সময়টা সম্ভবত ২০০৬ সাল।
যতদূর মনে পড়ে এস. এস. সি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় একদিন শুনি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাড়িতে 'সাধারন ছাত্রছাত্রীরা' হামলা করেছে। সারা বাংলোতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। সবকিছু তছনছ করে দেয়া হচ্ছে। বিশাল ক্যাওস!
ভার্সিটির কাছাকাছি থাকার কারনে তৎকালীন ভিসি মোসলেউদ্দিনের ব্যাপারে টুকটাক জ্ঞান ছিল। বিএনপিপন্থী এই ভদ্রলোকের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত ছিল না ছাত্র-শিক্ষকদের। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলপ্রীতি, নিয়োগ বাণিজ্য টাইপের যত আকাম-কুকাম ভিসির চেয়ারে বসে করা সম্ভব তার সবই করেছিলেন তিনি।
সুতরাং তার বাড়িতে হামলা একটা দেখার দৃশ্য হবে নিশ্চিত ভেবে বন্ধুরা মিলে রওয়ানা দিলাম। যদিও ভার্সিটির মূল ফটক ছিল বন্ধ, কিন্তু আমাদের আটকায় কে? ঘুর পথে বাংলোর কাছাকাছি গিয়ে রণহুংকার শুনেছি আর দেখেছি উড়ন্ত কালো ধোঁয়া।
ধ্বংস যজ্ঞ কাকে বলে সেদিন বুঝেছিলাম। পরের দিন পত্রিকা-টিভি দেখেও জেনেছিলাম। রীতি মত গাছপালা ভেঙে, আগুন ধরিয়ে, ঘরের ভেতর লুটপাট চালিয়ে, ভিসির বৃদ্ধা মা সহ স্ত্রী,পুত্র,কন্যাদের ছাদে পাঠিয়ে ম্যাসাকারের এক শেষ করা হয়েছিল। নেতৃত্বে অবশ্যই ছিল ছাত্রলীগ, কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই সেটি ছিল সাধারন ছাত্রদের 'আন্দোলন', আমি জানি। আমার পরিচিত নন-পলিটিক্যাল অনেক বড় ভাইই এই সব ভাঙাভাঙিতে সক্রিয় ছিলেন। শোনা যায় ভিসির স্ত্রীর গয়নাগাঁটিও নাকি লুটপাট করা হয়েছিল। সত্য-মিথ্যা জানি না। তবে এক ভাইয়ের মুখে ফ্রিজে রাখা মিষ্টির প্যাকেট সাবাড় করার গল্প শুনেছিলাম, মনে পড়ে। আরো শুনেছি হুইস্কি,বিয়ারের বোতল মেরে দেওয়ার কাহিনি। এগেইন, সত্য মিথ্যা জানি না।
তবে ধ্বংস যজ্ঞ হয়েছিল, এটুকু নিশ্চিত। ভিসির পরিবার পরিজন ভয়ংকর একটা দিন কাটিয়েছিল এটা নিশ্চিত। তো গতকাল মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের কলাম পড়ে বারবার ঐ ঘটনার কথা মনে পড়ছিল। সেই সময়ও তিনি শাবির শিক্ষক ছিলেন, বলাই বাহুল্য। তিনি ঐ ভিসিকে (বা তার পরিবারকে) বাঁচানোর কোন চেষ্টা করেন নি, ভিসিবিরোধী ছাত্রদের ওপর তাঁর যথেষ্ট প্রভাব থাকা সত্ত্বেও। ঐ হামলার প্রতিবাদে কোন কলামও লেখেন নি। তো সেই জাফর স্যার যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার প্রেক্ষাপটে লেখেন-
"একজন ভাইস চ্যান্সেলরকে তার অফিসে দিনের পর দিন আটকে রাখা খুব বড় একটা অন্যায় কাজ।
কিংবা, যখন লেখেন-
"সাধারণ মানুষ যখন দেখে- এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা স্বাধীন দেশের একজন নাগরিককে জেলখানার মতো একটা ঘরে আটকে রেখেছে, তখন তারা নিশ্চয়ই হতবাক হয়ে যায়। সবচেয়ে বিচিত্র ব্যাপার হচ্ছে, এই পুরো প্রক্রিয়াটার নাম দেওয়া হচ্ছে ‘আন্দোলন’।"
বা, যখন বলেন-
"অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে, শাস্তি হবে। কিন্তু আগেই নিজেরা শাস্তি দিয়ে একজনকে তার মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হবে সেটি কোন দেশের বিচার?"
অথবা, লেখেন-
"পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা খুব ভয়ঙ্কর উদাহরণ তৈরি হলো। কোনো একজন মানুষকে পছন্দ না হলে, তাকে সরানোর জন্য কয়েকজন কিংবা অনেকজন মানুষ একত্র হয়ে তাকে একটা ঘরে আটকে ফেলতে পারবেন। এর জন্য কাউকে কৈফিয়ত দিতে হবে না।"
তখন খানিকটা হাসি পায় বৈকি
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০১৩ রাত ১০:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


