somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

লো বাজেট ফিল্মমেকারদের জন্য আদর্শ হতে পারে ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমা

১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ রাত ১১:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
প্রথম প্রকাশ


সিনেমা দেখেন কিন্তু ক্রিস্টোফার নোলানের নাম শুনেন নাই দ্য ডার্ক নাইট আর ইনসেপশনের মতো সিনেমা মুক্তি পাবার পরে এমন একটা মুভি দর্শক খুজতে গোরস্থানে যেতে হবে নির্ঘাত। 'ফলোয়িং' নোলানের ‌‌‌পরিচালিত প্রথম ফিচার ফিল্ম। ৪০ বছর বয়সী এই পরিচালক এখন বিশাল বাজেটের সিনেমা নির্মান করছেন, অথচ এই ফলোয়িং একটি খুবই লো-বাজেট ফিল্ম।


একজন লেখক হতে আগ্রহী যুবক তার প্রথম উপন্যাসেই চমক দেখিয়ে দিতে চায়‍‌‌‌ আর তাই তার গল্পের চরিত্রের খোজে মানুষের পিছু নে‌‌য়‍। একটাই শর্ত মেনে চলে‌‌ সে‌‌‌‌‌‌‌, এক ব্যক্তিকে দ্বিতীয়বার পিছু নেন না। কিন্তু এই শর্ত ভাঙ্গে‌ নিজেই, কালো স্যুট পড়া এক ভদ্রলোকের পেছনে ছোটে‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌, একবার, দুইবার, বারবার। একদিন, সেই ভদ্রলোকই তাকে পাকড়াও করে এবং জানা যায়, সে একজন চোর। মানুষের ঘরে অবৈধ উপায়ে প্রবেশ করে, কিছু জিনিসপত্র নিয়ে যায় যেগুলো খুব গুরুত্বপূর্ন কিছু নয়। লিখতে সহায়ক হবে এই আশায় দুজনে দল বেধে লেগে ‌‌গেলো‌ চুরি‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌ করতে। কিন্তু দেখতে দেখতে ঝামেলায় জড়িয়ে গেলো‌‌‌ লেখক হতে চাওয়া যুবকটি। সে কি অভিজ্ঞতা অর্জন করছে, নাকি কারও খেলার গুটিতে পরি‌ণত হয়েছে?

‌ফলো‌য়িং মুক্তি ‌পেয়ে‌‌ছিল ১৯৯৮ সালে‌‌‌,‌‌‌‌ ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌জাতে থ্রিলার‌‌‌। ‌‌সাদা কালোতে ‌চি‌ত্রা‌য়িত করা এই সিনে‌‌মা‌কে‌‌‌‌‌ বলা হচ্ছে নিও-নয়ার, ফি‌ল্ম ‌নয়ারের মডার্ন ‌রূপ। ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌ফিল্ম নয়ার বলতে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের দশকের বেশ কিছু সিনেমাকে বোঝায় যেসব‌ সিনেমায়‍‌ ‌‌স‌ত্যিকারে কোন ভিলেন থাকে না, বরং অ্যান্টিহিরো থাকে‌। জাতে ক্রাইম ‌ড্রামা‌ কিংবা ‌‌‌‌সা‌ই‌কো‌‍ল‌‌জি‌ক্যাল থ্রিলা‌র‌‌‌‌‌ ‌হ‌‌‌‌‌‌য়‍‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌,‌‌ ‌‌‌সব‌‌চে‌' ‌‌‌‌‌‌বে‌‌‍‍শী‍‌ ‌‌‌‌‌বৈ‌চিত্র এর সিনেমাটোগ্রাফিতে। সাদা-কালোর মধ্যে লো কি লাইটিং আর আলো ছায়ার খেলা দেখা যায় এই ধরনের সিনেমাগুলোতে।


ফলোয়িং সিনেমাটি যখন নোলানরা নির্মান করছেন তখন ৩৫ মিমি ক্যামেরা অনেক উন্নত, সাদাকালোয় সিনেমা নির্মিত হয় না বললেই চলে। অথচ এই সময়ে ক্রিস নোলান তার ফলোয়িং সিনেমা নির্মান করলেন সাদা-কালোয়, ১৬ মিমি ক্যামেরায়। কেন? বাজেট কম ছিল তাই। সিনেমায় মূল চরিত্র মাত্র ৪ জন। তরুন লেখক, নাম বিল,
কালো স্যুট পড়া চোর, নাম কব, স্বর্নকেশী এক সুন্দরী আর একজন পুলিশ অফিসার। পুলিশ অফিসারের ভূমিকাও খুব বেশী সময়ের নয়, তবে গুরুত্বপূর্ন। এছাড়া প্রয়োজনে আরও বেশ কিছু ছোট চরিত্রে অনেক অভিনেতা অভিনয় করেছেন। গল্পটা নোলান এমন ভাবেই সাজিয়েছিলেন যেন অল্প চরিত্রে কাজ হয়ে যায়। উদ্দেশ্য একটাই - স্বল্প বাজেটে ফিচার ফিল্ম নির্মান।

আমাদের উপমহাদেশের কিংবদন্তী সত্যাজিত রায়ের সাথে ক্রিস নোলানের কাজ কর্মের বেশ কিছু মিল পাওয়া যায়। সত্যাজিত তার প্রথম সিনেমা 'পথের পাচালি' নির্মানের সময় একই কাজ করেছিলেন। অভিনেতার ব্যয় বহন করতে পারবেন না বলে পুরোনো বন্ধু জেরেমি থিওব্যাল্ডকে দিয়ে প্রধান চরিত্রটি করান, কলেজ জীবনে জেরেমি থিয়েটার করতো। স্বর্নকেশী সুন্দরী লুসি রাসেলকে পাওয়া গেল সেই জেরেমির মাধ্যমেই। জেরেমি শুধু প্রধান চরিত্রই নয়, সিনেমার একজন প্রোডিউসারও বটে।

সিনেমাটি ৯৩ মিনিট দীর্ঘ, অথচ শ্যুটিং চলেছে প্রায় একবছর ধরে। কারণ একটাই। সিনেমার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেই পুরো সপ্তাহ ব্যস্ত থাকেন নিজ নিজ পেশাগত কাজে, শুধু ছুটির দিনে একত্রিত হন সিনেমা নির্মান কাজে। নোলান খুব সন্তুষ্ট ছিলেন এই কাজে, কারণ তার চাকুরীর অর্থ দিয়েই সিনেমা নির্মান করা সম্ভব হয়েছিল, ধার দেনা করতে হয় নি সামান্য পরিমানও।

শ্যুটিং স্টাইলেও বেশ হিসেব করে এগিয়েছিলেন নোলান। নিও-নয়ার সিনেমা বলে খুব বেশী নাটকীয়তা দেখাতে হয়নি তাকে, অভিনেতাদের কাজ কর্মের মাধ্যমেই সিনেমা এগিয়েছে তরতর করে। কাজ করেছেন প্রাকৃতিক আলোতে, ক্যামেরা চালিয়েছেন নোলান নিজেই, তাও হ্যান্ডহেল্ড শট বেশী। লোকেশন হিসেবে ব্যবহার করেছেন বন্ধু, আত্মীয় স্বজন এবং নিজেদের বাড়িকে। শ্যুটিং এর আগে রিহার্সেল হয়েছে বেশ। রিহার্সেলের প্রতি এতটা গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল যে সপ্তাহে দুটো সন্ধ্যা করে প্রায় ছয় মাস মহড়া চলেছিল। শুধু তাই নয়, ফিল্ম স্টক বাচানোর জন্য শ্যুটিং এর সময়ও রিহার্সেল চলেছে যেন দু'একটা টেক থেকেই সঠিক টেকটি নিয়ে নেয়া সম্ভব হয়। 'নিউজরীল' স্টাইলের শ্যুটিং তার এ কাজকে আরও সহজ করে দেয়।

এত কিছু করেও কিন্তু বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেন নি ক্রিস নোলান। চোরদের গল্প নিয়ে সিনেমা বানাচ্ছেন আর এদিকে তার নিজের বাড়িতেই হানা দিলো চোর, অন্যান্য জিনিসের সাথে নিয়ে গেল কিছু এক্সপোজড ফিল্ম স্টক যাতে ছিল বেশ কিছু ইনসার্ট শট। পুনরায় শ্যুটিং করা তাদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। সুতরাং চললো এভাবেই।

১২ সেপ্টেম্বর কান চলচ্চিত্র উতসবে প্রথম প্রদর্শিত হয়, পরে ১৯৯৯ সালের ২রা এপ্রিল নিউইউর্কে মুক্তি পায় সিনেমাটি। রোটেন টম্যাটোস এর এই সিনেমার ৭৬ ভাগ ফ্রেশ বলে মন্তব্য করেছে। খুব বেশী ব্যবসা করেছিল এমনটি বলা যাবে না, কারণ ৪৮০০০ ডলার খুব বেশী নয়, কিন্তু এই একটা 'ফলোয়িং' সিনেমাই ক্রিস্টোফার নোলানকে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবেশাধিকার দিয়েছে, ১৬০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে 'ইনসেপশন' সিনেমা নির্মানের সুযোগ করে দিয়েছে। কত ছিল এই ইন্ডাস্ট্রিতে ঢোকার টিকেট মূল্য?

মাত্র ৬০০০ ডলার।



* দারাশিকোব্লগ ফ্যানপেজ নিজে ফ্যান হোন, অন্যদের ফ্যান হতে উৎসাহিত করুন ;)
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ রাত ১১:১৯
১২টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ডায়োজেনিস সিন্ড্রম

লিখেছেন করুণাধারা, ০৪ ঠা জুন, ২০২৬ রাত ১২:০১



ডায়োজেনিস সিন্ড্রমে আক্রান্ত মানুষের ঘর

আমার একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের কিছু অদ্ভুত আচরণ দেখে বুঝতে চাচ্ছিলাম যে তার এমন আচরণ কোনো মানসিক সমস্যা কিনা। তার আচরণের বর্ণনা দেই ইন্টারনেটে, আর তখন জানতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল কোরআনের ১১৪ সূরায় হানাফী মাযহাবের সঠিকতার অকাট্য প্রমাণ (পর্ব-৩০)

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৪ ঠা জুন, ২০২৬ রাত ১:০৩



সূরাঃ ৩০ রূম, ৩২ নং আয়াতের অনুবাদ-
৩২। যারা নিজেদের দীনে মতভেদ সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে।প্রত্যেক দল নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উৎফুল্ল।

সূরাঃ ৩০ রূম, ২৯ নং... ...বাকিটুকু পড়ুন

হামে শিশুদের মৃত্যুর দায় ডঃ ইউনুস গভার্নমেন্টের

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৪ ঠা জুন, ২০২৬ রাত ১:০৪

ইউনিসেফ হামের টিকা কেনার জন্যে গত তত্তবধায়ক সরকার প্রধান ড' ইউনুসকে বারবার অনুরোধ করেছিলো। আমরা এখনো ইউনুস স্যারের উত্তর পাই নাই। কিন্তু, প্রশ্ন হচ্ছে, ইউনিসেফকে প্রধান উপদেষ্টা পর্যন্ত যেতে হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

মহাশূন্যের অন্তহীন দিগন্তে: আগামীর মহাকাশ গবেষণা, মানবসভ্যতা এবং আল কুরআনের বিস্ময়কর দিকনির্দেশনা

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা জুন, ২০২৬ সকাল ৯:৫৫

মহাশূন্যের অন্তহীন দিগন্তে: আগামীর মহাকাশ গবেষণা, মানবসভ্যতা এবং আল কুরআনের বিস্ময়কর দিকনির্দেশনা

ছবি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহিত।

ভূমিকা:

মানুষ যখন প্রথম আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছিল তখন সেই বিশাল নীলিমা তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

যুগে যুগে সারদা দেবী

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৪ ঠা জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৯



নদীর নাম রুপসা।
জীবনানন্দ দাশ তার কবিতায়ও রূপসা নদীর কথা বলেছেন। এই নদীতে স্নান করেছেন- রবীন্দ্রনাথের মা এবং স্ত্রী। বর্ষাকালে রুপসা নদী যেন যৌবনে ফিরে যায়। কি তেজ! কি জলের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×