
গত কিছুদিনের খবরে "মন্ত্রী চাই" ব্যানারের পেছনে দাড়িয়ে মানববন্ধন করতে দেখা গেছে কয়েক জেলায়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের বাক স্বাধীনতা থাকবে সেটা স্বাভাবিক। মানববন্ধন করার অধিকার থাকবে সেটাও স্বাভাবিক। কিন্তু যোগ্য "অযোগ্য" বাছবিচার না করে যাকে ইচ্ছা তাকে মন্ত্রী করার জন্য ব্যানার নিয়ে দাড়িয়ে পড়াটা কতটুকু যৌক্তিক? বাংলাদেশের মত উঠতি অর্থনীতির দেশে যেখানে টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন মেলে (বিশেষ বিশেষ দলে), ভালো ক্রিকেটার হলে মনোনয়ন মেলে, সিনেমার নায়ক হলে মনোনয়ন মেলে- সেখানে এলাকাবাসীর আবেগে মন্ত্রীত্ব চাওয়ার পজিটিভ দিকটা কী?
মন্ত্রীত্ব চাওয়ার ঢংয়েও বেশ বাহার আছে। সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি ২০১০ সালে চালু হলেও ২০০০ সালের আগের পাশ করা ব্যক্তিরা ইতিমধ্যে রাজনীতির মাঠে অনানুষ্ঠানিক সৃজনশীল শিক্ষার পাঠ পেয়ে গেছে। নতুবা একেকজন একেকরকম ক্রাইটেরিয়া মেনটেইন করে মন্ত্রীত্ব চাইতে পারতো না। তবে এ পর্যায়ে একটা কথা বলা জরুরি মনে করছি। হাতেগোনা দু-একজন ছাড়া বাকি সব ব্যানার-পার্টির খরচ ও ব্যানারের যাবতীয় খরচ কিন্তু মাননীয় সাংসদ বহন করে। এটা বাঙলার জনগণ বললেও বুঝে, না বললেও বুঝে। বিশেষত আমি নাদান যেহেতু একবার বুঝতে পেরেছি তবে এই বঙ্গ মুলুকে আর কেউ না বুঝে থাকার কথা না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকার দলীয় একজন রাজনীতিজ্ঞ প্রথম আলো'কে বলেছেন- "প্রথম বারের মত সাংসদ হয়েছেন, এমনকি সংসদের নিয়মনীতি পর্যন্ত ঠিকঠাক জানে না অথচ মন্ত্রীত্ব পেতে নানা রকম চেষ্টা করে যাচ্ছে কেউ কেউ"। এই বিষয়টা সত্যিই দুঃখজনক। সাংগঠনিক দক্ষতা থাকলেও (অবশ্য কারো কারো নাইও বটে) জনপ্রতিনিধি হয়ে আসার প্রথম ধাপের প্রথম পর্যায়ে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে চাওয়া কতটা হাস্যকর!
এবার আসা যাক মন্ত্রীত্ব দাবি করার পেছনে মানববন্ধনকারীদের যুক্তি কী কী সে বিষয়ে। বাঙালির যুক্তিতে জোর কম থাকলেও যুক্তির সংখ্যা অনেক ; ক্ষেত্র বিশেষে ইনফিনিটি। বিরাট যোগ্যতা এদের। যাহোক, মন্ত্রীত্ব দাবি করার যুক্তিগুলো দেখা যাক-
১. ওমুক ভাই তমুক বিষয়ে (সাবজেক্ট) পাশ করেছেন। সুতরাং ভাইকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হোক। আমাদের দাবি মানতে হবে। ওমুক ভাইকে তমুক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করতে হবে, করতে হবে।
২. অমুক আপা "সফল" উদ্যোক্তা। তার হাঁসের ডিম সবগুলো ফুটে বাচ্চা বের হয়। সুতরাং তাকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হোক।
৩. ওমুক আপা ১০ বছর ধরে ব্যবসা করে আসছেন। সুতরাং আপাকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করা হোক।
৪. ওমুক ভাই গত ৩ বারের নির্বাচিত এমপি (যদিও বাংলাদেশে ৩/৪/৫ বারের এমপি অনেক আছে, তবুও আবদার করতে সমস্যা কী) সুতরাং ভাইকে মন্ত্রী হিশেবে দেখতে চাই।
৫. ওমুক ভাই তরুণ নেতা। তিনি ভালো খেলোয়াড়। সুতরাং তাকে আমরা অমুক আসনের জনগণ ক্রীড়া মন্ত্রী (উপমন্ত্রী) হিশেবে দেখতে চাই।
৬. অমুক ভাই সিনেমার নায়ক। ভাইকে সংস্কৃতি মন্ত্রী হিশেবে দেখতে চাই।
এরকম আরো অনেক যুক্তি আছে ব্যানারের পেছনে দাড়ানো পাব্লিকগুলার। এরকমের চেয়ে আরো নিম্ন (লেইম) যুক্তিও আছে। ব্যবসায়ী, খেলোয়াড়, অভিনেতা রাজনীতির মাঠে আসে হরহামেশাই। একটামাত্র নির্দিষ্ট আসনের জনপ্রতিনিধি হয়ে তারা তৃপ্ত হতে পারে না। তাদের চাই একটা মন্ত্রণালয়। নামের পাশে "মন্ত্রী" তকমাটা পেতে মনের অজান্তেই মনের ভেতর লোভ দানা বেধে বসে।
অনেকদিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একজনের হাহাকার দেখতে পেয়েছিলাম। "যে কোন মানের ছাত্রকে এ+ (এ প্লাস) পাওয়ার যোগ্য করে তুলি" লেখা একটা লিফলেটের ছবি পোস্ট করে ভদ্রলোক ক্যাপশনে লিখেছিলেন "মানুষ করার প্রতিশ্রুতি কোথাও পেলাম না"। আজ আমার বলতে ইচ্ছে করছে "যোগ্য লোককে যথাস্থানে চায়- এমন কাউকে দেখলাম না"। বড়ই আফসোস।
আমাদের গণপ্রজাতন্ত্রের দেশে কোন প্রজাকে দেখলাম না "যোগ্য, সৎ ও চরিত্রবান নেতাকে মন্ত্রী হিশেবে চাই" লেখা ব্যানার নিয়ে দাঁড়াতে। আমাদের বিবেক যেন আসলেই কেমন! নিজের লাভ ছাড়া আর কিছুই বুঝে না, বুঝতে চায় না।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জানুয়ারি, ২০১৯ রাত ৯:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




