somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অন্ধের হাতি দেখা ও আধুনিক ব্লগারির এক করুণ রম্যকাব্য

১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


মানুষের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে একটি প্রাচীন উপকথা যুগে যুগে নতুন অর্থে ফিরে এসেছে অন্ধের হাতি দেখা। কয়েকজন অন্ধ মানুষ হাতির ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ স্পর্শ করে প্রত্যেকে নিজেকে সত্যের একমাত্র অধিকারী মনে করেছিল। একজন বলেছিল হাতি নাকি স্তম্ভ, আরেকজন বলেছিল সাপ, তৃতীয়জন ঘোষণা করেছিল কুলা। তাদের প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা আংশিক সত্য ছিল; কিন্তু তাদের উপসংহার ছিল সম্পূর্ণ ভ্রান্ত।

ডিজিটাল যুগে সেই উপকথার নতুন সংস্করণ জন্ম নিয়েছে "অন্ধের হাতি দেখা ব্লগার"।
এঁদের বৈশিষ্ট্য বিস্ময়কর। কোনো লেখা পড়ার আগে কলম ধরেন, কোনো যুক্তি বোঝার আগে প্রতিবাদ লিখে ফেলেন, কোনো প্রবন্ধের শুরুতে না পৌঁছেই তার শেষের বিচার করে দেন। যেন পড়া নয়, অনুমানই তাদের প্রধান পেশা; গবেষণা নয়, গুজবই তাদের প্রধান তথ্যভাণ্ডার।

তাঁদের কাছে একটি পোস্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো যে অংশটি তারা পড়েননি।
তারা মূল লেখার পরিবর্তে পড়েন অন্যের মন্তব্য, শোনেন তৃতীয় ব্যক্তির বর্ণনা, দেখেন একটি বিচ্ছিন্ন উদ্ধৃতি কিংবা কিছু না দেখেই অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য । তারপর সেই ভগ্নাংশের উপর দাঁড়িয়ে এমন আত্মবিশ্বাসে রম্যরচনা শুরু করেন, যেন তাঁরা বিষয়টির সর্বশেষ বিশ্বকোষ।

ফলাফল?
হাস্যরসের পরিবর্তে জন্ম নেয় হাস্যকরতা।
ব্যঙ্গের পরিবর্তে প্রকাশ পায় বুদ্ধিবৃত্তিক দারিদ্র্য।
আর সমালোচনার পরিবর্তে দৃশ্যমান হয় অসত্যের অহংকার।
প্রকৃত ব্যঙ্গকার কখনো অজ্ঞতার উপর ব্যঙ্গ নির্মাণ করেন না। তিনি বিষয়টি গভীরভাবে পড়েন, প্রতিপক্ষের যুক্তিকেও ন্যায্যভাবে উপস্থাপন করেন, তারপর তার অসারতা উন্মোচন করেন। কারণ তিনি জানেন যে প্রতিপক্ষকে সঠিকভাবে বুঝতে পারেনি, সে তাকে খণ্ডনও করতে পারে না।

কিন্তু আজকাল কিছু ব্লগার যেন নতুন এক দর্শনের অনুসারী
না পড়েই প্রতিবাদ, না বুঝেই ব্যঙ্গ, না জেনেই সিদ্ধান্ত।
এ যেন যুক্তির নয়, কল্পনার সাংবাদিকতা।
এ যেন গবেষণার নয়, গুজবের সাহিত্য।
এ যেন প্রমাণের নয়, পূর্বধারণার মহোৎসব।

আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, তাঁরা নিজেদের এই অর্ধপাঠক কিংবা নিষ্পাঠক অবস্থাকেই প্রজ্ঞার শিখর বলে মনে করেন। অথচ জ্ঞানী মানুষের প্রথম পরিচয় হলো বিনয়; তিনি বলেন আমি আগে পড়ব, তারপর বলব। আর অর্ধজ্ঞানী মানুষের প্রথম পরিচয় হলো তাড়াহুড়ো; তিনি বলেন আমি আগে বলব, পরে যদি সময় পাই পড়ব।

এক জন জ্ঞানী ব্যক্তির এর একটি বিখ্যাত উক্তি আছে:
আমি কখনো কারও সঙ্গে বিতর্ক করিনি এই কামনায় যে আমি জয়ী হব; বরং কামনা করেছি সত্য যেন তার বা আমার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
এই বুদ্ধিবৃত্তিক সততা আজও জ্ঞানচর্চার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আদর্শ।

দুনিয়ার সকল দর্শনেই বারবার মানুষকে সত্য যাচাই করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। কারণ যাচাইহীন বক্তব্য বিভ্রান্তির জন্ম দেয়, আর বিভ্রান্তির উপর দাঁড়িয়ে নির্মিত হাস্যরস শেষ পর্যন্ত লেখককেই হাস্যস্পদ করে তোলে।

ব্লগ জগতে কলমের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকা উচিত; কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে থাকতে হবে পাঠের দায়িত্ব, গবেষণার সততা এবং যুক্তির শৃঙ্খলা। কারণ স্বাধীন কলম যদি অজ্ঞতার হাতে পড়ে, তবে তা আলো ছড়ায় না; বরং বিভ্রান্তির কুয়াশা ঘনীভূত করে।

অতএব, যে ব্লগার মূল পোস্ট না পড়েই তার বিরুদ্ধে রম্যরচনা লেখেন, তিনি প্রকৃতপক্ষে লেখককে নয়, নিজের পাঠ অভ্যাসকেই উন্মোচিত করেন। তাঁর কলমে হাসির চেয়ে বেশি ধরা পড়ে তাড়াহুড়ো, গবেষণার চেয়ে বেশি ধরা পড়ে অনুমান, আর প্রজ্ঞার চেয়ে বেশি ধরা পড়ে আত্মপ্রবঞ্চনা।

অন্ধের হাতি দেখার গল্পটি তাই আজও শেষ হয়ে যায়নি। শুধু হাতির জায়গায় এসেছে ব্লগপোস্ট, আর অন্ধত্বের জায়গায় এসেছে পড়তে অনিচ্ছুক অথচ মন্তব্য করতে আগ্রহী এক নতুন ডিজিটাল সংস্কৃতি।

সত্যকে জানতে হলে পুরোটা পড়তে হয়।
যুক্তিকে বুঝতে হলে ধৈর্য ধরতে হয়।
আর ব্যঙ্গকে শিল্পে পরিণত করতে হলে আগে জ্ঞান অর্জন করতে হয়।
অন্যথায় ইতিহাসের পাতায় নয়, পাঠকের হাসির খাতায়ই নিজের নাম লিখতে হয়।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:২৪
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শেখ হাসিনা খাদক ছিলেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:৪৮


আজকে সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু একটা এমন তথ্য দিলেন যেটা শুনে বাংলাদেশের আমজনতা রীতিমতো ক্যালকুলেটর হাতে বসে গেল। কথা হচ্ছে শেখ হাসিনার খাবার খরচ নিয়ে। কোন সালে কত টাকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বৃষ্টি বিলাস!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:৩৮



বৃষ্টির জন্য খুব বেশি হাহাকার জমেছিল বলেই কিনা,
জমিয়ে বৃষ্টি এসে রীতিমতো আমাদের জমিয়ে রেখেছে-
এখন গৃহ কারাবাস!
বৃষ্টি তুমি কিনা জমিয়ে রেখেছিলে এতটা ক্রোধ!
থামছেই না তোমার চোখ রাঙানি!
অনেক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আকাশের ঠিকানায় চিঠি দিলাম

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৬

প্রিয়,
মেঘ বালিকা
(আকাশের ঠিকানায় চিঠি দিলাম ) ।



আজ তোমাকে আমার মনের একটি গোপন ইচ্ছার কথা বলতে ইচ্ছে হলো।
এই বাস্তব পৃথিবীর নিয়ম বড় অদ্ভুত,এখানে সবকিছুর একটা শেষ থাকে।
কিন্তু যখনই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পেঁপের বেগুনী, কুমড়োর চপ, কাঁঠালের বার্গার, ডিম সিদ্ধ করে ফ্রিজে ও পেঁয়াজ কুচি করে শুখিয়ে সংরক্ষন!!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৯

উহা পলাতক। যাহা কখনো পালায়না উহাই পালিয়েছে। উহা রান্না করা ভাত তরকারী বাস্প উড়ছে খেতে পারেনি কিন্তু তাতে কি উহা প্রতিদিন ১০,০০,০০০ (দশ লক্ষ) টাকা প্রতিদিন খেয়েছে! :B#... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের আনন্দের ফুল

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯



প্রেয়সি হে প্রিয়তমা গিয়েছ কোথায়?
হারায় অমৃত ঘুম খোলা আখি পাত
বিবর্ণ অনেক লাগে জোছনার রাত
তোমায় হারিয়ে প্রিয়া আঁধার জীবন।
আসবে কি ফিরে তুমি সুখের প্রভায়
জীবন রাঙ্গিয়ে দিতে? অপেক্ষার হাত
তোমার পরশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×