অফ হোয়াইট শার্ট
© রেজওয়ান মারুফ জয়
কাউরে কিছু গিফোট্ (gift) করা একটা মডারোন্ (modern) ব্যাপার। মেষপালক, রাখাল বালক কোথাকার! রাখাল বালক অপমানিত হয়ে চলে যাবে – এরপরের দৃশ্যটা এমন। কিন্তু নাহ্ ! তা দেখা গেল কই আর? এই গরম এলেই কারেন্ট টালবাহানা শুরু করে দেয়। ফজলুর রহমান বাবুর অভিনয়ের ভক্ত সাদিয়া। ‘ঢোলের বাদ্য’ নাটকটার অর্ধেক যেতে না যেতেই কারেন্ট চলে গেল। ল্যাপটপ না, যে ব্যাকআপে বাকিটা দেখবে। বাসায় ইউপিএসও নাই। মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। ছাদে যেতে হবে। এই গরমে গাছের পাতা নড়ে না একটাও। তবু কী কারণে যেন ছাদে উঠলে শরীর-মন দুই-ই ঠাণ্ডা হয়ে যায়। আরো একটা কারণ আছে ছাদে ওঠার। আকাশ দেখার অভ্যাস যার, ঘরের খোলা ছাদ তার বন্ধু হতে বাধ্য। অবশ্য আগে অভ্যাসটা ছিল না। করিয়েছে একজন।
একজন রমিজ। হাসান শাহরিয়ার রমিজ। ডাকনামটা সেকেলে। তাই সেটাকে কেটে-ছিঁড়ে ‘রমি’ নামে ডাকে সাদিয়া। অবশ্য রমিজকে সে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। ‘রমি’ নাকি ভালোবেসে দেয়া নাম। যাই হোক, আমাদের এতো ভালোবেসে কাজ নাই। আমরা রমিজই বলবো। এই মানুষটা বেশ রোমান্টিক। বাইরে প্রকাশ নাই। ভেতরে ভেতরে, খুব গভীরে। কিন্তু সাদিয়া অতটা গভীরে না গিয়েই প্রেমে পড়েছে, তারপর মিষ্টি কথার ঘেরাটোপে রমিজকে তার ‘রমি’ বানিয়েছে। নামের সাথে রমিজের বাড়াবাড়ি রকমের উদ্ভট স্বভাবগুলোকেও নিজের মতো করে বদলে নিয়েছে সাদিয়া। না হলে যে মোটেই কথা শোনার লোক না, সে কী করে সাদিয়ার অন্ধভক্ত হয়ে যায়? পুরোটাই সাদিয়ার কৃতিত্ব।
রমিজ সাদিয়াকে প্রচণ্ড ফিল করে আর ভালোবাসে। কিন্তু প্রকাশ করে কম। কিন্তু সাদিয়া কি বাসে? মুখে মুখে ত বাসে। সাদিয়ার জন্য এটা দরকারও। অবশ্য মন থেকে ভালোবাসা বললেই হয়ে গেল না। এজন্য আপনি যাকে ভালোবাসবেন তার থেকেও সাড়া থাকতে হয়।
সাড়া যে রমিজ দেয় না, এমন না। কিন্তু যা ও বা দেয়, তা যুগের সাথে যায় না। সেই পুরনো দিনের অ্যানালগ আবেগ, চিঠি আর রোমান্টিক ডায়ালগে কি এখনকার ভালোবাসার চিড়ে ভেজে? মোবাইল, এসএমএস আর ফেসবুকের যুগে এসব ত ছাইপাশ। ও হয়তো বুঝতে পারে না কোনটা কোনটা ওর ত্রুটি, কিন্তু বোঝা উচিত। সবটা কেন একা সাদিয়াই ধরিয়ে দেবে? মেকআপ-গেটআপ-আঞ্চলিকতা শুধরেছে সাদিয়ারই হাত ধরে, কিন্তু উদ্ভট স্বভাবগুলোও ত পাল্টাতে হবে। সেগুলোকে ত হাতে ধরে পাল্টে দেয়া সম্ভব না।
এখনও এই ছেলে বাবার হাত ধরে নিউ মার্কেট যায় শার্ট কেনার জন্য। তবে বেশ উন্নতি হয়েছে। কালারটা সাদিয়ার পছন্দে কালো দেখে কিনেছে। টাকাটা সাদিয়া দিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু রমিজের সরল জবাবে যেন প্রাণঘাতী গরল মেশানো – পারলে বাবার হাতে দিয়ে আসো গিয়ে!
বলা নেই কওয়া নেই সেদিন চৈত্রমাসের গরমের মধ্যে সেই কালো শার্টের ওপর একটা কালো চাদর জড়িয়ে রমিজ সাদিয়ার বাসার সামনে হাজির। নির্ঘাত ফিজিক্সের অপটিক্সে কাঁচা এই ছেলে। কবে যে এইসব রোগ সারবে ওর, বুঝে ওঠেনা সাদিয়া। সবিস্তারে কারণ বলার আগে যে পরিমাণ ঘাম কপাল আর মুখমণ্ডল থেকে ঝরালো, তা দিয়ে একটা আড়াইশো এমএল সফট ড্রিঙ্কসের বোতল পূর্ণ করে ফেলা যাবে। এতো ঘাম যুগপৎ টেনশন এবং গরমে সৃষ্ট।
--- দেখো, তোমার কালো রঙ পছন্দ, কিন্তু শার্টটা পুরোপুরি কালো রঙের ম্যানেজ করা যায়নি, তাই সেইটুকু ঢাকার জন্য চাদরটা পরে আসছি। কিন্তু তুমি ত ফোনে বলছিলা যে, তুমি থ্রিপিস খুব পছন্দ করো, কই? তোমার ওড়না কই? ঘাম মোছাই দিবা না?
--- বাসায় ত, তাই থ্রিপিস পরি নাই, শার্ট-প্যান্টেই কমফোর্ট ফিল করি। বাট আমি থ্রিপিস অন্নেক লাইক করি। আর ঘাম মোছার কথা বলতেছ ক্যান? এটা কি ঢাকা পাইছ? যে ভাব নিতেছ তাতে ত মনে হয় ঢাকা গেলে রুমে নিয়া যাবা!
--- কেন বল ত?
--- কেন আবার? রুম ডেটে!
--- সেটা কী?
--- সেটাও বুঝো না? গাধা!
--- না।
--- বোঝা লাগবে না। তাড়াতাড়ি যাও, আব্বু আসছে! দেখলে খবর আছে। ফোন দিও।
ভয় পেয়ে দৌড় দেয়ার সময় রমিজ সাদিয়ার হাতে একটা ক্যান্ডেল দিয়ে যায়। হার্ট শেপের। যাওয়ার পথে ফোন বেজে ওঠে রমিজের। 1 new message. ফোল্ডার খুলে দেখলো সাদিয়া লিখেছে – “awsm hoise candle ta. thanx
ক্যান্ডেল যে ভালোবাসার প্রতীক, এটা রমিজ জানতো না। শিলু বলেছে। আড়ং থেকে হার্ট আকৃতির একটা ক্যান্ডেল ও-ই কিনতে বলেছিল সাদিয়ার জন্য। তুরিন অবশ্য বলেছিল আপেলের প্রস্থচ্ছেদের শোপিস নিতে। ওটাও নাকি একই কাজ দেয়। এসব ব্যাপারে ভালো ধারণা নেই রমিজের। প্রথম প্রেম ত...। মেয়েঘটিত বিষয়গুলোতে খুব লাজুক ছেলেটা। সম্ভবত এটাই ছিল রমিজ-সাদিয়ার প্রেম ভেঙে যাওয়ার পরোক্ষ অথচ প্রধানতম কারণ। সেকথায় পরে আসি।
সাদিয়ার মেজাজটা তিরিক্ষি সকাল থেকে। এখন ছাদে যেতে মন চাচ্ছে না। সুমাইয়াকে মনমতো মারতে পারলে হতো। মেজাজটা ওর ওপরই গরম। ও সাদিয়ার ছোটবোন। ক্লাস ফোরে পড়ে। বরিশাল সদর গার্লসে। মাত্রাতিরিক্ত চালাক আর দুষ্টের হাড্ডি। বড়দের সবকিছুতে ওর বোঁচা নাকটা গলাতেই হবে। দেখতে সুশ্রী হলেও নাকটা বেঢপ। বাসার এমন একটা জিনিস নাই যেটা ওর কাজে না লাগবে। তাই বলে ক্যান্ডেলটাও লাগাতে হবে? সকাল সকাল দশাসই এক কামড় বসিয়ে দিলো নির্দোষ ক্যান্ডেলটার ওপর! এর কোনো মানে হয়? ঢাকায় গিয়ে রুমমেটদের কী দেখাবে এখন? শত হলেও বয়ফ্রেন্ডের দেয়া। মেজাজ আরো খারাপ হল যখন মা জিজ্ঞেস করলো, কীরে? সুমাইয়া নাকি কী একটা লাল ফল খেয়েছে? তুই নাকি এনেছিস ওর জন্য?
৩ দিন পর। সাদিয়া ঢাকা যাবে। লঞ্চে। মেয়েরা সাধারণত লঞ্চেই যায় বেশি। এমন অনেক মেয়ে আছে যারা ভাবে ঢাকা যাওয়া মানেই একটা রকিং লঞ্চজার্নি। যাহোক, বরিশাল লঞ্চঘাটে এলো রমিজ। সাদিয়াকে সী অফ করতে। লঞ্চে ওঠা যাবে না। ঘাটে লঞ্চের পাশে থাকলেই চলবে – সাদিয়ার অর্ডার। মদনটা আজও সেই হলুদ হিজিবিজি প্রিন্টের শার্টটা পরে এসেছে। লঞ্চের ব্যালকনিতে এসে একবার দেখেই কেবিনে চলে গেল সাদিয়া। এখন আর বেশি ব্যালকনিতে থাকা ঠিক হবে না, সন্ধ্যা নেমেছে অনেক আগেই। কয়েকদিন পর ঢাকা যাবে রমিজ। তখন শার্ট ইস্যুর বিচার হবে ওর।
ঢাকায় হোস্টেলে পৌঁছে সাদিয়া দেখলো দুনিয়া মোটামুটি চেঞ্জ হয়ে গেছে। ওর রুমমেট দুজন নতুন রুমে চলে গেছে। এখন ওর নতুন দুই রুমমেট ঘুমে আচ্ছন্ন। সকাল ৬ টা ১৫ বেজে আছে দেয়ালঘড়িতে। সম্ভবত নষ্ট। ঠিক থাকলে ত কাঁটা নড়ত। মোবাইল বের করে দেখে সকাল ৭ টার মতো বাজে। লঞ্চের কেবিনে ঘুমটা ভালোই হয়েছে। সকালবেলা, রাস্তা ফ্রী ই ছিল। কিছুক্ষণ বাদে ওদের সাথে পরিচয় হল। জুনিয়র। কোচিং করতে এসেছে। অ্যাডমিশনের। বেশ এক্সট্রোভার্ট মেয়ে দুটো। একই এলাকার। বাড়ি খুলনার আশেপাশে কোথাও। মিষ্টি কথাবার্তা। জিজ্ঞেস করে জানলো সাতক্ষীরা ওদের দেশের বাড়ি। দুজনই প্রেম করে। সাতক্ষীরায়ই। একই ড্রেস পরা দুজন। আলাপে জানলো, ওদের বয়ফ্রেন্ডরা দিয়েছে। মিলিয়ে কেনা। আচ্ছা, রমিটা কি কোনোদিন দেবে ওকে? খুব কেয়ারলেস ছেলে। দেয়াটাই বিস্ময়ের। এর মতো ইনফরমাল ছেলে দিয়ে আসলে চলে না।
পরের সপ্তাহে রমিজ ঢাকায় এলো। সেদিন দুপুরে দেখা করে প্রথমেই রুচি-পছন্দ ইস্যুতে ঝাড়ি রমিজের মুডটাই অফ করে দিলো সাদিয়া। সেদিন পুরোপুরি থমথমে একটা ডেটিং সেরে ওরা যার যার জায়গায় চলে গেল।
তারপর টানা ৫-৬ দিন আর রমিজের দেখা নাই। ফোনও বন্ধ। এরপর ক্লাসের প্রেসার বয়ে বেরিয়ে দুজনই চুপচাপ। যোগাযোগের ফুরসৎ মিলছিলো না।
দুই মাস পর। সাদিয়া ইদের ছুটিতে বরিশালে। রমিজও তাই হয়তো। যাক, সারপ্রাইজটা এখানেই দেয়া হবে। রাজীবকে ডেকে পাঠিয়ে স্টাইলস ডট কম এর শোরুমে ঢুকল সাদিয়া। সাথে রুমানা। ওকে সাথে এনেছে, তবে কিছু বুঝতে দেয়া যাবে না। ওর থেকেই ত রমিজকে বাগিয়ে নিয়ে প্রেমের ক্যারিয়ার শুরু করেছে সাদিয়া। পরবর্তী টার্গেট হানিফ, মীমের ক্রাশ।
সাদিয়া ভালো দামদর করতে পারে না। তাছাড়া রমিজের আর রাজীবের ভাইটালস একই বলা যায়। রাজীব আসতেই মাপজোক করে শার্টের দাম চুকিয়ে বাসায় ফিরল সাদিয়া। পথে বাসায় নামিয়ে দিলো সাদিয়াকে। বাসায় গিয়ে প্রথমেই শার্টের বোতামগুলো লাগাতে হবে যাতে বেচারার আর ছোটাছুটি করতে না হয় খলিফার কাছে। অফ হোয়াইট কালারের সূতা পাওয়া কি সোজা কথা?
প্লান করাই ছিল। গরমে ঘেমে যাতে শার্টের কলার নষ্ট না হয়, সেজন্য একটা রুমাল সেট করে দিলো কলারে। চুপচাপ ওর বাসায় দিয়ে আসার আগে পার্মানেন্ট মার্কারে রুমালের গায়ে লিখে দিলো রমিজের উদ্দেশ্যে প্রথম ও শেষ চিঠি –
“ ভুলে যাও, সুখে থেকো। আমি পরবর্তী মিশনে যাচ্ছি। ক্ষমা করো। আর শার্টটা ফেলে দিও না। এটা প্রেমের স্মৃতি। - সাদিয়া ”
পুনশ্চঃ অফ হোয়াইট শার্টটা রমিজের বরিশালের বাসায় আলনায় হ্যাঙ্গারে ঝোলানো। সেই থেকে – ছিল, আছে, থাকবে। প্রথম প্রেমের স্মৃতি রমিজরা হয়তো গায়ে জড়ায় না কখনো, তবে ফেলে দেয়ার সাহসও করে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


