সাধারনত আমি কোন বিয়ের অনুষ্ঠানে যাই না।কিন্তু আজকে আমার আসতেই হইল। এর কারন হয়তোবা আজ আমারই বিয়ে। মানুষই একমাত্র বর্বর প্রাণী যারা হাজার বছর ধরে চলা সভ্যতার প্রলেপে কিছুটা হলেও তাদের আদি বন্য রূপকে ঢাকতে পেড়েছে। আর বিয়ের অনুষ্ঠানের মানুষগুলো থাকে আরও কৃত্তিম। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের চোখের দৃষ্টির কারনে তারা ধরা পরে যায়। ধরা পরে যায় আমার কাছে।
__
গাঁয়ে হলুদের দিন সকালে আমি গায়েব হয়ে গেলাম। ফিরলাম আজকে সন্ধ্যার কিছু পরে। বাড়ির গেটের কাছাকাছি আসার সময় দেখলাম বড় মামা দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরানোর চেষ্টা করছে। আমাকে দেখতে পেয়েই তিনি সিগারেট ফেলে এমন ভাবে জাপটে ধরলেন যেন সাত আসমান থেকে তিনি আমাকে ধরে নিয়ে এলেন।
-মামা, ছেড়ে দাও। দম বন্ধ হয়ে আসছে তোহ।
-আগে বল হতচ্ছাড়া যে আর পালাবি না।
-কি বলো মামা,পালাবো ক্যান! আজ তো আমার বিয়ে।
__
রাত এগারোটার সময় পারকিং লটে হাফিযের আসার কথা। এগারোটার মধ্যে যদি হাফিয না আসে তাহলে আমি বিয়েটা সেরে ফেলবো। এখানে আমি নিজের সাথে একটা খেলা খেলছি। ভাবছেন বিয়ের মতন বিষয় নিয়ে ছেলা-খেলা। আসলে ওইদিকের পাল্লাটাই বেশি ভারী। মালিবাগের এক বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর কবর খোঁড়ার দায়িত্ব এখন তার। আজকে আবার আমি হাফিযকে বলেছি কাজ সারার সময় সাদা পাঞ্জাবি পড়তে।
__
রাত এগারোটা প্রায় বাজতে চলল।আমার এখন উঠা প্রয়োজন। আমার পাশে অতন্দ্র প্রহরীর মতন বড় মামা বসে আছে আর আমি বসে আছি সাধারনত বর যেখানে বসে,সেখানে।আমার অনেকগুলো ক্ষমতার মধ্যে একটি হচ্ছে মানুষের দুর্বলতা ধরতে পারা। বড় মামার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে তার আত্ম-অহংকার। আমি উঠে দাঁড়ালাম।
- এই উঠিস ক্যান ? বড় মামা চোখ বড় বড় করে তাকালো।
-মামা, একটু ছেড়ে আসি। বলে আমার কানি আঙ্গুল দিয়ে সিগন্যাল দেখালাম। সাথে একটু মিনকে হাসি।
- চল। বলে বড় মামা উঠে দাঁড়ালেন।
- ছিঃ ছিঃ তুমি কি বডিগার্ডের মতন আমার এখন পিছন পিছন ঘুরবে ? দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে ? তুমি থাকো,আমি এই আসছি।
- আচ্ছা যা। বলে বড় মামা বসে পরলেন।
দাওয়াইতে কাজ হয়েছে। আমি আর কথা না বাড়িয়ে ওয়াশ রুমের দিকে রওনা হলাম।
__
ওয়াশ রুমে ঢুকেই আমি শেরওয়ানিটা খুলে ফেললাম।বিয়ে বাড়িতে সবার আগে মানুষের চোখ যায় পোশাকে । পোশাক এর দিকে তাকিয়ে তারা মানুষ চিনবার চেষ্টা করে। শেরওয়ানির ভিতরে আমার টম অ্যান্ড জেরির একটা টি-শার্ট ছিল। সেটা পড়েই বের হয়ে পরলাম পারকিং লটের দিকে। যা ভেবেছিলাম তাই,কেউ আমার দিকে ঘুরেও তাকালও না।
__
পারকিং লটের কাছে এসে ঘড়ি দেখলাম। রাত এগারোটা বাজে। এর মধ্যে তো হাফিযের কাজ শেষ করে আসার কথা। হঠাৎ একটি ফিসফিসানি শব্দ পেলাম।
-স্যার, স্যার।
তাকিয়ে দেখি হাফিয একটি পিলারের পিছনে লুকিয়ে আছে।
- কি ব্যাপার, ওভাবে ক্যান ?
-মিশন সাকসেসফুল স্যার। বলেই হাফিয তার পান খেয়ে লাল করা জিহ্বা বের করে একটা হাসি দিলো।
-আচ্ছা। এখন তাড়াতাড়ি গাড়ি স্টার্ট দাও।
-আইজকাই যাইবেন, স্যার ?
-হুমম।
-স্যার,আপনার কষ্ট করনের দরকার নাই। আমি আর মছলেম মিলাই ওই দিকটা সামলায় লমু নে।
আমি হাফিযের দিকে একবার তাকালাম তখন। আমার এই চাহনির মানে হাফিয জানে। সে আর কথা না বাড়িয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলো। আমি পিছনের সিটে বসলাম। গেট পার হওয়ার সময় দেখলাম বড় মামাসহ আরও কয়েকজন দৌড়ের উপর আছেন। খুব সম্ভব আমাকেই খুঁজছেন।
__
পরিবেশ হালকা করা দরকার।
-হাফিয,গান লাগাও।
-স্যার, সিডি প্লেয়ার নষ্ট।
-তাহলে তুমি নিজেই গাও একটা।
-কোনটা গাবো স্যার ?
হাফিযের মতন গায়কদের কখনও দ্বিতীয়বার বলতে হয় না। তারা অন্যদের মতন বলে না, আজ যে গলা ভাঙ্গা, আজ সকালে যে রেওয়াজ করা হয় নি। এরা অবলীলায় রাজি হয়ে যায়।
- আজকে তো আমার বিয়ে ছিল। একটা বিয়ের গানই গাও, তাহলে।
- “ও বন্ধু ভবের ভাবানি, তোমার শবের চাহিনি। কই রইলো রে………”
মনে মনে বলি,হাফিয মনে হয় বিয়ের গান কোনগুলি তাও জানে না। গানের কথাগুলিও তার সঠিক জানা নেই।ভুল সুরে,অশুদ্ধ উচ্চারণেও সে গেয়ে যাচ্ছে।আর খুব আশ্চর্যভাবে হলেও চারপাশের এই নির্জনতার গানটি অদ্ভুত ভাবে মানিয়ে গেছে।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাত ৯:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



