somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বোধোদয়ের অপেক্ষায়...

০৩ রা জুলাই, ২০১৩ রাত ১১:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বোধোদয়ের অপেক্ষায়
©রেজওয়ান মারুফ জয়



ধুর! জীবনটা পানসে। কোনো লাইফ নাই এই লাইফে। খালি পকেটে রাস্তায় হাঁটলে আজকাল ভিক্ষুকও ভ্রূকুটি করে

-নাইম্যা পড়েন মোর লগে। একলগে খামু চাইড্ডা। ঢাকা শহর ঘুরমু ফাও।

সেজান পয়েন্টের পাশের বিল্ডিংয়ের ৫০৪ নম্বর রুমটায় ফর নাথিং কিছু ফ্যাসিলিটি বাড়িয়ে ৫০০ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে শুধু এই রুমটা থেকে। ফর নাথিংই। যার ল্যাপি বা পিসি কিছুই নাই, তার জন্য ইলেকট্রিক পয়েন্ট সারিয়ে দেয়া; যার বারোমাস পুকুরে ডুবসাঁতার খেলে গোসল করার অভ্যাস, তার জন্য টাইল্‌স্‌ড বাথরুমে হ্যান্ড শাওয়ার বসানো- এগুলো অত্যাচার না হলে আর কী? অন্যরা হাসতে হাসতে মানলেও হাফিজ এই কারণে কাঁদতেও নারাজ। মূল বিষয়টাই তার জন্য একটা বোঝা। অন্য কোথাও যাবে, তারও উপায় নেই। দুই বছর হল এই মেসে। এমনিতে এই পরিবেশটা তার খারাপ লাগে না। পাক্কা তিন মাসের অ্যাডভান্স ভাড়া দেয়া। সুমন ভাইয়ার কাছে গুনে গুনে টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন রশিদ সাহেব। এই অবস্থায় অন্য কোথাও যাওয়াটা একেবারে অসম্ভবের কাছাকাছি একটা ব্যাপার।

হাফিজ ঢাকায় চলে নিজের পয়সায়। টিউশনি আছে একটা। মাসে চার হাজার টাকা। বাড়ি থেকে সাপোর্ট নাই- একবছর হল। অপরাধ-

-বড় মুখ কইর্‌রা কোচিং করতে গেলি, আর ঘোড়াড্ডিম পাড়লি। হইলো কিছু এইডা?

কিছু আসলেই কখনো হয় না হাফিজকে দিয়ে। এটা ওর স্বীকারোক্তি। নির্লিপ্ত স্বীকারোক্তি। ইন্টার পরীক্ষার অ্যাটেনডেন্স শিটেও লালকালিতে A লেখা ওর নামের পাশে। দোষটা ওর নিজেরই। ফিজিক্স প্রথম পত্র পরীক্ষায় ও জানা জিনিস গুলিয়ে খেয়ে ফেলার পর থেকে আর পরীক্ষাই দেয়নি। পরে জানা যায় ও নাকি চট্টগ্রাম ঘুরে ফুরফুরে হয়ে এসে প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা দিতে হাজির। সেখানে ইন্টারনালের ঝাড়ি খেয়ে সেবার উচ্চমাধ্যমিক যাত্রাভঙ্গ। পরেরবার অ্যাটেনডেন্স শিটের লাল দাগের A হল একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্টের কালো দাগের A+। তারপর আবার যেই সেই। বাংলাদেশের প্রায় কোনো ভার্সিটিতে চান্স হয় না আর। হ্যাঁ, প্রায়। কারণ, শেষ পর্যন্ত ঘরের কাছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হল। ভর্তিযুদ্ধে ফার্স্ট টাইমই বলা যায়। কিন্তু নাক সিটকানো স্বভাব যার, সে কি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পড়তে পারার মর্ম বুঝবে? আজকালকার ছেলেপেলেদের মধ্যে কিছুসংখ্যক এমন হয়, যারা সেই মহাজ্ঞানী রোগী, যে অভিজ্ঞ ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনকেও তুচ্ছজ্ঞান করতে করতে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে-

-ধুরো! অ্যা কী ওশুদ দেছে? অ্যার চাইতে ভালো ওশুদ বাজারে নাই? না আমরা ওশুদ চিনি না?

হাফিজ তেমনই। সে বাংলা পেয়ে খুশি হতে পারেনি। তার যুক্তি-

-বাংলা মাইনসে পড়ে? ডিপারমেন্টে টিচার নাই ভালো। অ্যা পড়া আর না খাইয়া মরা হোমান কতা!

এসব কুযুক্তিতে ভর করে সে সেকেন্ড টাইম (আসলে থার্ড টাইম) অ্যাডমিশনের কোচিং করতে ঢাকা উঠেছে সেই ৫০৪ এ। এজন্য বাসায় কী হয়নি? যা হয়েছে তা দিয়ে ‘বাপ-ছেলের যুদ্ধ’ টাইপের শাকিব খানের বিপুল বাজেটের একটা ছবি হয়।

যাই হোক বরিশালে অজস্র বন্ধুবান্ধব থাকার পরও ভর্তি ক্যান্সেল করে আসা হাফিজ কিন্তু আর কোথাও চান্স পেল না। একেবারে পরিস্কার বোল্ড আউট যাকে বলে। ওর বরিশালের লাইফটা নিয়ে রশিদ সাহেব যতোটা খুশি ছিলেন, এই বোল্ড আউট লাইফটার ওপর ততোটাই নাখোশ হয়ে ছেলেকে বিধি-নিষেধের আড়ালের রাস্তা দেখিয়ে দিলেন।

রাস্তাটা ভুল না ত! এই রাস্তায়ই ত এতদিন ওয়াসিদের বাসায় যেতো হাফিজ। দুদিন আগেও গেছে। তখন ত কিছু বলেনি ও। ওরা একদিন বাদেই এভাবে হাফিজের চারটা হাজার টাকা মেরে তল্পিতল্পা গুটিয়ে দেশে চলে যাবে- ভাবতে ইচ্ছা করে না ওর। আর্নিং সোর্স বলতে এটাই ছিল। আব্বা ত পয়সা দেয় না। নিজের গতি নিজেকেই করতে হয় হাফিজের। এখন ত স্থির হয়ে যাবে জীবনচাকা। ঢাকার গার্জিয়ানগুলো অতি সচেতন হওয়ায় টিউটরদের একটা কমন সমস্যা হল, শিক্ষাগত যোগ্যতার সামান্য অপ্রতুলতা। আজকের গার্জিয়ানরা হাফিজের মতো পৌনে থার্ড টাইম+এক্স বি ইউ যুবককে কিছুতেই সন্তানের দায়িত্ব দেবেন না। তাই হাফিজরা রাস্তায় নেমে বেশিরভাগ সময় ‘টিউটর চাই’ টাইপ বিজ্ঞাপন দেখা পর্যন্তই সার। সেসব পোস্টারে যে চাহিদার ফিরিস্তি! বাপ রে বাপ!

মার্চ মাসের বাজেটউদ্বৃত্ত কিছু টাকা জমিয়েছিল হাফিজ। তা দিয়ে এপ্রিলে দশদিনের মতো চলা যাবে। জমানো টাকা গুনে সাকুল্যে ৯৪১ টাকা পেল সে। ৯৪.১ টাকা করে দশদিন রাজার হালেই চলতে পারবে। বিপদ হবে তারপরই।

দিন যায়, হাফিজের কপালের বলিরেখা স্পষ্ট হয়। ৮ এপ্রিল, ২০১৩। সকাল দশটা। আর একঘণ্টা বিছানায় গড়াগড়ি খেলেই ক্ষুধা থাকবে না। বেঁচে যাবে ২০-২৫ টা টাকা। চলা যাবে আরও এক-দুদিন। দুশ্চিন্তায় কীভাবে কীভাবে যেন ঘুম পেল ওর। স্বপ্নে ডুবে গেল ঘুম আসতেই - পরীক্ষায় রচনা লিখছে হাফিজ। Aim in Life. …….. A life without an aim is like a boat without a radar..….. লিখছে ত লিখছে। তার বাস্তব জীবনটাও আপাতত a boat without a radar. যাহোক, মোস্তাফিজ স্যার তিন আঙুলে টোকা মেরে দেখিয়ে দিয়েছিল হলে আসার আগে।

- Aim in Life, দেইখ্যা যাও এট্টু। পরীক্ষায় আইয়াই পড়ছে মনে হয়!

স্যার ভালোই ত সাজেস্ট করেন!

ফোন ভাইব্রেট করছে বালিশের নিচে। স্বপ্ন ভাঙলো হাফিজের। দায়ী সেই মোস্তাফিজ স্যার। লোকটার নাম্বার মুখস্থ। তাই সেভ করার প্রয়োজন পড়ে নাই।

-হ্যালো ছার! স্লামালেকুম!
-ওয়ালাইকুম সালাম। ক্যামোন আছো হাফিজ? চেনতে পারছো আমারে? আমি মোস্তাফিজ!
-জে ছার। ভালো আছি। আমনে?
-আছি। আল্লায় রাকছে। এউক্কা উপকার করা লাগে বাবা।
-কী ছার?
-আমার একটা বন্দুর বন্দু পেরাইমেরি পরীক্ষা দেবে। এট্টু হেল্প করতে পারবা?
-কুম্মে? কবে? ক্যামোন হেল্প?
-আমাগো এই জাগায়। তুমি বাড়ি আবা না? পোরতেক বৈশাখে আও। হেইল্লেইগ্যা ফোন দিছি। আর তোমারে দশ হাজার টাহা দেবে কইছে। আও এট্টু সোনা! রাফিরে কইয়া দিমু। অর লগে লাগলে কতা কইয়া... অয় ত এইসব দিগে ভালো।
-ঠিক আছে ছার। চিন্তা কইর্‌রা দেহি।

ভাবতে হবে। একদিক দিয়ে লস গেছে, অন্যদিক দিয়ে তিন মাসের খরচ ওঠার পথ খুলে গেছে হয়তো। হাফিজের কাছে এখন ৩৫০ টাকার মতো আছে। এটা দিয়ে বাড়ি যাওয়া সম্ভব। দেরি না করে সন্ধ্যার মধ্যে এক কাপড় এক ব্যাগে বরিশাল গিয়ে উঠলো।

৩ দিন পর।

সকাল ১০:৪০। বিশ্ববিদ্যালয় মার্কেটের ফুটপাথ ধরে হেঁটে ক্যাম্পাসে যাচ্ছে রাফি। কানে হেডফোন। বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা... । বিচার মুলতবি করলো একটা কল। অন্যদিন হলে এইসময়ের কলটা হতো ইশানার। কিন্তু না, আজ এখন ও প্রাইমারি নিয়োগ পরীক্ষা দিচ্ছে বরিশালে। কালই লঞ্চে উঠিয়ে দিয়ে এসেছে ওকে রাফি। পরীক্ষার হলে ত ফোন নিতে দেয় না। তাহলে এখন কে? জিন্সের পকেট থেকে ফোন বের করলো রাফি। চৈত্রের কাঠরোদে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না নামটা। স্ক্রীন দেখাচ্ছে Hafij calling.

-কীরে? কেমন আছিস?
-(দ্রুত কণ্ঠে) শোন, আমি হাফিজ।
-বুঝছি। বল।
-বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট ম্যাচ কবে হয়েছিলো?
-১০-১৩ নভেম্বর, ২০০০। কেন?
-সিওর?
-হুম। কেন?
-যাই হোক... তুই আরাকটা ক!
-লজ্জা করে না? এই কাজের জন্য তুই কেন আমারে ফোন করলি? কতো টাকায় বিক্রি করলি নিজেরে?
-টুট... টুট... টুট... (লাইন কাটার শব্দ)

শাহবাগ থানাগেট। বরফের মতো ঠাণ্ডা মাথায় বের হল রাফি। দুটি নাম্বার। হাফিজেরটা আর মোস্তাফিজ স্যারেরটা। স্যার তাকে সকালে দুবার ফোন করেছিল। সে রিসিভ করেনি। হাফিজের কথায় বুঝলো ডাল মে কুছ কালা হে। ওদের দুজনকে আসামি করে জনস্বার্থে মামলা করে এলো তাই। সে এখন অনেকটা নির্ভার। তার কানের পাশ দিয়ে অন্যায়কে পালাতে দেয়নি সে। তার জায়গা থেকে সে আওয়াজ তুলেছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে। আপনি-আমি কী করছি?

[পুনশ্চঃ ১- রাফির জীবনে প্রেম ছিল ১২ এপ্রিল, ২০১৩ সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত। সন্ধ্যায় যখন সে জানলো, ইশানা পরীক্ষার হলে ইনভিজিলেটরের সাহায্য নিয়ে তিন চতুর্থাংশ প্রশ্নের উত্তর করেছে, তখন থেকে তার প্রেমটা আর থাকলো না।]

[পুনশ্চঃ ২- ইশানা, হাফিজ, মোস্তাফিজদের বোধোদয়ের অপেক্ষায় জাতি। রাফিরা কি পারবে এই অচলায়তন ভাঙতে? সমাজকে ঢেলে সাজাতে? আমরা অপেক্ষায় আছি, একদিন দেখব বিজয়।]
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কি করে কি করি, কি যে করি !

লিখেছেন মেহবুবা, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:০৫




আজ বেশ ক'দিন হোল আমার ব্লগবাড়িতে জ্বীন ভূতের কারসাজি চলছে! আধা পৃষ্ঠা জুড়ে কয়েকটি পোষ্ট আসছে, সব আসছে না।নিজ ব্লগবাড়িতে কত কি আয়োজন থাকে ; যেমন মন্তব্য,... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের আন্দোলনরত HSC শিক্ষার্থীদের ধিক জানাই

লিখেছেন অপলক , ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:২০



দেশের কমপক্ষে ৬ টি জেলায় উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা বাতিল ও স্থগিতের জন্যে আন্দোলনে নেমেছে। এরা হল লীগ সরকরারের শিক্ষা ব্যবস্থায় বেড়ে ওঠা তরুন তরুনী, যারা পড়ালেখা না... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোলাপানগুলো এত আন্দোলন বুঝে!

লিখেছেন শূন্য সারমর্ম, ১৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৫৫




পড়াশোনার টেবিল আজকাল অন্যকাজে ব্যবহার হয়, হয়তো ঐখানে বিপ্লবের লাল রং আছে শুধু। লেনিনের রক্ত, গুয়েভারার চুরুট নিয়েও আগ্রহ নেই তাদের, আছে শুধু মহাসড়ক অবরোধ, মিলনকে থাপরাড়োর অদম্য প্রয়াস,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারত কোন ভাবেই স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশে সৈন্য পাঠায়নি!!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:২৬


ভারত কোন ভাবেই বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য সৈন্য পাঠায়নি! সৈন্য পাঠিয়েছিল পাকিস্তানকে বিভক্ত করতে ও তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানকে লুটপাট করার উদ্দেশ্যে। প্রতিবেশি দূর্বল হলে দাদাগিরি করতে পারবে এটাই ছিল ইন্দ্রিরাগান্ধির ভিষন... ...বাকিটুকু পড়ুন

মূল্যটা খুব কম দিইনি...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৫ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২২

মূল্যটা খুব কম দিইনি...

দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত- এই বিশ্বাসকে নিজের সিদ্ধান্তের ঊর্ধ্বে রেখেছি সারাজীবন। কতবার ব্যক্তিগত ইচ্ছা, সুযোগ, এমনকি ন্যায্য অভিমানও গিলে ফেলেছি। কতবার চুপ থেকেছি, শুধু এই বিশ্বাসে যে ব্যক্তির... ...বাকিটুকু পড়ুন

×