somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জানি পৌঁছাবেনা এ চিঠি :

০২ রা এপ্রিল, ২০১৫ দুপুর ১২:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজও কি তোমার শহরে হলুদরঙা রোদ ওঠে, চকচকে সোনার মত রোদ ? সে রোদ দেখে কি আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে পাখির ডাকে ভোর হয় ? সকালের সে স্নিগ্ধতা কি আজও আছে ? তুমি কি আজও ছাদে আসো সূর্য্ দেখতে ? নিশ্চয়ই আমার মত তোমাকে কেউ পাগলী বলে ডাকে না। তোমাদের খাঁচার গলায় লাল মালা ওঠা টিয়াপাখিটা কি আজও আধোসুরে ডেকে ওঠে ? তোমাদের দোতলার রেলিং এর ফাঁকা দিয়ে আজও কি তুমি কারও মাথায় জল ছেটাও ? আর যদি ছেটাও সে নিশ্চয়ই আমার মত রেগে যায়না। তোমাদের বাড়ীটার রং-করা দেওয়াল কি এখনও আগের মত স্নিগ্ধ আর মনকাড়া ? বড় দেখতে ইচ্ছে করে তোমায় ? কি করব বল ? অনেক দূর শহরে নির্বাসিত আজ আমি।
মনে আছে তোমার সেই ছোট্টবাটের প্রিয় ছাতাটার কথা ? তুমি কখনও কাছছাড়া করতেনা। একদিন কলেজে আমি নিয়েছিলাম বলে অনেক রেগে ছুড়ে ফেলেছিলে। আমি ভিজে গেছিলাম। আমার সদ্য কেনা লাল কাগজে জড়ানো প্রিয় লেখকের গল্পের বইয়ের রং আর গন্ধ ধুয়ে গেছিল সেদিন। আমি রাগতে গিয়েও তোমার চোখের দিকে অপলকে তাকিয়ে থেকেছি। বইখানা অনেক কষ্টে পকেট খরচ বাঁচিয়ে তোমার জন্যে কিনেছিলাম। অনেক না খাওয়া দুপুরের গল্প লুকিয়েছিল ওটাতে। তুমি সেই অনাহারী আর্তনাদের দিকে কর্ণপাত না করে প্রিয় ছাতার জন্যে কতইনা বকলে আমায়। বইখানা আমার করুন চোখের দিকে তাকিয়ে বিনাপ্রতিবাদে নিজেকে বিলিয়ে দিল নিষ্ঠুর বৃষ্টিতে। তখন আমার চোখেও বৃষ্টি ছিল, তপ্ত, যার সাথে প্রকৃতির নিষ্ঠুর বরফশীতলতাময় বৃষ্টির পার্থ্ক্য তোমার উদাসীন চোখে ধরাও পড়ল না। এখনও কি তোমার শহরে বৃস্টি হয়? আজও কি তোমার কোনও প্রিয় ছোট্টবাটের ছাতা আছে ? সেটা যদি কেও নেয় তাকে আর বোক না। তার সাথে বৃষ্টিতে ভিজো। তার প্রিয় বইখানাকে বৃষ্টিতে ধুয়ে যেতে দিও না। তার চোখে অশ্রু ঝরিও না। আমি তো এই হারিয়ে যাওয়া শহর থেকে কখনও ফিরব না জানি তবু তোমায় বড় দেখতে ইচ্ছে করে। কি করব বল ? বহুদূরে যে আমি।
আজও কি তোমার সেই ছোট্ট লাল টিপটা আছে যেটার সাথে লাল শাড়ী পরতে তুমি ? পরীর মত লাগত তোমায়। তোমার কালোচুলে বর্ষার মেঘ কি আজও খেলা করে ? পটলচেরা চোখের তীব্র কটাক্ষে আজও আমার মত কারও মনে বাজ পড়ে কি ? ‍তুমি রেগে গেলে কি এখনও শরতের আকাশের কালো মেঘের মত আঁধার ঘনায় ? তোমার পায়ের যে ঝুমঝুম শব্দবাজা নূপুর ছিল যা আমার কানে সবসময় বাজত, ওটা কি এখনও বাজে ? বড্ড শুনতে ইচ্ছে করে আজও, কিন্তু চিরবিদায়ের গান শোনার পরে তো আর তোমার শহরে ফেরার কোনও উপায় নেই আমার কাছে।
তুমি কি এখনও গান কর ? যে গানে মনের ময়ূর নাচত আমার। তোমার মুক্তোর মত আঙুলগুলো কি এখনও হারমোনিয়ামের সাদা চাবিগুলোর উপরে সাবলিল যাতায়াত করে ? আদা দেওয়া রং চা কি বাবার বকুনি লুকিয়ে এখনও খাও তুমি ? গানটা থামিওনা তুমি। আমি যেতে না পারলেও আমার বিশ্বাস হাওয়ার নাচনে তোমার গলা হয়তো এই অজানা শহরের অজানা গলির ছোট্ট ঘরে একদিন নিশ্চয়ই ভেসে আসবে । বিবর্ণ্ এই নীল আঁধার শহরে আমি অপেক্ষা করব অনন্তকাল।
তোমাদের বাড়ীর কিছুটা দূরের সেই বৈশাখী মেলা নিশ্চয়ই থেমে যায়নি আজও! তুমি সেদিন লালটিপে আর লালশাড়ীতে নকশাকাটা নীল রুমাল নিয়ে বেরিয়েছিলে। পথে রুমালটা পড়ে গেছিল অন্যমনষ্কতায়। আমি কুড়িয়ে পেয়ে তিনমাইল পায়ে হেঁটে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম তোমায়। তোমার কোমল হাতখানি আমার হাতে একটু ছুঁয়েছিল যেটাকে আমি কয়েকদিন কাওকে স্পর্শ্ করতে দিইনি। আমার বন্ধু ছিলনা। থাকলে নিশ্চয়ই মজা করে বলত, রুমাল দিলে ঝগড়া হয়। আমিও হয়তো জবাব দিতাম না ভাবতাম, ভাল করে দেখায় হলনা, ঝগড়া হবে কি করে ? আজ এই অজানা শহরে কথা বলার মতনই কেও নেই তাই ঝগড়া করার সুযোগও নেই। হাঁটার সুযোগ না থাকলে দৌড়ের কথা কল্পনা করা বৃথা।
জান, আজ এই সাদা-কালো অজানা শহরটাতে খুব বৃষ্টি হচ্ছে। সাথে ঝড়ের মাতাল হাওয়া। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ঘনঘন। খুব তেষ্টা পাচ্ছে। তোমাকে দেখার তেষ্টা, তোমার কথা শোনার তেষ্টা, তোমার নকশাকাটা রুমালের স্পর্শ্ পাওয়ার তেষ্টা, তোমার সাথে বৃষ্টিতে ভেজার তেষ্টা। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। পূর্ন্ জলের পাত্রটা দুই-তিনবার শূন্য করার পর হাল ছেড়ে দিয়েছি। জানিনা তোমার শহরে আজ বৃষ্টি আছে কিনা ! বাজ আর বিদ্যুৎচমকের সাথে শীতল হাওয়া বইছে কিনা তাও জানা নেই। তবু কামনা করি তোমার ঘুমটা যেন ভাল হয়। আর যেন তেষ্টা না পায়। তেষ্টা খুব খারাপ। নেশার মত। কোনও কিছুতেই থামে না। এই শহরের আকাশে-বাতাসে মানুষ নেই, নেই জীবজন্তু, পাখির গান নেই, চাঁদ নেই, নেই সাগর। কোনও আশা-নিরাশা-আবেগ কিছুই জীবন্ত নেই। চারপাশের স্মৃতিভক্ষক কীটগুলো নেই দেখে সযত্নে তোমাকে স্মৃতি থেকে বের করেছি। আবার যত্ন করে রেখে দেব, তুমি ভেবনা। তোমাকে নিরাপদেই রাখব আমি। এই হারিয়ে যাওয়া মৃতশহরে আমি হাজার মৃতমানুষের ভীড়ে মৃত হয়েও বাঁচিয়ে রাখব তোমার স্মৃতি, বেঁচে থাকব তোমার স্মৃতির পাহারাদার হয়ে।
---তোমার মৃত স্মৃতির পাহারাদার
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিপ্রতীপ

লিখেছেন রিয়াদ( শেষ রাতের আঁধার ), ২১ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১০:২৯

একটা মানুষ, চাওয়া পাওয়ার হিসেব ছাড়া ঠিক কতটা দিন, কতটা মাস, কতটা বছর অপর একটা মানুষের সঙ্গ হয়ে থাকতে পারে? আমার জন্মের ঠিক আটদিন পরে, তরুর জন্ম। এখন আমার বয়স... ...বাকিটুকু পড়ুন

Diplomacy is not tourism

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:৫৯


আফ্রিকার পশ্চিম প্রান্তে আটলান্টিকের তীরে সেনেগালের রাজধানী ডাকার। এপ্রিলের শেষে সেখানে বসেছে 'Dakar International Forum on Peace and Security in Africa'-এর দশম আসর। নামটা দীর্ঘ হলেও এবারের হাওয়া বেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার একশততম পোস্ট!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:১৮



আমার একশততম পোস্ট!

আজ আমার লেখকজীবনের এক ছোট্ট কিন্তু হৃদয়ের গভীরে দাগ কাটা দিন- সামহোয়্যারইন ব্লগ এ আমার একশততম পোস্ট। সংখ্যার হিসেবে হয়তো ১০০ খুব বড় কিছু নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভুল শুধু ভুল, আমি কি করছি ভুল?

লিখেছেন রবিন.হুড, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:৪১

আমি টাকার পিছনে না ছোটার কারনে আমার হাতে যথেষ্ট সময় থাকায় সে সময়টুকু সামাজিক কাজে ব্যয় করার চেষ্টা করছি। আবার বিলাসিতা পরিহার করার কারনে অল্প কিছু টাকা সাশ্রয় করছি যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফুল ট্যাঙ্ক স্বপ্ন

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৬



শহরের সকালগুলো এখন আর আগের মতো নয়। সূর্য ওঠার আগেই পেট্রোল পাম্পের সামনে লম্বা লাইন পড়ে যায়। সেই লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে রিদম—একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আর জীবনের বাস্তবতায় আটকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×