somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কালরাত্রি । (সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

১১ ই এপ্রিল, ২০১৪ দুপুর ১২:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(১)
শেষ বিকেলে বাড়িতে মেহমান এসে হাজির হলো । বেশ কয়েকজন ছোকরা বয়সী যুবক । গৌরবর্ণ নধরকান্তি দেহ তাদের । তাকালে চোখ ফেরানো যায় না । যৌবনের স্ফূরনে আপাদমস্তক লাবন্যের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে ।
একেবারে মূর্তিমান বিপদ !

বাড়ির কর্তা হকচকিয়ে গেলেন অস্বস্থি ও আতংকে ।
হুট্ করে এতগুলো মেহমানকে আপ্যায়ন করা কি চাট্টিখানি কথা ! তাছাড়া দিনকালও ভালো না । চারপাশে অসংখ্য লোলুপ চোখ ।
না জানি খবর পেয়ে কখন এসে হামলা চালায় বাড়িতে সব দু’পেয়ে জানোয়ারের দল ।

ভেতর বাড়িতে চলে গেলেন তিনি । ব্যস্ত হয়ে হৈচৈ শুরু করলেন,
--‘কই গো, কোথায় গেলে, বাড়িতে মেহমান এসেছে । তাড়াতাড়ি রান্নাবান্নার কী আছে যোগাড় করতো দেখি ।’

এমন সময় বাইরে থেকে প্রচুর চীৎকার চেঁচামেচী শুনা যেতে লাগলো । বাড়ির কর্তা দুরু দুরু বক্ষে বাড়ির বাইরে বেড়িয়ে এলেন । সংগে সংগে ভয়ে মুখ চূন হয়ে গেল তার । যা ভয় করেছিলেন ঠিক তাই হয়েছে । হাজির হয়ে গেছে সব শয়তানের দল । ছোট বড় ধেড়ে বুড়ো ।

ভিড় থেকে গাট্টাগোট্টা ও ষন্ডামতো একজন এগিয়ে এলো । দু’ চোখে তার নোংরা লোভ চকচক করছে । ঠোঁটের একপাশ বেয়ে কষ গড়িয়ে পড়ছে ।
‘কী মিয়া, সুন্দর সুন্দর মেহমান পাইয়া মনে হয় হেগো খাতির যত্নে খুব ব্যস্ত হইয়া গেছ । খুবই ভালো কথা ।’ -চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারন করলো সে । ‘তয় প্রতিবেশী হিসাবে আমাগোওতো কিছু হক আছে । নাকি কও মিয়া সচ্চরিত্রবান?’

আমতা আমতা করতে লাগলেন বাড়ির কর্তা হযরত লূত আঃ ।
‘আল্লাহ্‌র দোহাই লাগে আপনাদের ভাইয়েরা । এরা আমার সম্মানিত মেহমান । ওদের দিকে কু নজর দিবেন না দয়া করে । আপনারা যা চান আমি তাই দিতে রাজি আছি । তবুও ওদেরকে রেহাই দিন । ওদের অসম্মান আমি করতে দেব না । কক্ষনোই না’ ।

রাগে মুখ টকটকে লাল হয়ে গেল ষন্ডামতো লোকটির । পেছনের জনতাও উত্তেজিত হয়ে উঠেছে । আস্তিন গুটাতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে অনেকে ।
হাত তুলে ওদেরকে নিরস্ত করলো সে । তারপর চিকন কন্ঠে লূত আঃ কে বললো, ‘মনে হয় খুব বাড় বাইরা গেছে তোমার । আমাগো কী দিবার চাও তুমি ? অ্যাঁ ? আমরা কী চাই বুঝবার পারতাছো না ? আমাগো নজর কু নজর ? ব্যাটা....’

লূত আঃ খানিকটা পিছিয়ে গেলেন অসহায় ভঙ্গীতে ।
মিনতি জানালেন তিনি আবারও, ‘দেখো ভাই, ঘরে আছে আমার সুন্দরী কণ্যারা । আল্লাহ্ তোমাদের জন্য তাদেরকে হালাল করেছেন । তোমরা যারা যারা চাও এই মুহূর্তে তোমাদের কাছে তাদেরকে বিয়ে দিয়ে দেবো আমি । বিশ্বাস করো । আল্লাহ্‌কে স্বাক্ষী রেখে কসম কাটছি’ ।

হো হো করে আট্টহাসিতে ফেটে পড়লো পালের গোদা । পেছনের জনতার মাঝেও সংক্রমিত হলো সে হাসি ।
‘আরে উল্লুক টা কী কয় হুনছো মিয়ারা ?’ আরেক চোট হেসে নিল সবাই ।

তারপর কটমট করে পালের গোদা তাকালো দুশ্চিন্তায় প্রায় ভেঙে পড়া হযরত লূত আঃ এর দিকে ।
‘শোন মিয়া ভদ্দরনোক নবী, আইজকার রাইতটা সময় দিয়া গেলাম তোমারে । যতো খুশী মেহমানগো আপ্যায়ন কইরা লও। সকালে আমরা ফিরা আসমু । পোলা গুলিরে আমাগো হাতে তু্ইলা দিবা । কাইলকা সারাদিন মউজ করমু এইগুলার লগে । মিয়া, খাঁটি জিনিস আমদানী করছো । দেখলেই একেবারে.......’ নীচের দিকে তাকিয়ে অশ্লীল ভঙ্গিতে ইঙ্গিত করলো সে ।

জনতার মাঝে আবারও হাসির হল্লা উঠলো ।

রাগে ঘৃণায় সারা শরীর শিউরে উঠলো লূত আঃ এর । দড়াম করে জনতার মুখের উপর সদর দরোজা সজোরে বন্ধ করে দিলেন তিনি ।
বাইরে থেকে আবারো চীৎকার শুনা গেল গোদাটার, ‘সকালে আসমু । ভুইলো না কইলাম । আর অন্য কোন মতলব থাকলে ছাড়ান দিও । শহরের চাইরদিকে পাহারা বসামু আমরা । আবারো কইয়া যাই, কালকে সকাল পর্যন্ত টাইম ।

জনতার গুঞ্জন আস্তে আস্তে দুরে মিলিয়ে গেল ।
দরোজার ফাঁকে চোখ রেখে দেখলেন লূত আঃ । দু’চোখ বেয়ে তার অশ্রু গড়িয়ে পড়লো । নিজের জাতির এই নিকৃষ্ট আচরনে কষ্টে তার বুক ভেঙে যাচ্ছে । এতোটা কাল ধরে তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন এদের সংশোধন করার । কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না । দু’চারজন ছাড়া তাদের অধিকাংশেরই ঘৃণ্যতম স্বভাবটিকে দূর করতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি । লাজলজ্জা ভুলে একেকজন মানুষরুপী পশুতে পরিনত হয়েছে তারা । এখন কী করে মুখ দেখাবেন তিনি মেহমানদের কাছে ।

দু’চোখ মুছে দীর্ঘশ্বাস গোপন করলেন তিনি । তারপর পেছন ফিরতেই একেবারে তরুন মেহমানদের সামনাসামনি পড়ে গেলেন । বিব্রত হয়ে শুকনো মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করলেন লূত আঃ ।
‘ইয়ে ম্মানে........’

যুবকেরা তাকে আশ্বস্ত করলো ।
‘দুশ্চিন্তা করবেন না আল্লাহ্‌র নবী । ওরা আমাদের কিছুই করতে পারবে না । আসুন শান্ত হয়ে এইখানটায় বসুন । আপনাকে এইবার আমাদের আগমনের আসল কারনটি খুলে বলছি, শুনুন হে আল্লাহ্‌র প্রিয় বান্দা’ ।

হযরত লূত আঃ অবাক চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন ।

যুবকদের একজন বলতে থাকলো, ‘হে আল্লাহ্‌র নবী, আমরা আল্লাহ্‌র প্রেরিত ফেরেশতা । মানুষের ছদ্মবেশ ধারন করে আল্লাহ্‌র আদেশে আমারা আপনার কাছে এসেছি । আপনার জাতি নাফরমানির সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে । আমাদের মালিক তাদেরকে অনেক অবকাশ দিয়েছেন । কিন্তু তারা সংশোধনের অযোগ্য । তাই আমাদের মালিক তাদেরকে ধ্বংশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ।
আজ রাতই এই জনপদের শেষ রাত । এই জনপদ ধ্বংশের জন্যই আমাদের আগমন’ ।

বিস্ময়ে চোখ কপালে উঠলো লূত আঃ এর । ভয়ে সারা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠলো ।
হায়রে দুর্ভাগা জাতি ! পারলেন না তিনি । পারলেন না তাদেরকে সত্য ও সুন্দরের পথে আনতে ।

যুবক থামলো না । বলেই যেতে লাগলো ।
‘রাত ভোর হওয়ার অনেক আগেই আপনি আপনার পরিবারের সদস্যদের আর আপনার হাতেগুনা অনুসারীদের নিয়ে এই এলাকা ত্যাগ করবেন । আর...’ একটু ইতস্তত করলো যুবক, ‘আর আপনার স্ত্রীকে পেছনে ফেলে যাবেন । সেও ধ্বংশপ্রাপ্তদের একজন ।
আরোও একটা কথা । চলে যাবার সময় কেউ যেন ভুলেও পেছন দিকে না তাকায় । যতো কোলাহলই কানে যাক না কেন । সাবধান !’

ঝিম্ মেরে রইলেন হযরত লূত আঃ অনেক অনেকক্ষন । তারপর একটা কথাও না বলে আল্লাহ্‌র নবী ফেরেশতাদের নির্দেশমতো ভোর হওয়ার আগেই এলাকা ত্যাগের প্রস্তুতি গ্রহনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ।

(২)
ভোর ।
তখনও সূর্য্য পূবাকাশে উঁকি দেয়নি । দূরে কোথাও একটা মোরগের ডাক শুনা গেল । কন্ঠটি কেমন যেন কান্নার মতো । চারপাশে বাতাস হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেছে । গাছের পাতারাও যেন নড়াচড়া করতে ভুলে গেছে । এক মহা প্রলয়ের আশংকায় সমস্ত চরাচর রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে ।

তারপর । তারপর এলো সেই মুহূর্ত ।

আচানক দোলে উঠলো পৃথিবী ।পায়ের নীচে মাটি থরথর করে কাঁপতে শুরু করলো ।
চড়চড় করে ফাটতে লাগলো ভূপৃষ্ঠ । ভীষনভাবে দেবে যেতো লাগলো বাড়ি-ঘর রাস্তা-ঘাট এখানে ওখানে । কোথাও কোথাও ভূগর্ভ থেকে প্রবলবেগে লক্ষ কোটি ভারী শিলা উৎক্ষিপ্ত হতে থাকলো শূন্যে । তারপর সেগুলো সজোরে ভেঙ্গে পড়লো মাথার উপরে । নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধের আতংকিত আর্তনাদ, কান্না আর গোঙানীতে যেন রোজ কিয়ামত শুরু হয়ে গেল চারদিকে ।

অনেকক্ষন ধরে চললো এই তান্ডবলীলা । তারপর একসময় থেমে গেল সবকিছু ।
যতদূর চোখ যায় কোন প্রাণ বা জনপদের কোন চিহ্নও রইলো না আর । কেউ কোনদিন বলতেও পারবেনা এইখানে একদিন প্রাণের কোন চিহ্ন ছিল । এইভাবেই নিজ হাতে নিজেরই সৃষ্টি ধ্বংশ করলেন মহান রাব্বুল আলামীন ।

একসময় ভূগর্ভ থেকে কুলকুল করে পানি উঠে ছড়িয়ে গেল আদিগন্ত । ধ্বংশযজ্ঞের উপর তৈরী হলো বিশাল এক সাগর ।
মৃত সাগর যার নাম ।
..............................................
( সুরা আল আ’রাফ এবং সুরা হুদ অবলম্বনে রচিত ।)
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই এপ্রিল, ২০১৪ বিকাল ৩:৪৬
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×