somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অসুখ

১৭ ই আগস্ট, ২০১৩ রাত ১১:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

টেবিলের এপাশে জনি, আর অন্যপাশে মাথাভর্তি সাদা চুল আর গায়ে সাদা আপ্রন চড়ানো ডাক্তার। আপ্রন আর চুলের মধ্যে কোনটা বেশি সাদা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, তবে ডাক্তারকে দেখে একটা শুভ্রতার অনুভূতি আসে। ডাক্তারের নিস্তব্ধতা সময়কে অনেক লম্বা করে দিচ্ছে, টেনশন হচ্ছে। আলো ঝলমলে রুমটা ঝড়ের আগ মুহূর্তের মতো খুব চুপচাপ, কেবল মাথার উপরের ফ্যান ঘোরার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।

"দেখুন, আমি একজন ডাক্তার। কাজেই আপনাকে আপনার অসুখ সম্বন্ধে স্বচ্ছ ধারণা দিতে আমি দায়বদ্ধ। দেখুন আপনার... আমি ঠিক কিভাবে বলবো বুঝতে পারছি না।"
"ডাক্তার সাহেব, আপনি বলে ফেলুন।"
"আপনার... আপনার এইচআইভি পজেটিভ"
মাথার উপর বাজ পড়ে কানে তব্ধা লেগে গেছে মনে হচ্ছে, ঘরটা হঠাৎ অন্ধকার লাগছে। আলোগুলো সব কুণ্ডলী পাকিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। এসবই হয়তো স্বপ্ন, তবে মৃত্যুর খবর কখনো স্বপ্ন হয় না। জনি শুকনা গলায় খুব কষ্টে একটা ঢোক গেলে।
"ডাক্তার, আমি আমার জীবনে কখনো ঐসব ধরনের খারাপ কাজ করিনি।"
"দেখুন, এইচআইভি পজেটিভ এর কারণ কেবলমাত্র একটা নয়। বিভিন্নভাবে ছড়াতে পারে। আপনি কি কখনো কারো কাছ থেকে রক্ত নিয়েছেন বা সিরিঞ্জে মাদক গ্রহন করেছেন?"
"একবার রক্ত নিয়েছিলাম।" নিষ্প্রভ কণ্ঠে বলে ফেলে জনি।
"কোথা থেকে নিয়েছিলেন"
"___ ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে"
"আমাদের জন্য খুব ই লজ্জার এবং দুঃখের যে, বেশিরভাগ ব্লাড ব্যাঙ্কেই রক্ত নিয়ে ব্যবসা হয়। তারা কখনো রক্ত পরীক্ষা করে দেখে না। সেখানে অনেক মাদকাসক্তদের রক্ত ও সংগ্রহ করে বিক্রি করা হয়। আর আপনি হয়ত জানেন যে, মাদকাসক্তদের মধ্যে এইডস এর সংক্রমন খুব বেশি"
"কিন্তু ডাক্তার আমি কি দোষ করেছি"
"রোগ তো আর দোষী বা নির্দোষ দেখে হয় না"

জনি হতবিহবলের মতো ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসে একটা রিকশা নেয়।

রিকশাওয়ালা কিছুক্ষন বাদেই ফিরে ফিরে দেখছে জনির দিকে। একসময় বলেই ফেলল, "মামা, আপনার কি শরীর খারাপ লাগতেছে?"
জনি উত্তর দেয় না, সে রিকশার প্যাডেলের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে। জীবনের একেকটি মুহূর্ত রিকশার প্যাডেলে জড়িয়ে আসছে। খুব তাড়াতাড়ি ই শেষ হয়ে যাবে। জনি কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করে থাকে, রিকশার উপর চোখ বন্ধ করে থাকলে মনে হয় রিকশা পিছন দিকে যাচ্ছে। ইশ, জীবনটাও যদি এভাবে পিছনে চলে যেত একবার।
"মামা, কি হইছে আপনের?"
"কিছুনা, তুমি যাও।"
কিছুক্ষন বাদে জনি জিজ্ঞেস করে, "আচ্ছা মামা, জীবনটা তোমার কেমন লাগে"
রিকশাওয়ালা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে, "জাহান্নামের মতো। এইখানে সব বাটপার ভরা, ভালো মানুষের কোন দাম নাই। মন চায় সবগুলারে মাইরা ফালাইয়া নিজেও মইরা যাই"

আসলেই পৃথিবীতে ভালো মানুষের কোন দাম নেই। জনি ছোটবেলা থেকে কখনো কোন খারাপ ছেলেদের সাথে মেশে নি, স্কুল কলেজে ভালো ফলাফল করে এখন ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। জীবনে একটা সিগারেটে টান দেয় নি। তাদের পাশের বাসায় একবার এক লোক এইডস হয়ে মারা গেল, তাঁর খারাপ জায়গায় চলাফেরা ছিল। কিন্তু জনি নিজে জীবনে খারাপ জায়গায় যাওয়া তো দূরের কথা, ৩ বছরের প্রেমে নিজের প্রেমিকার একাধিকবার আহ্বান সত্ত্বেও কখনো সাড়া দেয়নি, তাঁর বিবেকে বেঁধেছে। কখনো কোন কারণে এই মেয়েটার সাথে তার বিয়ে না হলে সে সারাজীবন তার স্ত্রীর কাছে অপরাধবোধে পুড়বে। কিন্তু, আজ সেই বিবেক দিয়ে কি হবে। অমানুষরা তার বিবেককে গলা টিপে মেরে ফেলেছে। জনির চোখে পানি চলে আসে। এই পৃথিবীতে বিবেকের কোন দাম নেই, কোন দাম নেই। জয়ী হতে পারাটাই বড় কথা।

জনি হঠাৎ চোখ মোছে, ফোন দেয় তার বন্ধু সাবেত কে।
"দোস, একটু জরুরী। আমি তোকে পরে সব বুঝিয়ে বলবো। আমাকে কিছুক্ষন তোর মেসটা ছেড়ে দিতে হবে, ওকে নিয়ে আসবো একটু। যা তোকে চা-সিগারেট খাইয়ে দিবো নে"
সাবেত একটু হেসে বলে, "ওকে দোস, কোন সমস্যা নাই। তুই আয়"

জনি ফোন দেয় তার প্রেমিকাকে।
"কোথায় তুমি?"
"আমি ক্যাম্পাসে"
"আমি আসছি। আমার সাথে একজায়গায় যেতে হবে তোমাকে, আর্জেন্ট।"
"ওকে জান। আসো তুমি"

জনির ঠোঁটে ক্রুর হাসি ফুটে উঠে। পৃথিবীতে ভালো মানুষের কোন দাম নেই, কাজেই এই খারাপ পৃথিবীর উপর আজ থেকে শুরু হল তার প্রতিশোধ। জনি পাগলের মতো গলা ফাটিয়ে হেসে ওঠে- হাহা হাহা হাহা।

রিকশাওয়ালা ও আশেপাশের পথচারীরা অবাক চোখে তার দিকে তাকায়। মাথার উপরে একটা ঘুড়ি বৈদ্যুতিক তারে পেঁচিয়ে যতবার ই উড়ে যেতে চাচ্ছে ততবার ই নির্দয়ভাবে ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে।
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনঃ কেন আমি বিএনপিকে ভোট দিবো?

লিখেছেন ভুয়া মফিজ, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:২৯



আসছে ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সরকারপক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই নির্বাচন হবে বিতর্কমুক্ত এবং উৎসবমুখর পরিবেশে। আমার অবশ্য এই দুই ব্যপারেই দ্বিমত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামিলীগ আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:১৫



চাঁদগাজী বলেছিলেন,
"যেসব মানুষের ভাবনায় লজিক ও এনালাইটিক্যাল জ্ঞান না থাকে, তারা চারিপাশের বিশ্বকে সঠিকভাবে বুঝতে পারে না, কোন বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সমাজে তাদের অবদান... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘বাঙালি মুসলমানের মন’ - আবারও পড়লাম!

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আহমদ ছফা'র ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইটা আরাম করে পড়ার মতো না। এটা এমন এক আয়না, যেটা সামনে ধরলে মুখ সুন্দর দেখাবে- এমন আশা নিয়ে গেলে হতাশ হবেন। ছফা এখানে প্রশংসা... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাতানো নির্বাচনে বিএনপিকে কিভাবে ক্ষমতায় বসানো হল-(১) অথচ দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনের পর চাওয়া ছিল একটি সুষ্ঠ নির্বাচন।

লিখেছেন তানভির জুমার, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:২১

১/ ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের ভিতরে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ। অর্থাৎ মানুষকে ফোন বাসায় রেখে আসতে হবে। কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার পক্ষপাতিত্ব করলে কেউ রেকর্ডও করতে পারবে না। কেন্দ্রে কোন অনিয়ম, জালভোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

কলেজ ও ভার্সিটির তরুণরা কেন ধর্মের দিকে ঝুঁকছে? করনীয় পথ নকশাটাই বা কী?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৩৬


ধর্মের দিকে ঝোঁকার মানচিত্র

অচেনা পথে হাঁটে আজ তরুণের দল
পরিচয়ের কুয়াশায় ঢেকে গেছে কাল
শিক্ষা, কর্ম, সম্পর্ক সবই আজ প্রশ্নবিদ্ধ
কোথায় জীবনের মানে মন দ্বিধাবদ্ধ।

এই দোলাচলে ধর্ম দেয় দৃঢ় পরিচয়
উদ্দেশ্য, শৃঙ্খলা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×