৈতৃক বাড়িতে বসে লিখেছিলেন। জীবনানন্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার কারণে দিদি হেরেছন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৬ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩




আপা এপারের হিন্দুদেরকে স্নেহ করতেন তাতে ওপারের হিন্দু খুশী ছিল। আপা ভারতে বেড়াতে গেলে মোদীর আতিথ্যে আপা খুশী। কিন্তু আপার আতিথ্যে দিদি কোন অবদান রাখলেন না। তাতে হিন্দু... ...বাকিটুকু পড়ুন

লেখালিখি হতে পারে আপনার বিক্ষিপ্ত মনকে শান্ত করার খোরাক।

লিখেছেন মাধুকরী মৃণ্ময়, ০৬ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৪:২৯

এই যেমন আমি এখন লিখতে বসছি। সর্বশেষ লিখেছি ২০২১ সালে জুলাই এর দিকে। লিখতে গিয়ে আকাশে বাতাসে তাকাচ্ছি, শব্দ, বিষয় খুজছি। কিন্তু পাচ্ছি না। পাচ্ছি যে না , সেইটাই লিখছি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই মে, ২০২৬ রাত ২:৩৩


নট আউট নোমান ইউটিউব চ্যানেলের ক্রীড়া সাংবাদিক নোমান ভাই একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। বাংলাদেশে এখন আমরা এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে বাস করছি যেখানে প্রকৃত দেশপ্রেমিক আর ভুয়া দেশপ্রেমিকের পার্থক্য করা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×