somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সৌন্দর্যপ্রেমী সাইকেল ও আমার হুজ্জত

১৪ ই জুলাই, ২০১১ রাত ৮:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এই লেখাটা আমার খুব প্রিয় আপন ছোট ভাই যায়েদুল হাসান এর রচনা। জাতে রম্য। আমি হতবাক তার লেখার ধরন দেখে। মনে হচ্ছে আমার কম্পিটিটর আমার ঘর থেকেই শুরু হলো :p


পরীক্ষায় ভাল করলেই সাধারণত পুরষ্কার কিংবা উপহার দেয়া হয় দেখে এসেছি। আমার বেলায় ব্যাপারটা হলো উল্টো। এস.এস.সি-তে বিরাট রকমের একটা বাঁশ খাবার কারণেই সম্ভবত (মুলি বাঁশ এর মত চিকন বাঁশ নয়, রীতিমতো বরাক বাঁশ।) - কলেজে উঠার পর আমাকে ঘুষ হিসেবে একটা জলজ্যান্ত (!!) সাইকেল কিনে দেয়া হলো। অবশ্য এই ঘুষের প্রতিদানে এইচ.এস.সি- তে বাঁশটা অনেকখানি ট্যাকল দিয়ে দিয়েছিলাম। লেকিন সেটা অন্য টপিক। কথা হচ্ছে সাইকেল নিয়ে। লাল-কালো রঙের এক অশ্লীল রকমের সাইকেল। দেখলেই মনে শান্তি পাই। সবে নতুন সম্পত্তি। চালাতে গেলে নিজেকে কেমন 'হিরু হিরু' লাগে। ম্যালা ভাব নিয়ে সাইকেল ড্রাইভ করি। পুরা যা তা ব্যাপার। কিন্তু সুখ বেশিদিন সইলো না। যেদিন থেকে সাইকেল ব্যাটা নিজের প্রাণের অস্তিত্ব জানান দিতে শুরু করল, সেদিন থেকে আমার ভাব উবে গেল।

হিসাববিজ্ঞান পড়তে যাচ্ছিলাম। বৃষ্টির দিন বলে বের হতে একটু দেরি হয়েছিল। তবু চিন্তা ছিলো না। সাইকেলে ঠিক সময়ে পৌছে যাবো। স্যার পড়ানো শুরু করার কথা তিনটেয়। ঘড়িতে যখন সাড়ে তিনটা তখনও আমি রাস্তায়। ১৫ তম বার পড়ে যাওয়া সাইকেলের চেইন উঠানোর কসরতে ব্যস্ত। প্রত্যেকবার চেইনটা পড়েই বাজে ভাবে আটকে যাচ্ছে। তুলতে ভাল শক্তি খরচ করে টানাটানি করতে হচ্ছে। স্যারের বাসায় আর যাওয়া হলো না। মেজাজ খারাপের চূড়ান্ত করে বাসায় ফিরে চিৎকার করে বললাম- "এই ছাতার সাইকেলটা বেচে দেয়ার ব্যবস্থা করো।" তখনও সাইকেলের গায়ে নতুন গন্ধ। পিতৃদেব সব শুনে হেসে ফেললো। বলল- "এইটুকুর জন্য এত রাগ? মেকানিকের কাছে নিয়ে যা। ঠিক হয়ে যাবে।" সাইকেলের মেকানিজম সম্পর্কে আমার জ্ঞান তখন শূণ্যমাত্রার। সুতরাং মেকানিকের কাছে গিয়ে আমি বিরাট কোন সমস্যা হয়েছে এমন ভঙ্গিতে কাহিনী বললাম। ব্যাটা মুখে বিড়িটা ঝুলিয়ে যখন নির্বিকার ভাবে দেড় মিনিটের মাথায় সমস্যা সারিয়ে দিল তখন আমি বেকুব। এই সামান্য কারণে এত যন্ত্রণা?

সেই থেকে আমার হুজ্জতের শুরু। আমি সাইকেলে যা চড়ি তার থেকে বেশি সাইকেল আমার ঘাড়ে চড়ে। দু'-একদিন পরপর নতুন নতুন সমস্যা। ব্রেকের ক্লাচ ভাঙ্গলাম সব মিলিয়ে ছয়টা কিংবা সাতটা। প্যাডেল বদলাতে হলো পাঁচবার। ডাবলিং করতে গিয়ে বীরবিক্রমে অ্যাক্সিডেন্ট করে সামনের ফর্ক ঘুগনি বানিয়ে ফেললাম। টায়ার জোড়া বদলাতে হলো বেশ কিছুদিন পর। খুচরা টিউব লিক আর ভালব টিউব ফুটো হওয়া তো লেগেই আছে। সিট ভাঙ্গলো দু'বার। তার মধ্যে প্রথমবার সিট ভাঙ্গার পর তখনও নতুন কেনা হয়নি। একদিন কলেজ থেকে বের হবার পর সাইকেলে উঠার সময় খেয়াল করি নি সিটটা খুলে পড়ে গেছে। এক দঙ্গল মেয়ের সামনে আমি সিট লাগানোর রডের উপর বসে পড়লাম। সে বড়োই আপসুসেবল পরিস্থিতি। ফিজিক্যাল বেদনা বাদই দিলাম, কিন্তু আমার মান-ইজ্জতের যে হালুয়া, ফালুদা, ভুনা খিচুড়ি- সব একসাথে হয়ে গেল সেই শোক আমি কোথায় রাখি? সিমপ্যাথি ফর মাইসেল্ফ। যাই হোক। যে সাইকেল আমার মনে প্রথম প্রথম শান্তি পয়দা করত সেই সাইকেল হয়ে গেল মহা যন্ত্রণার বিষয়। মেকানিকের সাথে আমার ভাল খাতির হয়ে গেল এই সাইকেলের সুবাদে। ওদিকে সাইকেল সারাতে সারাতে আমার পকেটে তেলাপোকা ঘুমায়।

এত ভ্যাজাল সারালাম, কিন্তু সাইকেলের আদি ভ্যাজালটাই সারানো গেল না। চেইন পড়া রোগটা সারানো গেল না। সব টেকনিক খাটানো হলো। চেইন কেটে যতটুকু সম্ভব ছোট করালাম। তারপরও চেইন পড়া বন্ধ হয় না। দু' দিন ঠিক, তারপর যেই কে সেই। আমি বাধ্য হয়ে সেভাবেই সাইকেল চালাই। চেইন পড়ে গেলে অভ্যস্ত হাতে তুলে নিই। মাঝেমধ্যে কসরতও করতে হয়। তবু চালাই। আচমকা একদিন আবিষ্কার করলাম সাইকেল ব্যাটা আসলে সবসময় চেইন ফেলে না। ব্যাটার চেইন ফেলে দেয়ার ভাল মানে আছে। যখনই আমি সাইকেল নিয়ে কোন মোটামুটি থেকে ভাল মানের সুন্দরী মেয়েকে ক্রস করি, তখনই ব্যাটা চেইন ফেলে দেয়! উদ্ভট! পুরা গ্রামার বিহীন ব্যাপার-স্যাপার! আমি প্রথম যেদিন ব্যাপারটা লক্ষ্য করলাম সেদিন ভেবেছিলাম- "ধুর! একদিন আশেপাশে কোন পক্ষী উড়তাসে, তারসাথে চেইন পড়ার কি সম্পর্ক?" কিন্তু তারপর যখন আরও কয়েকদিন বিষয়টা লক্ষ্য করলাম সেদিন থেকে কনশাসলি বিষয়টা ওয়াচ করতে শুরু করলাম। চেইন পড়লেই আগে চারপাশ সার্ভে করি। উরেব্বাস! এ তো দেখি সত্যি সত্যিই তাই! রাস্তা দিয়ে কোন সুন্দরী মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে, আমি ক্রস করতেই চেইনটা ঘড়ঘড় করে পড়ে গেল। রিকশায় করে যাচ্ছে, আমি ওভারটেক করলাম, ব্যাস! এক রিকশা কিংবা মেয়েকে তিন থেকে চারবার ওভারটেক করেও আমাকে একই সমস্যায় পড়তে হয়েছে। একদিন তিনবার একটা রিকশা ওভারটেক করে তিনবারই চেইন পড়ার পর শেষ পর্যন্ত আমি মেইন রোড বাদ দিয়ে গলিতে ঢুকে পড়লাম। ঘুরেফিরে মেইন রোডে বের হওয় মাত্র দেখি সামনে সেই রিকশা। এবং আমি ওভারটেক করা মাত্র চেইন পড়ে গেল। অবিশ্বাস্য ব্যাপার। আমার গ্র্যান্ডফাদারের জন্মেও কেউ এমন সাইকেলের কথা শুনেছে কি না সন্দেহ আছে। সৌন্দর্যপ্রেমী সাইকেল! এ জিনিস কে তৈরি করেছে কে জানে? সুন্দরীদের সাথে চেইনের ডিসলোকেশনের রিলেশন কোথায় ক্লিয়ার হয় না। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে ঠিক ঠিক নাইস পক্ষীদের আইডেন্টিফাই করে চেইন ফেলে দেয়ার মত বুদ্ধিধারণ করা ঘিলুটা ব্যাটার কোথায় ফিট করা আছে খুঁজে পেলাম না।

ব্যাটার সৌন্দর্যপ্রেম দেখে আমি বিস্মিত। এখন আমাকে কষ্ট করে পরিবেশবিদ হতে হয় না। সাইকেলের চেইন পড়ে গেলেই আমি বুঝতে পারি আশেপাশে পাখি উড়ছে। শুধু আপসুস! যাকে দেখলে আমার ভায়োলিন বাজে তার সামনেই ব্যাটা নালায়েক বিলকুল ঠিক। মহা মুডে ফ্রী ফ্লোতে ক্রস করে। আরে ব্যাটা! তখন চেইন পড়লে আমার ভয়োলিনটা আরেকটু বেশি সময় বাজার সুযোগ পায়। যত্তসব!

এই চেইন পড়ার হুজ্জতে আমি ত্যাক্ত। তবু সাইকেলটা চালিয়ে যাচ্ছি। শুধু যখন স্বল্প সময়ের নোটিশে জরুরী কাজে ছুটতে হয় তখন দোয়া করতে থাকি- আমার চোখ ঠিক থাকুক, সাইকেলটা অন্ধ থাকুক কাজ না হওয়া পর্যন্ত।

এছাড়া, সাইকেলটার তুলনা নেই। হি: হি: ;D
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে ডিসেম্বর, ২০১১ বিকাল ৩:৫৯
১২টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×