__
রাত খুব বেশি না হলেও চারপাশের অস্বাভাবিক নির্জনতায় মনে হচ্ছিল গভীর রাত। মাঝে মাঝেই সেই নির্জনতায় ডুবে যাচ্ছিলাম আবার পরক্ষণেই বাস্তবতায় ফিরে আসছিলাম। ভয়ঙ্কর এক রোগে আক্রান্ত আমি। প্রচণ্ড রকম অস্থিরতায় ভুগি সারাক্ষণ। রোগের শেষ পর্যায়ে নিজের চামড়া নিজেরই ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছা করে,মনে হয় তাতে যেন এই অস্থিরতা থেকে চিরকালের জন্য মুক্তি পাওয়া যাবে। আর শুরুটা হয় সাধারণত মাথার সামনের চুল দিয়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এ রোগের নাম ট্রিচটিলোমেনিয়া। এর আবার একটা সুন্দর নামও আছে-‘কবিদের অসুখ’। এরকম কুৎসিত এক রোগের এমন সুন্দর নাম দেওয়ার কি কারণ তা জানা নেই। এই রোগ থেকে বাঁচার একটাই উপায় সবসময় উত্তেজনাপূর্ণ কিছু করা আর না হয় সেরকম কিছু চিন্তা করা। হাস্যকর একটি সমাধান। অনেকটা টিকা দাওয়ার মতন। জীবাণু দিয়েই জীবাণু ধ্বংস।
হঠাৎই খেয়াল করলাম যে আজ পূর্ণিমা। স্থির হয়ে থাকা চাঁদটার দিকে তাকালেই অসহ্য লাগে। আচ্ছা চাঁদটা ওরকম আকাশে ভেসে থাকে কিভাবে। চাঁদটা কি অনেক হালকা নাকি। হালকা হলে তো আবার দেখতে এমন স্থির লাগার কথা ছিল না। আচ্ছা চাঁদটা কি একসময় কখনও নীচে পড়ে যাবে,আর সবকিছুর মতন। কথাটা বলার পরই অন্যরকম একটা শিহরণ খেলে গেলো মস্তিষ্কে। আজ থেকে ৪০০ বছর আগে নিউটনের মাথাতেও ঠিক একই ভাবনাটা এসেছিল। ব্যাপারটা উপলব্ধি হতেই ঠোঁটে হাসি এসে গেলো।
আপনার মনে হতে পারে কিভাবে আমি এতক্ষণ স্থির হয়ে বসে আছি। এর কারণ হচ্ছে-আমি বসে আছি একজনের মৃতদেহের উপর। যার ফলে শরীর উত্তেজিত হচ্ছে এবং সেই সাথে আমার অস্থিরতা কমিয়ে দিচ্ছে। মৃতদেহটির জন্যে আমার বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। কারণ সেটি একজন ধর্ষকের। কমিউনিজমের নামে সে প্রতিনিয়ত এ দেশের গণতন্ত্রকে ধর্ষণ করতো।
-চা নেন। বেশ নির্লিপ্ত ভঙ্গি দোকানদারের।
আমি হাত বাড়িয়ে চা নিলাম। এক অজানা স্থানের বাসস্ট্যান্ডের টঙ্গের দোকানদার আমার দিকে চা বাড়িয়ে দিলো। লোকটা আমাকে প্রথমেই অবাক করেছিল। আমি যখন রাস্তা দিয়ে একটা লাশ টেনে নিয়ে এসে তার উপরেই বসে এক চাপ চা চেয়েছিলাম,তখন তিনি হাসিমুখে চা বানাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়েন। যেন প্রতিদিনই তার দোকানের সামনে দিয়ে কেউ না কেউ এরকম মৃতদেহ টেনে নিয়ে যায় আর তিনি তাদেরকে চা বানিয়ে খাওয়ান।
চা শেষ করে উঠে দাড়াতেই অদ্ভুত একটা কাণ্ড ঘটল। হাত উঁচু অবস্থায় মৃত দেহটি উঠে বসল। পরক্ষনেই বুঝলাম ‘রিগর মরটিস’। দেহের ল্যাকটিক এসিডের তারতম্যে পেশী তন্তুতে টান পড়ায় এই অবস্থা।“শালার বিপ্লবী”-গালিটা আপনাআপনই বের হয়ে এলো মুখ থেকে। কিন্তু তার থেকেও অদ্ভুত একটা ব্যাপার চোখে পড়লো। টঙ্গের দোকানদার এই ঘটনাতেও বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। তার দৃষ্টি দূরের সেই চাঁদটার দিকে। যে কেউ বুঝবে পুরোপুরি নিজের জগতে ডুবে আছে সে। কিছু না ভেবে আমিও কেন জানি তাকিয়ে রইলাম চাঁদটার দিকে। মাথার ভিতর এই মুহূর্তে অসহ্য যন্ত্রনা হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন চাঁদটাকেই এখন ছিড়ে ফেলি, তবুও স্থির চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



