
২০১০ সালের আলিম (এইচএসচি) পরীক্ষা শেষ করেছি সবে মাত্র।
সহপাঠীদের অনেকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোচিং শুরু করে দিয়েছিল উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পূর্বেই। পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন একটা ভালো ছিলো না বলে কোচিং করার চিন্তা মাথায় আনিনি। ভাবছিলাম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন একটা কলেজে পড়ার কথা। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সুপ্ত আকাংখা ছিল মনের ভিতর। গ্রামের বাড়ি থেকে শহরের একটা প্রতিষ্ঠানে উচ্চমাধ্যমিক পড়ছি এইতো অনেক। সেখানে আবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছা ছিল আমার জন্য বিলাসিতা। থাকতাম মাদ্রাসার ফ্রি হোস্টেলে (লিল্লাহ বোডিংয়ে)। সেখান থেকে পাবলিক বিশাববিদ্যালয়ে পড়া আমার কাছে স্বপ্নের মতো।
পরীক্ষা শেষ করে বাড়িতে বসে আছি।
এলাকার এক বড় ভাই তখন পড়তো শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি নিয়মিতই আমার খোঁজ খবর নিতেন। আমি যে মাদরাসা থেকে দাখিল শেষ করেছি সেখানকার সিনিয়র ছিলেন। তার মাধ্যমে সিলেট চলে আসি ভর্তি পরীক্ষার কোচিং করতে। নগরীর চৌহট্টার একটা কোচিংয়ে নাম মাত্র ফি তে ভর্তি করিয়ে দিলেন। সিলেট নগরীর খুব কাছে একটা বাসায় লজিং ঠিক করে দিলেন। সেই বাসার তিনজন ছাত্র পড়ানোর বিনিময়ে থাকা খাওয়া ফ্রি। লজিং বাসা থেকে কোচিংয়ের দূরত্ব একেবারেও কম ছিল না। প্রতিদিন যাতায়াত খরচ হতো ৬০ টাকা। সপ্তাহে তিন দিন ক্লাস ছিলো।
সিলেটে যে বাসায় ছিলাম সেখানকার পরিবেশ আমার খুবই ভালো লাগতো। অবশ্য প্রথম প্রথম মানিয়ে নেয়া একটু কষ্টকর ছিল। তার উপর আতপ চালের ভাত আর সাতকড়ার তরকারী বিস্বাদ লাগতো। শুরুতে মুখে তুলতে না পারলেও পড়ে বেশ লাগতে এই মেন্যুটিই। যেদিন প্রথম লজিং বাড়িতে যাই সেদিন খাবারের সাথে একটা লাল টকটকে মরিচ। নাম নাকি নাগা মরিচ। খাবার এগিয়ে দিতে দিতে বাসার বড় ছাত্রটি বলেছিল "স্যার খাওক্কা।" সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা প্রথম প্রথম বুঝতে খুবই অসুবিধা হতো। কিন্তু মাসখানেক পর সবই বুঝতে পারতাম। তবে বলতে পারিনি। চেষ্টা অবশ্য করেছি বলার!
যে বাসায় থাকতাম সেটা ছিল তিন রুমের একটি একতলা বিল্ডিং। বাসার পাশেই ছিল একটি মাঝারি সাইজের টিলা। প্রায়ই বিকেল বেলা টিলার উপরে বসে সময় কাটাতাম। টিলার উপর থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যেত। আশেপাশের পরিবেশটা বেশ ভালো লাগতো। ছোট বড় অনেক টিলা আর তাদের মাঝে আবদ্ধ জলরাশিকে মনে হতো যেন আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
লজিং বাসার ফজরের পরপরই নাস্তা ছিল মুড়ি দিয়ে চা আর স্লাইস ব্রেড (সিলেটে স্লাইস ব্রেডকে লুফ বলতো)। বেলা ৮/৯টার দিকে আবার সকালের খাবার। সকালের খাবারে প্রায়দিনই ছোলা দিয়ে খিচুরী থাকতো। সিলেটেই প্রথম ছোলা দিয়ে খিচুরী খাওয়া শিখেছি। খুব একটা স্বচ্ছলতা না থাকলেও সে বাসায় অভাব ছিল না বোধ হয়। কোনদিনই কোন কাজের কথা বলতো না আমাকে। ভালোই চলছিলো সব কিছু।
লজিং বাসায় তিনজন ছাত্র ছিলো। ছাত্রী ছিলো না। বড়জনের নাম হাবিবুর রহমান সাদী, পড়তো ক্লাস নাইনে। ছোট দুইজন পড়তো ৭ম শ্রেনিতে। বয়সে ওরা এক বছরের ছোটবড়। প্রায় সমবয়সী হওয়ায় ওদেরকে সামলাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে আমাকে। তাদের নাম ছিল কামরুল ইসলাম এবং রুবেল আহমেদ। ছোট দুইজন এসএসসি শেষ করে বর্তমানে প্রবাসী। বড়জন সিলেটের এমসি কলেজ থেকে অনার্স মাস্টার্স শেষে করে বর্তমানে স্থানীয় একটা ট্রাভেল এজেন্সিতে কর্মরত। ওদের বাবা কাজ করতেন সিলেট কোর্টে। কয়েক বছর আগে অবশ্য তিনি গত হয়েছেন। খুবই ভালো মানুষ ছিলেন ওদের বাবা। ছেলেরা একেবারেই ছোট ছিল না। তবুও তিনি তাদেরকে রোজই চুমু খেতেন অফিসে যাওয়া-আসার সময়। আমার খুবই হিংসা হতো। কারন আমার বাবা কখনো চুমু খেয়েছেন কিনা মনে নেই। ছোট বেলার কথা জানিনা অবশ্য।
পড়াতে গিয়ে ওদেরকে কখনোই মারধোর করতাম না।
আমার নামের সাথে মিল থাকার কারনে আমি বড় ছাত্রকে ডাকনাম সাদী বলেই ডাকতাম। দুষ্ট না থাকলেও ও সব সময় আঠার মতো লেগে থাকতো আমার সাথে। পড়াতে বসলে আমার হাতের উপর হাত না রাখলে নাকি ওর পড়াই হতো না। বিরক্ত লাগতো খুব। আমি কি করি না করি সবকিছু ফলো করতো। কোন একটা কথা হাস্যকর মনে হলে বার বার সেই কথাই বলতো মুখের সামনে এসে। ধমক দিতাম মাঝে মাঝে। একদিন পড়াতে বসে হাতের উপর থেকে ওর হাত সরিয়ে দিতে গিয়ে কলমের খোঁচায় বেশ চোট পেয়েছিল হাতে। রক্তও বেড়িয়েছিল হালকা। সে জন্য অবশ্য বকাও খেয়েছিলাম ওর মায়ের কাছে। ছাত্রের মা ভেবেছিলেন হয়তো ইচ্ছা করেই আঘাত করেছি।
সিলেট নগরীতে তখন জলাবদ্ধতা ছিল অন্যতম সমস্যা। রাস্তার পাশে জুলন্ত তার দেখে ঢাকা শহরের কথা মনে হতো। একটু বৃষ্টিতেই তলিয়ে যেত আম্বরখানা থেকে চৌহট্টা পয়েন্ট পর্যন্ত। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অপ্রতুলতার কারনে পানিতে মিশে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়তো আবর্জনাগুলো। এখন অবশ্য চিত্র পাল্টেছে। দেশের প্রথম তারবিহীন নগরীও হচ্ছে সিলেট। পরিচ্ছন্ন নগরীর পথে সিলেটে হতে পারে ভবিষ্যতের আদর্শ মহানগরী।
মাঝে মাঝে লজিং বাসা থেকে হেটে হেটে মদীনা পয়েন্ট পর্যন্ত যেতাম ভার্সিটির পেছন দিয়ে। ওদিকটাতে একদম গ্রাম্য পরিবেশ। ছোট ছোট টিলা আর উপর থেকে নেমে আসা জলে ধারায় তৈরী হওয়া খাল দেখতে দেখতে কখন যে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পৌছে যেতাম টেরই পেতাম না। একেবারে ছবির মতো মনে হতো। কোন দূষণ নেই, নরম নরম হাওয়া আর নির্মল পরিবেশে বেশ লাগতো হেঁটে আসতে।
সিলেটে কোন মেয়ের সাথে ভাব হয়নি তেমন ভাবে। অবশ্য লজিং বাসার পাশের এক মেয়ের সাথে ফোন নম্বর বিনিময় এবং এসএমএস আদান প্রদান হয়েছিলো কিছুদিন। ধরা খেয়ে তার চিন্তা পরে আর মাথায় আসে নি। একটা সময় মনে মনে ইচ্ছা ছিলো সিলেটের কোন মেয়েকে বিয়ে করবো। কিন্তু পরে আর সেটা হয়ে উঠেনি।
সিলেটের নাগা মরিচ, আতপ চালের ভাত, ছোলা দিয়ে খিচুরি, সাতকরার তরকারী আর পাটশাকের ঝুল এখনো মিস করি। টিলার উপর বসে থাকা দিনগুলো আর জল-পাহাড়ের মিতালীর সাথে সাক্ষাতের বাসনা জাগে সবসময়। কখনো লম্বা ছুটি পেলে সিলেটে অবকাশ যাপনে যাবার ইচ্ছা আছে। ভালো থাকুক সিলেট আর সিলেটের মানুষগুলো
অবশেষে সনেট: সিলেটের খাবার
আতপ চালের ভাত সাতকড়া সাথে
পাট পাতা লুকোচুরি শুটকির ঝুলে
কাঁঠালের বিচি আর কুমড়ার ফুলে
খেসারীর ডাল জমে দুপুরের পাতে।
নাগা মরিচের ঝাল গোলালুর মূলে
মাঝে মাঝে পুইশাক ডাটার সাথে
মুগডালে মুরিঘন্ট মাছের মাথাতে
মাঝে মাঝে দেখা দিতো সে রাত্রির কালে।
কখনো মেঘেরা যদি দেখা দিত জলে
চারিদিকে পথঘাট যদি যেত ভরে
খিচুরিরা সেজে যেত ছোলাদের সাজে।
চায়ের কাপেতে মুড়ি ফজরের পরে
শোভা পেত পাউরুটি থালার উপরে
মজাতেই দিন গেছে সিলেটের মাঝে।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০২১ দুপুর ১২:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




