'অপরেশন জ্যাকপট ' ছিল সারা বাংলাদেশব্যাপী নৌ কমান্ডোদের প্রথম অপরেশন। চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজগুলোকে ডুবিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এ 'অপরেশনের প্রায় ৬০ জন নৌ - যোদ্ধা অংশগ্রহণ করেন। অপরেশনের সার্বিক দায়িত্ব ছিল সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিক। মূল দায়িত্বে ছিলেন এ ডব্লিউ চৌধুরি, ডা. শাহ আলম, মজহার উল্লাহ।
দলের উপনেতা ছিলেন আবদুর রশিদ, ফারুক -ই- আজম, বিধান, খোরশেদ আলম। প্রতিটি গ্রুপের অধীনে ২০ জন যোদ্ধা ন্যস্ত করেন।
১৪ আগষ্ট ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে অপরেশনের জন্য ৬০ জন যোদ্ধাকে ৩ গ্রুপে ভাগ করে ব্রিগেডিয়ার সাবেক সিং এর নেতৃত্বে হরিণা ইয়ুথ ক্যাম্পে আনা হয়। মেজর রফিকের নিয়ন্ত্রণে ক্যাপ্টেন মাহফুজ তত্ত্ববধানে উল্লেখিত ৩ টি গ্রুপ ফাজিলপুর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।
মূল কমান্ডার এ ডব্লিও চৌধুরি, গ্রুপ কমান্ডার ডা. শাহ আলম ও সহযৌদ্ধারা বিভিন্ন ভাবে চট্টগ্রাম শহরে ঢুকেন। অধিকাংশ যোদ্ধা চট্টগ্রামের আলকরণ মতিন টেইলার্সের পৌঁছেন।
অপরেশনের ইঙ্গিত সম্পর্কিত দু'টো গান ছিল যা শুধু কমান্ডাররা জানতেন। কলকাতা বেতার থেকে সম্প্রচার হবে এই গান ২টি হলো:
'আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান , তার বদলে চাইনি কোন দান '
' আমার পুতুল আজকে যাবে শ্বশুর বাড়ি ' -
গান ২ টি ছিল 'অপরেশন জ্যাকপটের ' এর সংকেত।
প্রথম গানটি শুনলে প্রস্তুত হতে হবে। ঠিক ২৪ ঘন্টার পর ২য় গানটি শুনলে সে রাতে ১২টার সময় অপরেশন শুরু করতে হবে। এই ছিল কমান্ডিং নির্দেশ। এভাবেই কলকাতা থেকে অপরেশনের সিন্ধান্ত নেওয়া হয়।
মিরেশরাই ( চট্টগ্রামের উপজেলা) থাকতেই কলকাতা বেতারের মাধ্যমে রেডিওতে প্রথম গাম সম্প্রচার করে যোদ্ধাদের প্রস্তুত হতে নির্দেশ দেয়া হয়।
যোদ্ধারা সবজির ঝুড়িতে করে সহযৌদ্ধাদের সহযোগিতায় অস্ত্র ও মাইন ( বোমা) সহ কর্ণফুলীর অপর পারে চরলক্ষ্যা তীরে আসেন। প্রথমে আসেন এ ডব্লিউ ও ডা. শাহ আলম। ১৪ আগষ্ট সকাল পর্যন্ত নদীর কাছে অনেকক্ষণ রেকি করে কমান্ডাররা। দূরত্ব আন্দাজ করা হয়। রাত ১২ টায় ৪০ জনের মধ্যে ৩৭ জন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। রাতে সবাই চরলক্ষ্যায় আস্তানায় জড়ো হয়।
যোদ্ধারা চাইছিলেন উত্তাল নদী, কারণ এতে 'অপরেশন সুবিধা হয়। কিন্তু নদী ছিল শান্ত।
টার্গেট অনুসারে জাহাযের আয়তন অনুসারে ১জন, ২ জন, ৩ জন করে যোদ্ধারা ১৪ টি গ্রুপ করে। দূরত্ব অনুযায়ী সময়, স্রোতের বেগ, গতি ইত্যাদি হিসাব করে কমান্ডোরা নদীতে নামার ব্যবস্থা করেন। স্থানীয় যোদ্ধারা তাদের টার্গেট জাহাযের সামনে পৌছে দেন। ৪/৫ উপরে থাকেন কভারিং এর জন্য।
প্রত্যক যোদ্ধার সাথে একটি মাইন গামছা দিয়ে শরীরে বাধা থাকে। সাথে একটি ছুরিও দেয়া হয় ( জাহাজের শ্যাওলা পরিষ্কার করে মাইন লাগানোর জন্য) ।
★১৫ আগষ্ট রাত ১২ টায় 'অপরেশন জ্যাকপট ' শুরু হয়। কম্পিত হতে থাকে চট্টগ্রাম বন্দর। প্রচন্ড আওয়াজে ধ্বংশ হতে থাকে একেকটি জাহাজ। নদীর পার থেকে মুক্তিযুদ্ধারা ' জয় বাংলা ' স্লোগান দিতে থাকে।
এরপর পাকবাহিনী চরলক্ষ্যা জনবসতিতে নির্মম গণহত্যা চালায়। কিন্তু এর আগেই মুক্তিযুদ্ধারা এলাকা ছেড়েছিল।
না এটা কোন হলিউডের টম ক্রুজের কাহিনী বলে নি। বলেছি ' জয় বাংলার ' এক ঐতিহাসিক কাহিনী।
ঐ মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন কি ছিল? স্বপ্ন ছিল একটি পতাকা ,একটি মানচিত্র আর স্বাধীন বাংলার মানুষ হিসেবে বাঁচার। তাঁদের স্বপ্ন কিন্তু সত্যিই হয়েছিল কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস আমরা আজ তাদের ভুলতে বসেছি।
[ তথ্য সূত্র : দেয়াঙ পরগণার ইতিহাস ]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



