তৎক্ষণাৎ শুরু হয়ে গেলো লাঠি খেলা। কিন্তু বুনো হাতিটাকে কাবু করতে বাঘার বেশিক্ষণ লাগলো না। মাথার উপর এক বাড়ি পড়তেই হারুন তালুকদার মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
জমিদারের বিস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে বাঘা হাওালাদার কিঞ্চিত হাসলেন।
-চিন্তার কারণ নেই। জ্ঞান হারিয়েছে কেবল।
জমিদার যেন পুরো স্তব্ধ হয়ে গেলেন।কি বলবেন, কি করবেন ভেবে পেলেন নাহ।
-জমিদার! এই তোমার পালোওয়ানদের অবস্থা। তবুও ভালো তাদের মধ্যে একজন আছে যার কিনাহ সাহস আছে বাঘা হাওলাদারের সাথে লড়াই করার। বলেই হো হো করে হেসে উঠলেন তিনি।
ডাকাতদলের বাকি সবাইও বিজয়ের উচ্ছ্বাস ধ্বনি ছাড়লো।
তবে হাত দিয়ে তাদের থামিয়ে দিলেন সর্দার। ধীরে ধীরে তিনি এগিয়ে গেলেন জমিদারের দিকে। পালোয়ান দলের বাকিরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে যার যার জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকলো। সর্দার কাছাকাছি আসতেই জমিদার তার মুখের সামনে বাড়িয়ে দিলো তার হাতে ধরা এই ছড়িটা।
-খবরদার ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকো। যেন জমিদার হুংকার দিলেন।
কিন্তু তার হুংকারে কোন কাজ হলো না। বাঘা ছড়িটা ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিলো। আর তখনই ঘটলো অদ্ভুত এক ঘটনা।টান দাওয়ার ফলে ছড়ির নিচের খাপটা খুলে ছোড়াটা বের হয়ে আসলো। আর সঙ্গে সঙ্গে জমিদার দেরি না করে সেই ছোড়ার তীক্ষ্ণ ফলাটা সজোরে ঢুকিয়ে দিলেন বাঘা হাওালাদারের গলার ভিতর দিয়ে। ডাকাতদলের বাকিরা অবাক দৃষ্টিতে তাদের সর্দারের রক্তের বন্যা বয়ে যেতে দেখলো। ওদিকে পালোয়ানরা এ দৃশ্য দেখে যেন বুকে একশ হাতির জোর পেলেন। তারা ঝাপিয়ে পড়লো বাকি ডাকাত দলের উপর। ওদিকে গ্রামবাসীরাও জমিদার বাড়ির দরজার বাইরে দাড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিলেন। হরিপ্রসাদ তাদের সবাইকে গেটের বাইরে জড় করেছিলেন। বাঘা হাওালদারের কুপোকাত হওয়া দেখে তারাও চড়াও হলো বাকি ডাকাত দলের উপর। সবার জন্যই সেবার সবকটি ডাকাতকেই ধরা সম্ভব হয়েছিলো। এরপর নাকি তাদের সবাইকেই জমিদারের নির্দেশে গ্রামের মাঝখানে নিয়ে একে একে পুড়িয়ে ফেলা হয়। যেন তাদের কোন চিহ্নই না থাকে।
হারুন তালুকদারের জ্ঞান ফিরার পর, জমিদার অবশ্য তাকে তার বীরত্বের পুরস্কার দিয়েছিলেন ।অনেক মূল্যবান সামগ্রীই উপহার হিসেবে দেন তিনি, অত্যন্ত সাহস করে এগিয়ে এসে জমিদারের মান রক্ষার জন্য। যার মধ্যে এই ছড়িটাও ছিলো। যে অসামান্য ছড়ির সেই দেড় ইঞ্ছি ছোড়াটা দিয়েই বাঘা হাওালাদারের মতন জঙ্গলের বাঘের সলিল সমাধি রচিত হয়েছিলো।সেটাই হাত ঘুরে এখন আমার কাছে।
-আর জমিদারের পরে কি হলো ?
-ও! লর্ডের কাছে জমিদারের এই খবর যাওয়ার পর তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে পুরস্কৃত করেন এবং ব্রিটিশ উপনিবেশে এই খবর যাওয়ার পর তাকে কাশিমপুরের নবাব উপাধিও দাওয়া হয়।
-নবাবও হয়েছিলেন,বেশ তোহ। আচ্ছা আপনার দাদা কি কখনও জমিদারের নামটা আপনার কাছে বলেছিলেন?
-নাহ,তা তিনি বললেন নি। অবশ্য কখনো তাকে জিজ্ঞেসও করা হয় নি।
কথাগুলো বলার সময় তালুকদার সাহেব খেয়াল করছিলেন অনেক্ষণ ধরেই শঙ্কর বাবু ঘরের মাঝ দেয়ালে টাঙ্গিয়ে রাখা একটি ছবির দিকে বার বার তাকাচ্ছেন। তিনি সেদিকে লক্ষ্য করে একটু স্মিত হাসলেন।
-ভালো জাগায়তেই চোখ পড়েছে আপানার। এর কথা আমি এখনই আপানকে বলতে যাচ্ছিলাম।
-হুম্ম… দেখছিলাম পেইনটিংটা। তেল রঙ দিয়ে আঁকা নিশ্চয়ই?
-হুম্ম..এটা সেই হারুন তালুকদারের সেই সময়কার ছবি। তখনকার কোন চিত্রকরের আঁকা।এটা অবশ্য আমার বাবা পেয়েছিলেন।
-আপনার গ্রেট গ্রেট গ্রেট গ্র্যান্ডফাদার তো বেশ ছিলেন দেখছি।সুঠাম দেহ,কাঁধ অবধি লম্বা চুল,গাঁয়ের কালো চাদর আর সেই সঙ্গে হাতে ধরা নিশ্চয়ই এই ছড়িটাই ?
কথা গুলা বলতে বলতে শঙ্কর বাবু উঠে গিয়ে ছবিটার একদম কাছে চলে গেলেন।
-জী, জী ঠিক ধরেছেন। এই ছড়িটাই। প্রত্যুত্তরে বলে উঠলেন তালুকদার সাহেব।
-ছড়িটাকে মনে হচ্ছে তিনি ছোরা হিসেবে ব্যাবহার করতেই বেশি পছন্দ করতেন। হাতলের দিকটা না ধরে তিনি গোঁড়ার দিকটা ধরেই দাড়িয়ে আছেন, অত্যন্ত ছবিতে সেরকমই দেখাচ্ছে ।
কথাগুলো বলে তিনি একটু থামলেন। তারপরই ফিরে এসে ছড়িটা নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কি যেন একটা বুঝার চেষ্টা করলেন। তালুকদার সাহেব অনেকটা বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলেন তাকে।
হঠাৎ তিনি ছড়ির হাতলটা ধরে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে সেটিকে ঘুরানোর চেষ্টা করলেন।
-একি!একি! কি করছেন! তালুকদার সাহেবের বিস্ময় যেন আর সয় না। কিন্তু এর চেয়েও তিনি আরও বিস্মিত হলেন যখন দেখলেন শঙ্কর বাবু হাতলটাকে ঘুরানো শুরু করেছেন আর ছড়িটার ভিতর থেকে আস্ত এক তরবারি বের করে এনেছেন।
তিনি যখন সেটি উঁচিয়ে ধরলেন তখন দেখলেন যে তার মাঝখানে তিনটি দামী পাথর জ্বল জ্বল করছে। তরবারিটা এতো সরু যে তা হাত ছড়ির মাঝখানে খুব সহজেই এঁটে গিয়েছিলো।
এই দৃশ্য দেখার পর তালুকদার সাহেবের মুখ দিয়ে যেন আর কথা বের হচ্ছিলো নাহ। সেদিকে তাকিয়ে শঙ্কর বাবু যেন একটু হেসে ফেললেন।
-কীভাবে বুঝলাম এই তোহ?
তালুকদার সাহবের বিস্ময় তখনও কাটে নি। তিনি কিছু না বলে কিছুটা অন্যমনস্ক হয়েই মাথা নাড়লেন। তাই শঙ্কর বাবুই বলা শুরু করলেন।
-খটকাটা আমার লাগা শুরু করেছিলো জঙ্গেলের বাঘ লোকালয়ে ঢুকার পর থেকেই। ডাকাত সর্দার যতই সাহসী হোক না কেনও তিনি জেনে বুঝে তার লোকজনকে জমিদারের অন্দর মহলে নিয়ে এসে বিপদে ফেলেতে পারেন না। তার অবশ্যই জানা থাকার কথা যে তার লোকজন যতই দক্ষ হোক না কেন জমিদারের শয়ে শয়ে লোকের সাথে এভাবে লড়তে যাওয়াটা বোকামি এবং তার তো নিজের থেকেও ধরা দাওয়ার কোন প্রয়োজন ছিলো নাহ,যদি কি নাহ….
একটু যেন থামলেন শঙ্কর বাবু।
-যদি কি নাহ ? প্রশ্নটা না করে পারলেন নাহ তালুকদার সাহেব।
-যদি কি নাহ,ডাকাত সর্দারের সাথে জমিদারের সখ্যতা থাকে।জমিদার হিসেবে বাঘা তালুকদারের কথা নিশ্চয়ই জমিদার জানতেন। আর সে সময়কার এসব ডাকাত দলদের সাথে জমিদারের সখ্যতা নতুন কিছু নয়। অনেক জমিদারই এদের নিজেদের প্রয়োজনে ব্যাবহার করতেন আর বিনিময়ে তাদের মূল্যবান উপহারও প্রদান করতেন। সেরকমই কোন প্রয়োজনে হয়ত জমিদার নতুন কোন ফন্দি এঁটেছিলেন বাঘা তালুকদারের সাথে। লর্ড জনাথনের আসার সঠিক সময়,পথ আর তার সঙ্গের লোকজনের খবর হয়ত জমিদারই সর্দারকে দিয়েছিলেন।
-কিন্তু এতে জমিদারের কি লাভ হতো ?
-জমিদার খুব সম্ভব এখানে খুব দূর দিয়ে চিন্তা করেছিলেন। ব্রিটিশ উপনিবেশদের প্রতি উপমহাদেশের জমিদারদের বরাবরই কিছুটা ক্ষব ছিল।কিন্তু জমিদারিত্ত বহাল রাখার জন্য তাদের সাথে সবসময় আবার মানিয়েও চলতে হতো।তাই জমিদার এখানে একটি অভিনব পন্থা গ্রহন করেছিলেন হয়ত।তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নবাব উপাধি।এতে করে তার নিজ অঞ্চলে ক্ষমতাও বেড়ে যেত আবার কেন্দ্রীয় ক্ষমতার একটি অংশ হওয়াও সম্ভব ছিল। ডাকাত দল যখন লর্ডের বহরে হানা দেয় তখন লর্ডকে হাতের কাছে পেয়েও তাকে ছেড়ে দাওয়া হতো সর্দারের জন্য সবচেয়ে বড় বোকামি যদি কিনাহ এতে জমিদারের কোন হাত না থাকত।আর সেই বহর থেকে ডাকাতি করা লর্ডের তরবারিটাই খুব সম্ভব আমি হাতে ধরে আছি।
-তাই যদি হয় তাহলে জমিদার কর্তৃক ডাকাত সর্দারের পতন আর পুরা ডাকাত দলের পুড়িয়ে মারা ঘটনাটা আপনি কিভাবে বলবেন ?
-এখানে এসে আমি নিজেও কিছুটা এলেমেলো হয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু আপনার গ্রেট গ্রেট গ্রেট গ্র্যান্ড ফাদারের ছবিটা দেখার পর সব পরিস্কার হয়ে যায় আমার কাছে।
-আমি এখনো অন্ধকারে শঙ্কর বাবু।আর ধাঁধায় রেখেন না, বুঝিয়ে বলুন।
-দেখুন পুরোটাই কিন্তু আমার কল্পনা, মনের আন্দাজে নির্ভর করা।আমার কথাই বিশ্বাস করতে হবে এমন কোন কথা নেই।
-এই হাত-ছড়ির ভিতর থেকে আস্ত এক তরবারি বের করার পর তো আপনার সব কথাই বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে আমার। আপনি বলুন দয়া করে।
-হারুন তালুকদারের ছবিতে তার পরনের কালো চাদর আর ধুতি দেখে আমার মনে এক অসম্ভব ভাবনার উদয় হয়। এছাড়া আপনার দাদার বলা পুরো কাহিনীতে তার ভূমিকা যেন অনেকটাই ম্লান। তখন মনে হলো বাঘা হাওলাদারকে হয়ত জমিদার মারেন নিহ। তিনিই হয়ত নাম বদল করে হয়ে যান হারুন তালুকদার।আর লর্ডের তরবারিটা তিনি বয়ে বেড়ান হাত-ছড়ির ভিতর করে।আগের যুগে দক্ষ কামারের যে অভাব ছিলো না লুকায়িত তরবারিটাই তার প্রমাণ।
-আপনি তাহলে বলতে চাচ্ছেন আমার গ্রেট গ্রেট গ্রেট গ্র্যান্ডফাদার ছিলেন একজন ডাকাত সর্দার ? বিস্ময় নিয়ে প্রশ্নটা করলেন তালুকদার সাহেব।
-পুরাটাই তো আমি ধারণা থেকে বললাম কেবল।
-তাহলে লর্ডের কাছে জমিদার প্রমাণ করলেন কিভাবে যে তিনি ডাকাত দল কে নিশ্চিহ্ন করেছেন ?
-ডাকাত সর্দারকে হত্যা, পুরো ডাকাত দলকে পুড়িয়ে মারা এসব তিনি কেন করেছিলেন বুঝতে পারলেন না? যাতে কোন প্রমাণ না থাকে। যদি বন্দি হিসাবে কাউকে লর্ডের কাছে পাঠানো হতো তাহলে হয়ত কেঁচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে আসতো। তখন পুরো পরিকল্পনাটাই ভেস্তে যেত। আর তাই তিনি চাননি বিধায় ডাকাত দলের বদলে হয়তো অন্য কারও লাশ দেখিয়েছেন। আর তা একজন জমিদার কিংবা ডাকাত সর্দার কারও পক্ষেই অসম্ভব নয়। ডাকাত সর্দার কিংবা ডাকাত দলের কারও চেহারাও তো আর কারও চেনার কথা নয়। তাই লর্ডের আর বিশ্বাস না করে উপায়ও হয়ত ছিলো না।
কথাগুলো শুনে তালুকদার সাহেব কিছুটা চুপ হয়ে গেলেন। সেটি বুঝতে পেরে শঙ্কর বাবু বলে উঠলেন- ভূলুণ্ঠিত পালোয়ান এর থেকে কিন্তু দুর্ধর্ষ কোন ডাকাত সর্দারের বংশধর হতেই আমার বেশি ভালো লাগতো। যদিও এ দুটির কোনটির সৌভাগ্যও আমার নেই।
তার কথা শুনে তালুকদার সাহেব একটু না হেসে পারলেন না।কিন্তু ঠিক তখনই নীচ তলার গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটা পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে বেজে উঠে হালকা হতে যাওয়া পরিবেশটাকে যেন আরও একটু গম্ভীর করে দিলো।
__
(সমাপ্ত)
__
ডাকাতিঃপর্ব-০১
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাত ৩:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



