somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ডায়োজেনিস সিন্ড্রম

০৪ ঠা জুন, ২০২৬ রাত ১২:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ডায়োজেনিস সিন্ড্রমে আক্রান্ত মানুষের ঘর

আমার একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের কিছু অদ্ভুত আচরণ দেখে বুঝতে চাচ্ছিলাম যে তার এমন আচরণ কোনো মানসিক সমস্যা কিনা। তার আচরণের বর্ণনা দেই ইন্টারনেটে, আর তখন জানতে পারি Diogenes syndrome সম্পর্কে।

গত কয়েকদিন ধরে যে মায়ের মৃত্যু নিয়ে সরব হয়ে আছে মিডিয়া এবং সামাজিক মাধ্যম, সেই মায়ের ঘরের ছবি দেখে আবার মনে পড়লো Diogenes syndrome এর কথা। ঘরের ছবি দেখে মনে হয়েছে সেই মা Diogenes syndrome এ ভুগছিলেন।view this link

গুগলকে প্রশ্ন করার পর Diogenes syndrome সম্পর্কে যা জানায় তা কপি- পেস্ট করে দিলাম নিচে:

মানুষের নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকার এই অবস্থাকে চিকিৎসা ও মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ডায়োজেনিস সিনড্রোম (Diogenes syndrome) বলা হয়। এটিকে অনেক সময় 'সেনাইল স্কোয়ালর সিনড্রোম' বা 'হোর্ডিং ডিসঅর্ডার'-এর একটি চরম পর্যায়ও বলা হয়ে থাকে।

এটি মূলত একটি আচরণগত ব্যাধি। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:

১) চরম আত্ম-অবহেলা: আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে পড়েন। তারা নিয়মিত গোসল করেন না, অপরিচ্ছন্ন পোশাক পরেন এবং খাওয়া-দাওয়ারও কোনো যত্ন নেন না।

২) অপরিচ্ছন্ন বাসস্থান: ঘরবাড়ি অত্যন্ত নোংরা, অগোছালো ও অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় রাখেন এবং ময়লা-আবর্জনা জমিয়ে রাখেন।

৩) সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে চলতে পছন্দ করেন এবং পরিবার বা বন্ধুদের থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেন।

৪) সমস্যা অস্বীকার করা: নিজের এই নোংরা জীবনযাপন সম্পর্কে তাদের মধ্যে কোনো লজ্জা বা সমস্যাবোধ থাকে না। কেউ সাহায্য করতে বা পরিষ্কার করতে চাইলে তারা তীব্র বাধা দেন।

গ্রিক দার্শনিক ডায়োজেনিসের নামানুসারে এই সিনড্রোমের নামকরণ করা হয়েছে, কারণ তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে ও ন্যূনতম সুবিধায় জীবনযাপন করতেন। এই অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে Wikipedia এবং Healthline দেখুন। এটি সাধারণত বিষণ্নতা, ডিমেনশিয়া, বা মানসিক আঘাতের (trauma) কারণে বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।


এই সবগুলো বৈশিষ্ট্যই দেখা যায় আমার সেই আত্মীয়র মধ্যে। তিনি নিজের বিশাল এপার্টমেন্টে থাকেন একাকী, তিনি অকৃতদার। তার বয়স এখন ৭৭ বছর, তিনি কোন কাজের লোক রাখেন না। ফলে তাঁর বাসস্থান অপরিচ্ছন্ন (বৈশিষ্ট্য ২)। পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজন কেউ তার ঘরে ঢুকতে পারে না। একসময় আত্মীয়দের সাথে যাতায়াত ছিল। গত চার বছর ধরে সেই যাতায়াত কমতে কমতে এখন একেবারে বন্ধ, কাউকেই বাসায় ঢুকতে দেন না (বৈশিষ্ট্য ৩)।

অথচ এই বাসাটি এক সময় বেশ সাজানো গোছানো ছিল। তারপর একসময় দেখা গেল ঘর ভরে গেছে জঞ্জাল দিয়ে। পলিথিনের প্যাকেট, তেলের বোতল, মিষ্টির বাক্স, মিল্ক ভিটার প্যাকেট এধরণের জিনিস বছরের পর বছর জমতে থাকলে একসময় ঘরে আর পা ফেলার জায়গা থাকলো না! এই সময়ও কাউকে কাউকে তিনি বাসায় আসতে দিতেন, তাঁরা তাকে বলতেন এসব জিনিস ফেলে দিতে। তাতে তিনি প্রচন্ড রেগে যেতেন, যেন তার মহামূল্যবান সম্পদ কিছু ফেলে দিতে বলা হয়েছে (বৈশিষ্ট্য ৪)! যেহেতু তিনি নিজে রান্না করে খেতেন, তাই যারা তাকে দেখতে যেতেন তারা উনার জন্য খাবার দাবার নিয়ে যেতেন। এই খাবারও তিনি খেতেন না ঠিকমতো। দুইটা বড় ফ্রিজে সব ঠেসে রাখতেন।‌ ফলে ফ্রিজ খুললেই পঁচা খাবারের গন্ধ পাওয়া যেত। তিনি সেগুলোই খেতেন, সম্ভবত তাজা খাবার খুব কমই খেয়েছেন (বৈশিষ্ট্য ১)।

তিনি বিমান বাহিনীতে চাকরি করতেন, রিটারমেন্ট নিয়ে সরকারি চাকরি করেন কয়েক বছর। শারীরিক এবং মানসিক ভাবে সুস্থ একজন মানুষ। তিনি অনেক সম্পদেরও মালিক যদিও কাউকে বলেননি কোথায় কোথায় তাঁর কী আছে! সম্ভবত এ ব্যাপারে কাউকে বিশ্বাস করতে পারেন না।

আগে তাঁকে ফোন করলে মাঝে মাঝে ফোন ধরতেন। কিন্তু বছরখানেক থেকে ফোন ধরাও বন্ধ করে দিয়েছেন। তবু আমি মাঝে মাঝে ফোন করি, আজকেও করেছি। ফোনের রিং হওয়া শুনে বুঝতে পারি যে তিনি সুস্থ আছেন, যেহেতু ফোনে চার্জ দিতে পারছেন।

বাসায় গেলে দরজা খোলেন না। কয়েকবার এমন হবার পর এখন আর বাসায় যাই না, কারণ এত কষ্ট করে যাবার পর দরজা না খোলায় মন খারাপ হয়।

উনার প্রায় সব siblings বিদেশে থাকেন। তারা সকলেই উনার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন, কিন্তু কিছুই করতে পারেন না! তিনি অসুস্থ হলেও কেউ জানতে পারে না, কারণ তিনি জানতে দিতে চান না। এখন উনি যদি অসুস্থ হয়ে মারা যান, ঘরের ভেতরে মরে পড়ে থাকলেও কেউ জানতে পারবে না! তখন ঘর ভেঙে তাঁর লাশ উদ্ধার হবে, সকলে উঠে পড়ে লাগবে তার জীবিত ভাই-বোনদের দোষারোপ করতে যে কেন তাঁর খোঁজ খবর রাখা হয় নি, ঠিক যেমন এখন নুরজাহান বেগমের ছেলেমেয়েদের দোষারোপ করা হচ্ছে। আসলে এমন মানুষের খোঁজ নিতে গেলে দরজা ভেঙে ঢুকতে হয়। আবার মানসিক সমস্যার চিকিৎসা করতে গেলেও জোর করে ধরে নিয়ে যেতে হবে, তখন আত্মীয়-স্বজন আর পাড়া প্রতিবেশীরা বলবে অসহায় মানুষটাকে পাগল সাজাতে চাচ্ছে!!

এই মানসিক ব্যাধি সম্পর্কে অনেকেই জানেন না, অথচ আমাদের আশেপাশেই এমন অনেক মানুষ দেখা যায়। ইদানিং আমারও Hoarding disorder শুরু হয়েছে!



নুরজাহান বেগমের ঘরের ছবি। যুগান্তর অনলাইন থেকে নেয়া।

প্রথম ছবির সূত্র: view this link
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুন, ২০২৬ রাত ১২:১১
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ পতনের অপেক্ষায়...

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০৩ রা জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৪০


(ছবিটার পুওর কোয়ালিটির জন্য দুঃখিত। নিজের তোলা এর চেয়ে ভালো কোন ছবি পেলে পরে এটা রিপ্লেস করে দিব)

আমরা এখন...
পাকাফল হয়ে হয়ে ঝুলে আছি,
ভূমিপানে নতমুখে,
পতনের অপেক্ষায়....... ...বাকিটুকু পড়ুন

=ইদানিং কিছু্ই ভালো লাগে না=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৩ রা জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৩

ফেসবুক খুললেই ইদানিং নানা দুঃসংবাদ জাতীয় খবর আসে। অল্প বয়সের কিছু নারী পুরুষ ক্যান্সার আক্রান্ত এর সংবাদ দেখছি ফেসবুকের পাতায়। মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায়। এই তো নুরজাহান নামে একজন বয়স্ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

রটেন টমেটোদের সাথে সম্পর্ক রাখবেন না, প্লিজ!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা জুন, ২০২৬ দুপুর ১:২৪

আমি চাকরীর রিক্রুটমেন্টে কাজ করেছি বেশ কয়েক বছর। কোন চাকরী প্রত্যাশীর সিভি হাতে পেলে তার সম্পর্কে যখন খোঁজ-খবর নেওয়া শুরু করি, তখন সবার আগে সেই প্রার্থী স্যোশাল মাধ্যমে কি পোস্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডায়োজেনিস সিন্ড্রম

লিখেছেন করুণাধারা, ০৪ ঠা জুন, ২০২৬ রাত ১২:০১



ডায়োজেনিস সিন্ড্রমে আক্রান্ত মানুষের ঘর

আমার একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের কিছু অদ্ভুত আচরণ দেখে বুঝতে চাচ্ছিলাম যে তার এমন আচরণ কোনো মানসিক সমস্যা কিনা। তার আচরণের বর্ণনা দেই ইন্টারনেটে, আর তখন জানতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল কোরআনের ১১৪ সূরায় হানাফী মাযহাবের সঠিকতার অকাট্য প্রমাণ (পর্ব-৩০)

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৪ ঠা জুন, ২০২৬ রাত ১:০৩



সূরাঃ ৩০ রূম, ৩২ নং আয়াতের অনুবাদ-
৩২। যারা নিজেদের দীনে মতভেদ সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে।প্রত্যেক দল নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উৎফুল্ল।

সূরাঃ ৩০ রূম, ২৯ নং... ...বাকিটুকু পড়ুন

×