
অক্ষমের দিনলিপি
[সমসাময়িক যন্ত্রনার কাব্য]
কিছু কিছু শব্দ আর যন্ত্রনার ভেতর দিয়ে আমাকে হেটে আসতে হয় একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার অফিস পর্য্যন্ত । নিত্যদিন এ এক মানুষের জীবন যুদ্ধের আখ্যানভাগ ।
বস্তুত অবিরাম সেই শব্দাবলী আমায় ধরে রাখতে পারেনা কিছুতেই । আর পারেনা বলেই মোট সাতটি ব্যাংক, তেরটি ঔষধের দোকান, সাড়ে ছয়টি মুদিখানা, দশটি খাবারের দোকান আর ছয়-ছয়টি আধা ঝলমলে বিপনীবিতান পিছে ফেলে অনেকগুলো ধুসর তোবড়ানো মুখের পাশ কাটিয়ে হেটে এসে পত্রিকা অফিসটাকে নির্ভুল লক্ষ্যভেদ করে ফেলি । খাবারের দোকানের সামনে ঘুরঘুর করা বস্তির আধা উলঙ্গ ছেলেমেয়েদের দিকে কোনও হৃদয়বানের ছুঁড়ে দেয়া রুটির টুকরোর উপর ওদের ক্ষুধিত দৃষ্টিটা, একটা চক্চকে ছুঁরির ফলার মতো আমাকে তাড়া করে নিয়ে যায় সকাল থেকে বিকেল, বিকেল থেকে সন্ধ্যায় । কঠিন কংক্রীটের পথ থেকে একটা পাকাল মাছের মতো ছিটকে বেড়িয়ে এসে পত্রিকা অফিসের আরামদায়ক নিজস্ব চেয়ারটা দখল করে বসি পৃথিবীর সবচেয়ে নির্বিকার লোকটির মতো ।
যখোন ব্যাংকের সামনে বসে থাকা তিনটে ভিখিরীর চোখের যমজ পেন্ডুলাম থেকে অতিকায় কোনও লাল গাড়ী ছিটকে বেড়িয়ে আসে আশ্চর্য্য সব ঘন্টাধ্বনি বাজিয়ে তখোন যন্ত্রনার কাঁটাগুলো বুকের মাঝে আমূল বিদ্ধ হয়ে গেলে, গতকাল দেয়া কোনও রাজনৈতিক নেতার প্রদত্ত ভাষনের একাংশ , যিনি নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে দরকারী লোকটি বলে ভাবেন, ভাবেন তার সবল হাতে উঠে আসবে মুঠো মুঠো সোনা, বদলে যাবে যাবতীয় অসুখি মুখ; তার বয়ান তরজমায় কলম রাখি । কাটাকুটি করতে চাই ভাবের , বড়শিতে গাঁথতে চাই তার না বলা কথার কারূকাজ, শব্দ গেঁথে গেঁথে উদোম করে দেখাতে চাই - সে যে এক উলঙ্গ রাজা । প্রবল পরাক্রমশালী সম্পাদক মহাশয় নিদারূন বিতৃষ্ণার সাথে তাতে ঘ্যাচ করে কাঁচি চালিয়ে দেন । আমি মাসকাবারী খোরাকের অনিয়মিত নিশ্চিন্ততায় নিঃশ্চুপ থাকি ।
বিশ্বাস করুন হে দেশবাসী ; আপনাদের তৈরী করে দেয়া এই ঘেরাটোপে আমাকেও যে একই বাতাস টেনে নিতে হয় । বাতাস টেনে টেনে আমি আপনাদেরই একজন হয়ে ওঠার চেষ্টায় নিরত থাকি দিনভর ।
তবুও ভেতরের আমি সম্পাদক সাহেবের মতো নই , যিনি নির্বিকার সম্পাদকীয় লিখে যেতে পারেন । আমি রাস্তার পাশের সেই ঔষধ ফেরিওয়ালার মতো নই, যিনি বিনা বাঁধায় অমরত্বের গ্যারান্টি দিয়ে থাকেন অথচ যার ঘরে তিন বছরের শিশু ছেলেটা আমাশয় ভুগে ভুগে যে কো্নও মুহূর্তে ওপারের অপেক্ষায় । আমি সেই তারুণ্যে টৈ-টুম্বুর যুবকদের মতোও নই, যারা মাছের মতো সাঁতার কেটে আসা কী সব ফুলপাখির নক্সা আঁকা রিক্সায় যুবতী মেয়েদের লো-কাট ব্লাউজের নীচে বাসনার লুকোচুরি খেলা দেখে । আমায় প্রতিদিন অমোন কতো লুকোচুরি খেলা দেখতে হয় বস্তির সুফিয়া আর জরিনার ছেঁড়া ফাঁটা কাপড়ের ফাঁকে ফাঁকে।
তবুও আমি কারো মতো নই । আমি সেই প্রতিবাদী যুবকের মতো নই, যে দৃপ্তকন্ঠে স্বৈরাচার নিপাত যাক বলতে পারে । আমি সেই ধুসর ছোপলাগা চুলের বুদ্ধিজীবি নই, যে অকাতরে জ্ঞান বিলোতে পারে জনে জনে । আমি সেই লোকদের মতোও নই, যারা ভীড় উপচে পড়া বাসে অবলীলায় ঠেলেঠুলে উঠে যেতে পারে কারো তোয়াক্কা না করে । জনাকীর্ণ ভাঙাচোরা পথে , নোংরা উপচে পড়া নর্দমার জলকাদা ভেঙে ভেঙে নিঃশ্চিন্তে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে হেটে যাওয়া লোকটির মতোও নই আমি ।
অথচ আমার যে অনেক কিছুই হতে ইচ্ছে করে ।
হাতের মুঠিতে , বাহুর পেশীতে সে বিশ্বাসের জোর নেই বলেই আমি - “আমি” ই থেকে যাই ।
বস্তুতঃ কোনও কিছুতেই অক্ষত বিশ্বাস নেই বলেই আমি কারো মতোন হতে পারিনে । পারিনে বলেই আমার সামনেই জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে যে লোকটা পৃথিবীর সবাইকে করুনা করবে বলে জনাকীর্ণ সদর সড়কের উপর লাফিয়ে পড়েছিলো পাশের দালানের ছাঁদ থেকে , তাকে তো আমি বলতে পারিনি, “মৃত্যুই বন্ধু নয়” ! আমি শুধু একটা ভীতু শামুকের মতোই নিজেকে গুটিয়ে ফেলি যন্ত্রনার শব্দ শুনতে পেলেই । নৃশংস প্রাত্যহিকতার কাছে মার খেতে খেতে তৃষ্ণায় আকন্ঠ শুকিয়ে গেলে রাজনের মতো আমিও “ পানি...পানি...” বলে চীৎকার করি । এতো জল ভরা পৃথিবীতে আমার জন্যে দু’আজলা জলও মেলেনা । বাতাসের জন্যে হাপিয়ে উঠি । কিন্তু হে জনতা, আপনারা আমার পশ্চাৎদেশে যান্ত্রিক বাতাস ঢুকিয়ে আমার আর্তচীৎকারে কান পেতে রাখেন পৈশাচিক উল্লাসে ।
আমি পারিনে , কিছুতেই পারিনে একটা নিশ্চিত সুখের বিজ্ঞাপন লটকে দিতে সমুদয় অসুখী দেয়ালে । আমি শুধু পালাতে চাই । তাড়া খাওয়া পশুর মতো আমি যে পালাতেই চাই । কিন্তু কোথায় যাবো ? আমি যে পালাতেও পারিনে ! কেউ জানেনা, কী দূর্বিসহ জ্বালায় আমায় আবার লোকালয়ে ফিরে যেতে হয় । তখোন ঘুমঘুম ভোর আলস্য ঝেড়ে দুপুরের দিকে হেটে গেলে তার সাথে এসে দাঁড়াতেই হয় পথে । একটা শ্বান্তনা পাওয়ার আশায় তখোন আমার নিরাপদ গন্তব্যের দিকে ছুঁটতে থাকি আমি উর্দ্ধশ্বাসে । পত্রিকা অফিসের ব্যক্তিগত চেয়ারে বসে প্রতিদিনকার মতো লিখে ফেলি কোনও মহান নেতার কণ্ঠনিঃসৃত “ মধ্য আয়ের দেশ ” এর বিস্তারিত রিপোর্ট ।
আসলে এছাড়া অন্য কিছু করার থাকেনা আমার কাছে প্রতিদিন ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

