হাত ছড়িটা অনেকক্ষণ ধরেই নেড়ে চেড়ে দেখছিলেন ডঃ শঙ্কর। রূপালি রঙের প্রায় ৪ ফুট লম্বা একটা পিতলের হাত ছড়ি। দেখলেই হাতে নিতে ইচ্ছা করে । হাতলটা বেশ ভারী, শক্ত এবং মজবুত। বাকী দেহটাও বেশ ভারী। দেখলেই বুঝা যায় কোন সাধারণ হাত ছড়ি এটি নয়। কেমন যেন একটা রাজকীয় ভাব আছে এর মধ্যে। একটা পুরানো ঐতিহ্যের ঘ্রাণ । যেন বহু ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে সে আজও দণ্ডায়মান।
-তো কি বুঝলেন ? একরকম গর্বের সঙ্গেই বললেন তালুকদার সাহেব।
-দারুন! এরকম অ্যানটিক জিনিস তো এখন কালো বাজারে ছাড়া পাওয়াই যায় না। অনেকটা উচ্ছ্বাসিতই মনে হলো শঙ্কর বাবুকে।
-আসল চমকটাই তো এখনো বাকী রয়েছে। কিছুটা নির্লিপ্ত ভঙ্গী তালুকদার সাহেবের।
-কি? যেন আর তর সইছে নাহ শঙ্কর বাবুর।
-নিচের দিকটা ভালো করে দেখুন । একটা খাপের মতন আছে নাহ?
-হুমম বলে মাথা নাড়লেন ডঃ শঙ্কর।
-খাপটা ধরে টান দিন তোহ।
খাপটা খুলতেই চমকে গেলেন ডঃ শঙ্কর।
-ওরেব্বা! এতো সাংঘাতিক ব্যাপার। ছড়ি না বলে তো ছোড়াও বলা যায় একে। যেন বিস্ময় এখনো কাটছে নাহ শঙ্কর বাবুর।
হাত ছড়ির নিচের খাপের ভিতর একটি ধারালো ছুরি বসানো। খুবই ছোট,প্রায় দেড় ইঞ্চির মতন। কিন্তু উপযুক্ত কারও হাতে থাকলে তা যে দারুণ কার্যকরী হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
-তো কোথায় পেলেন এমন তওফা ? প্রশ্নটা না করে পারলেন না শঙ্কর বাবু।
কিছুটা স্মিত হাসলেন তালুকদার সাহেব।
-আমার দাদা মারা যাবার সময় এই একটা জিনিসই বিশেষ ভাবে দিয়ে গিয়েছিলেন আমার নামে । বলে গিয়েছিলেন যেন তার বড় নাতিন ছাড়া আর কাউকে যেন ছড়িটা না দাওয়া হয়। সেই হিসেবেই ছড়িটা এখন আমার কাছে। অবশ্য তার একটা কারণও আছে।
- কি কারণ ?
- দাদা যখনই দূরে কোথাও হাঁটতে যেতেন তখন ছড়িটা সবসময় সঙ্গে নিতেন। শেষ বয়সে যখন কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়লেন, তখন ছড়ির বাহক হলাম আমি। দাদা আমার কাঁধের উপর ভর দিতেন আর ছড়িটা ধরা থাকতাম আমি। ছড়িটা যে বেশ ভারী তা হাতে নিয়েই নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন। তো হাঁটার সময় কখনও ছড়িটা ধরে হালকা নাড়া চড়া দিলেই দাদা বলে উঠতেন – শক্ত করে ধর। একদম শক্ত করে ধরবি ছড়িটা। এই ছড়িটা আমাদের বংশের গৌরব, বুঝলি । হাত থেকে পড়লে কিন্তু বড়ই অমঙ্গল হবে।আর তখন আবার তিনি শুরু করতেন তার ছড়ির ইতিহাস।
-কি ইতিহাস মশাই ?
-শুনবেন ?
-আলবৎ ।
-তো শুনুন। লর্ড জনাথন শেফার্ডের নাম শুনেছেন কখনো ?
অনেকটা অসহায়ের ভঙ্গিতেই মাথা নাড়লেন শংকর বাবুর।
-শুনার অবশ্য কথাও না। আমি নিজেও দাদার কাছেই প্রথম উনার নাম শুনি। সে যাক গেহ। তো তিনি যখন কাশিমপুরের এক জমিদার বাড়ির মেহমান হয়ে আসছিলেন তখন পথিমধ্যে তিনি পড়লেন এক ডাকাত দলের কবলে। লোকবল যদিও তার সঙ্গেও ছিলো।কিন্তু তাদের দীর্ঘ দিনের ডাকাতির অভিজ্ঞতার সাথে লর্ডের লোকজন পেরে উঠে নি। লর্ড জনাথন শেফার্ড আর তার ক্যারাভানের চালক বাদে বাকী সবাইকে তারা হত্যা করে এবং ক্যারাভানটি ছাড়া তারা বাকি সমস্ত মূল্যবান সামগ্রীও লুণ্ঠন করে নিয়ে যায়। যার মধ্যে মণি মুক্তা খচিত লর্ডের তরবারিটাও ছিল।
কাশিমপুরের এরা ছিল এক বিখ্যাত ডাকাত দল। বাঘা হাওালাদার ছিলেন সেই ডাকাত দলের সর্দার । এই ডাকাত দলের বৈশিষ্ট্য ছিল যে তারা দিনে দুপুরেও ডাকাতি করত । আবার জমিদার কিংবা অভিজাত বংশের কেউ ছাড়া তারা ডাকাতি করত না। এই কারনে সাধারণ লোকজন তাদের নিয়ে খুব একটা মাথা না ঘামালেও সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকজনের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিলো।
কিন্তু সেবার স্বয়ং লর্ডের বহরে ডাকাতি করার পরেও তাদের ব্যাপারে তবুও কিছু করতে না পাড়াটা তখন মান সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষ করে কাশিমপুরের জমিদারের তখন তো মাথায় হাত, কারণ তারই বাসায় মেহমান হওয়ার কথা ছিলো লর্ডের। তার জমিদারী তখন যায় যায়। কারণ লর্ড তৎক্ষণাৎ রানার পাঠিয়ে জানিয়ে দেয় যে তিন দিনের ভিতর এই ডাকাত দলের সমাধান করা না গেলে তার জমিদারিসহ তার সমস্ত পদবীও কেড়ে নাওয়া হবে।
যে ডাকাত দলের হদিস তিন যুগেও পাওয়া গেলো না তার সমধান করতে হবে কি নাহ তিন দিনে।
জমিদারের সারা রাত নির্ঘুম কাটলো। ভোরের দিকে বাড়ির পাহারাদার হরিপ্রসাদ এক সাংঘাতিক সংবাদ দিলেন। বাঘা হাওালদার তার দলবল নিয়ে নাকি জমিদার বাড়ির দিকেই আসছে। জমিদার এই কথা শুনে বেশ বিস্মিত হলেন। জঙ্গলের বাঘ লোকালয়ে হাজির হচ্ছে,তাও এমন মুহূর্তে, এ যেন বিশ্বাসী হচ্ছিলো না জমিদারের। বাঘা হাওলাদারের উদ্দেশ্য বুঝাটাই তাই তখন কঠিন হয়ে পড়েছিলো জমিদারের জন্য। তাই তৎক্ষণাৎ বাড়ির পালোয়ানদের তৈরি থাকতে বল্লেন তিনি। কিন্তু ভালো মতন প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই ডাকাতদল বাড়ির উঠানে ঢুকে পড়ে। বাঘা হাওালাদারকে বাধা দাওয়া কারই বা সাধ্য। জমিদার দূর থেকে দেখলেন আপাদমস্তক কালো চাদরে ঢাকা বিশ থেকে পঁচিশজন তার উঠানে দাঁড়ানো। এদের মধ্যে একজনের গায়ে শুধু সোনালি চাদর। মাথায় কালো পাগড়ি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন বাঘের চামড়া জড়ানো। বুঝতে বাকি রইল না সে-ই ডাকাত সর্দার।
-জমিদার কোথায় আছেন? বেরিয়ে আসুন। যেন হুংকার ছাড়লেন একজন।
-জমিদার তো জমিদারের জায়গাতেই আছে। কথাটা বলতে বলতে অন্দরমহল থেকে উঠানে বেরিয়ে আসলেন জমিদার।
-শুনলাম আমাদের জন্য আপনার পেরেশানি হচ্ছে জমিদার। বাঘা হাওালাদার কথা বলে উঠলেন। সেই সাথে পুরো পরিবেশটাই যেন গম গম করে উঠলো।
- পেরেশানির খবর তোমার কানে গেছে তাহলে।
- জমিদার! একটা কথা মনে রেখো। জঙ্গলের একটা পাতা নড়লেও তা বাঘা হাওালদারের কানে যাবেই। তবুও আমরা এসেছি আপনার কাছ থেকেই বিষয়টা জানতে।
-বিষয়! বিষয় হচ্ছে-এতদিন তোমরা যা করেছিলে করেছিলে ,কিন্তু এবার লর্ডের বহরে কেনো এমন করতে গেলে, যে কিনাহ আবার আমারই বাড়ির মেহমান হয়ে আসছিলো।
-কারণ ডাকাতির সময় আমরা সাদা পশ্চাৎ -কালো পশ্চাৎ বিবেচনা করি না জমিদার। আর আপনার মতন কারো চাটুকদার হওয়ার স্বভাবও যে আমাদের নেই।
এই কথা শুনবার পর কিছুটা যেন থমকে গেলেন জমিদার।
-সে যাই হোক আমারা এসেছিলাম একটা শর্ত নিয়ে। যেহুতু এখন পর্যন্ত কখনো আপনি আমাদের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ান নি তাই আমরাও আপনাকে অহেতুক বিড়ম্বনায় ফেলতে চাই না।
-তাহলে বলে ফেলো তোমাদের শর্ত।
-যদি এই মুহূর্তে আপনার পালোওয়ান দলের কেউ আমাকে লাঠি খেলায় পরাজিত করতে পারে তাহলে আজ রাতের মধ্যেই আমরা কাশিমপুরের জঙ্গল ছেড়ে চলে যাবো আর এদিকে ভুলেও পা পারাবো নাহ। আর যদি সে পরাজিত হয় তাহলে আপনার যে মাথার পাগড়িটা আছে নাহ,তা সবার সামনে আমি পদদলিত করবো। সেই সাথে বিশ মন ধান আর আপনার আস্তাবলের সব কয়টা ঘোড়াও আমার চাই।
জমিদার বুঝতে পারলেন শেষের কথাগুলাও বাঘা হাওালাদারের এক ধরনের চাল। এখন তার শর্ত নিয়ে প্রশ্ন করতে গেলে তার নিজেরই সম্মানহানি ঘটবে। তাই তিনি অনেকটা ঠাণ্ডা মাথাতেই ব্যাপারটা সামলানোর চেষ্টা করলেন।
-এই ব্যাপার তাহলে,বেশ তো। জমিদার বলে উঠলেন।
তিনি তখনই তার পালোয়ান বাহিনীর দিকে তাকিয়ে হুকুম দিলেন-
তোদের মধ্যে কে আছিস, সামনে আয়। এটাই তোদের সুযোগ তোদের জাত চিনিয়ে দাওয়ার।
কিন্তু পালোওয়ান বাহিনীর মধ্যে যেন ইতস্ততা কাজ করলো। কে যাবে বাঘা হাওলাদারের সাথে লড়তে।
সেই পালোওয়ান বাহিনীর মধ্যেই ছিল আমার দাদারও বড়দা হারুন তালুকদার। দেহতে বন্য হাতির জোর থাকেলও বুদ্ধিতে তিনি ছিলেন একেবারেই নাবালক। কিন্তু বারবার দেহের জোরেই বিপদে পড়েও বেঁচে যেতেন। তিনিই এগিয়ে এলেন হাওালদারের সাথে লাঠি খেলতে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



