ক্যারিবিয়ান সাগরের সুনীল জলে অবস্থিত ছোট্ট দ্বীপ জ্যামাইকা। এখানকার অধিবাসীরা গণ্যমান্য অতিথিদের এই ঝিঁ-ঝিঁ পোকা খেতে দেয়। তামিল প্রবাদে রয়েছে_ 'তুমি যদি এক হাজার পিঁপড়ে খাও, তবে একটি হাতির শক্তি লাভ করবে।' আমাদের গ্রামাঞ্চলেও কথিত আছে_ 'পিঁপড়া খেলে সাঁতার শেখা যায়।' এসব প্রবাদ সত্য হোক বা না হোক বিশ্বের অনেক স্থানেই পিঁপড়াকে খুব সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর খাবার মনে করা হয়। থাই রেস্তোরাঁগুলোতে পিঁপড়ার সুপ খুব জনপ্রিয়। পিঁপড়ার ডিমের তরকারি একটু বেশি দামি খাবার। আফ্রিকা, মেক্সিকো এবং ভারতের কিছু কিছু এলাকায় পিঁপড়ার কদর আকাশচুম্বী। এমন কি আমাদের রংপুর, দিনাজপুর এবং বগুড়া জেলার উপজাতীয় সাঁওতালরা পিঁপড়া খেতে ভীষণ পছন্দ করে। ব্যাংককের পূর্বাঞ্চলীয় শ্রী রাঁচা শহরবাসী অতিথি আপ্যায়নে এনে দেয় প্লেটভর্তি ঝিঁ-ঝিঁ পোকার মোরব্বা। থাইবাসীর খুব প্রিয় ও মুখরোচক একটি খাবার হলো পঙ্গপালের আচার। পিঁপড়া, উইপোকা, শুঁয়োপোকার শূককীট ও ফড়িং মাখনে ভেজে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়। এখানকার হোটেল-রেস্তোরাঁর মেনুতে পাবেন মৌমাছির শূককীট, মথ, মাছি আর ঘুণপোকার সুপ। থাইল্যান্ডের বুড়ো আর বাড়ন্ত শিশুদের পুষ্টিকর স্বাস্থ্য টনিক হচ্ছে 'এসপনগোপাস' নামের বড় বড় গান্ধিপোকা। এই গান্ধিপোকা আসামের অনেক এলাকায় ভাতের সঙ্গে খাওয়া হয়। দক্ষিণ ভারতের কোনো কোনো অঞ্চলে ১২-১৪ বছরের কিশোরকে উইপোকার রানী ধরে খেতে দেওয়া হয়। উইপোকার রানী খেলে নাকি ছেলেরা ভালো দৌড়াতে পারে এবং এতে নাকি দৌড়-ঝাঁপজনিত ক্লান্তিও দূর হয়। ভারতের কিছু আদিবাসী 'এপিস ডরসেটা' নামে এক ধরনের জংলী মৌমাছির শূককীট ও পুত্তলি খায়। অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দারা 'এগ্রোটিস ইনফিউছা' নামক 'মথ' থলেতে সংগ্রহ করে নিয়ে কয়লার আগুনে ঝলসে এক ধরনের মুখরোচক খাবার তৈরি করে। এতে রয়েছে প্রচুর তেল আর এটি খেতে নাকি একেবারে বাদামের মতো। কানাডার ডালভেগান, ভ্যাঙ্কুভার অঞ্চলের লোকেরা ঘাস ফড়িংকে বিলাসবহুল খাদ্য হিসেবে গণ্য করে। ফড়িংগুলোকে প্রথমে আগুনে ঝলসে নেওয়া হয়। তারপর তা গুঁড়ো করে নরম আঠালো লেই তৈরি করা হয়। এই লেই ময়দার সঙ্গে মিশিয়ে রুটি তৈরি হয়। এ রুটি খেতে দারুণ উপাদেয়। শোনা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সশস্ত্র বাহিনীকেও রান্না করা খাসফড়িং খেতে দেওয়া হয়েছিল। চীনে আরও আগ থেকেই ডাইটিসসিডি গোত্রের মিষ্টি পানির পোকার চাষ শুরু হয়েছে। এসব পোকাকে পানি থেকে তুলে রোদে শুকানো হয়। ঠিক গরম কেকের মতোই এর বিক্রির বাজার। জুন-জুলাইয়ে আমেরিকার ওরিগন ও ওয়াশিংটনে কিছু লোক রাতের বেলায় মশাল জ্বেলে পাইন বন থেকে কলোরাডিয়া প্যানডেরা মথের শূককীট সংগ্রহ করে। তা থেকে তৈরি খাবার 'পি-অ্যাগ-গাই' ছেলেবুড়ো সবার প্রিয়। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো অঞ্চলের অধিবাসীরা গ্রাইল্লাস অ্যাসিমিলস বৈজ্ঞানিক নামের ঝিঁ-ঝিঁ পোকা খেতে পছন্দ করে। এই কালো-বাদামি পতঙ্গকে প্রথমে তারা আগুনে ঝলসে নেয়, তারপর মাখন ও লবণ মাখিয়ে পরিবেশন করে। পঙ্গপাল রান্নার প্রণালী একেক দেশে একেক রকম। মিসরের বেদুইনরা কয়লার আগুনে এগুলোকে জীবন্ত দগ্ধ করে পরম তৃপ্তিতে খায়। তবে আগুনে ঝলসানোর আগে এদের শরীর থেকে পাখা এবং পা ছাড়িয়ে নেয়। মরক্কোর অধিবাসীরা এই পোকা বাড়ির ছাদে শুকিয়ে তারপর আগুনে ঝলসে পরিবেশন করে। প্রাচ্যের অনেক স্থানে শস্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখানকার অধিবাসীরা পঙ্গপাল ধরে এনে রোদে শুকিয়ে গুঁড়ো করে রুটি তৈরি করে খায়। গুবরে পোকার মোটাসোটা শূককীট নাকি খুবই উপাদেয়। দক্ষিণ আফ্রিকার মাদাগাস্কার ও মোজাম্বিকের লোকজন ওই লার্ভাকে কাঁচা চিবিয়ে খায়। গ্রিস ও রোমের সুসভ্য নাগরিকরাও গুবরে পোকার শূককীট থেকে তৈরি খাবার বেশ আনন্দের সঙ্গেই খেয়ে থাকেন। প্রশ্ন আসতে পারে পোকামাকড়ের তৈরি এসব খাবার কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত। আর আমাদের প্রচলিত খাবারের মতো এর কি খাদ্যগুণ রয়েছে? অবশ্যই আছে। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন এসব খাবারে প্রোটিনের ছড়াছড়ির কথা। প্রতি একশ গ্রাম ঘাস ফড়িংয়ে ৫৭ গ্রাম, গুবরে পোকায় ৬৪ গ্রাম, উইপোকায় ৩৮ গ্রাম আর পঙ্গপালে রয়েছে ৬০ গ্রাম প্রোটিন। আর স্নেহপদার্থ, শর্করা, লোহা, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন তো রয়েছেই। তাই শুনতে খারাপ বা বলতে বাজে শুনালেও খাদ্য হিসেবে পোকামাকড় মোটেও ফেলনা নয়। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় যদি পোকামাকড়ের প্রতি নাক সিটকানো ভাবটা ঝেড়ে ফেলা যায়, তাহলে দুর্গম জায়গা বা বনজঙ্গলে অবস্থানের সময় খাদ্য সংকট দেখা দিলেও কোনো অসুবিধা হবে না।
খাবেন নাকি পোকা!
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
ক্যারিবিয়ান সাগরের সুনীল জলে অবস্থিত ছোট্ট দ্বীপ জ্যামাইকা। এখানকার অধিবাসীরা গণ্যমান্য অতিথিদের এই ঝিঁ-ঝিঁ পোকা খেতে দেয়। তামিল প্রবাদে রয়েছে_ 'তুমি যদি এক হাজার পিঁপড়ে খাও, তবে একটি হাতির শক্তি লাভ করবে।' আমাদের গ্রামাঞ্চলেও কথিত আছে_ 'পিঁপড়া খেলে সাঁতার শেখা যায়।' এসব প্রবাদ সত্য হোক বা না হোক বিশ্বের অনেক স্থানেই পিঁপড়াকে খুব সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর খাবার মনে করা হয়। থাই রেস্তোরাঁগুলোতে পিঁপড়ার সুপ খুব জনপ্রিয়। পিঁপড়ার ডিমের তরকারি একটু বেশি দামি খাবার। আফ্রিকা, মেক্সিকো এবং ভারতের কিছু কিছু এলাকায় পিঁপড়ার কদর আকাশচুম্বী। এমন কি আমাদের রংপুর, দিনাজপুর এবং বগুড়া জেলার উপজাতীয় সাঁওতালরা পিঁপড়া খেতে ভীষণ পছন্দ করে। ব্যাংককের পূর্বাঞ্চলীয় শ্রী রাঁচা শহরবাসী অতিথি আপ্যায়নে এনে দেয় প্লেটভর্তি ঝিঁ-ঝিঁ পোকার মোরব্বা। থাইবাসীর খুব প্রিয় ও মুখরোচক একটি খাবার হলো পঙ্গপালের আচার। পিঁপড়া, উইপোকা, শুঁয়োপোকার শূককীট ও ফড়িং মাখনে ভেজে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়। এখানকার হোটেল-রেস্তোরাঁর মেনুতে পাবেন মৌমাছির শূককীট, মথ, মাছি আর ঘুণপোকার সুপ। থাইল্যান্ডের বুড়ো আর বাড়ন্ত শিশুদের পুষ্টিকর স্বাস্থ্য টনিক হচ্ছে 'এসপনগোপাস' নামের বড় বড় গান্ধিপোকা। এই গান্ধিপোকা আসামের অনেক এলাকায় ভাতের সঙ্গে খাওয়া হয়। দক্ষিণ ভারতের কোনো কোনো অঞ্চলে ১২-১৪ বছরের কিশোরকে উইপোকার রানী ধরে খেতে দেওয়া হয়। উইপোকার রানী খেলে নাকি ছেলেরা ভালো দৌড়াতে পারে এবং এতে নাকি দৌড়-ঝাঁপজনিত ক্লান্তিও দূর হয়। ভারতের কিছু আদিবাসী 'এপিস ডরসেটা' নামে এক ধরনের জংলী মৌমাছির শূককীট ও পুত্তলি খায়। অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দারা 'এগ্রোটিস ইনফিউছা' নামক 'মথ' থলেতে সংগ্রহ করে নিয়ে কয়লার আগুনে ঝলসে এক ধরনের মুখরোচক খাবার তৈরি করে। এতে রয়েছে প্রচুর তেল আর এটি খেতে নাকি একেবারে বাদামের মতো। কানাডার ডালভেগান, ভ্যাঙ্কুভার অঞ্চলের লোকেরা ঘাস ফড়িংকে বিলাসবহুল খাদ্য হিসেবে গণ্য করে। ফড়িংগুলোকে প্রথমে আগুনে ঝলসে নেওয়া হয়। তারপর তা গুঁড়ো করে নরম আঠালো লেই তৈরি করা হয়। এই লেই ময়দার সঙ্গে মিশিয়ে রুটি তৈরি হয়। এ রুটি খেতে দারুণ উপাদেয়। শোনা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সশস্ত্র বাহিনীকেও রান্না করা খাসফড়িং খেতে দেওয়া হয়েছিল। চীনে আরও আগ থেকেই ডাইটিসসিডি গোত্রের মিষ্টি পানির পোকার চাষ শুরু হয়েছে। এসব পোকাকে পানি থেকে তুলে রোদে শুকানো হয়। ঠিক গরম কেকের মতোই এর বিক্রির বাজার। জুন-জুলাইয়ে আমেরিকার ওরিগন ও ওয়াশিংটনে কিছু লোক রাতের বেলায় মশাল জ্বেলে পাইন বন থেকে কলোরাডিয়া প্যানডেরা মথের শূককীট সংগ্রহ করে। তা থেকে তৈরি খাবার 'পি-অ্যাগ-গাই' ছেলেবুড়ো সবার প্রিয়। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো অঞ্চলের অধিবাসীরা গ্রাইল্লাস অ্যাসিমিলস বৈজ্ঞানিক নামের ঝিঁ-ঝিঁ পোকা খেতে পছন্দ করে। এই কালো-বাদামি পতঙ্গকে প্রথমে তারা আগুনে ঝলসে নেয়, তারপর মাখন ও লবণ মাখিয়ে পরিবেশন করে। পঙ্গপাল রান্নার প্রণালী একেক দেশে একেক রকম। মিসরের বেদুইনরা কয়লার আগুনে এগুলোকে জীবন্ত দগ্ধ করে পরম তৃপ্তিতে খায়। তবে আগুনে ঝলসানোর আগে এদের শরীর থেকে পাখা এবং পা ছাড়িয়ে নেয়। মরক্কোর অধিবাসীরা এই পোকা বাড়ির ছাদে শুকিয়ে তারপর আগুনে ঝলসে পরিবেশন করে। প্রাচ্যের অনেক স্থানে শস্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখানকার অধিবাসীরা পঙ্গপাল ধরে এনে রোদে শুকিয়ে গুঁড়ো করে রুটি তৈরি করে খায়। গুবরে পোকার মোটাসোটা শূককীট নাকি খুবই উপাদেয়। দক্ষিণ আফ্রিকার মাদাগাস্কার ও মোজাম্বিকের লোকজন ওই লার্ভাকে কাঁচা চিবিয়ে খায়। গ্রিস ও রোমের সুসভ্য নাগরিকরাও গুবরে পোকার শূককীট থেকে তৈরি খাবার বেশ আনন্দের সঙ্গেই খেয়ে থাকেন। প্রশ্ন আসতে পারে পোকামাকড়ের তৈরি এসব খাবার কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত। আর আমাদের প্রচলিত খাবারের মতো এর কি খাদ্যগুণ রয়েছে? অবশ্যই আছে। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন এসব খাবারে প্রোটিনের ছড়াছড়ির কথা। প্রতি একশ গ্রাম ঘাস ফড়িংয়ে ৫৭ গ্রাম, গুবরে পোকায় ৬৪ গ্রাম, উইপোকায় ৩৮ গ্রাম আর পঙ্গপালে রয়েছে ৬০ গ্রাম প্রোটিন। আর স্নেহপদার্থ, শর্করা, লোহা, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন তো রয়েছেই। তাই শুনতে খারাপ বা বলতে বাজে শুনালেও খাদ্য হিসেবে পোকামাকড় মোটেও ফেলনা নয়। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় যদি পোকামাকড়ের প্রতি নাক সিটকানো ভাবটা ঝেড়ে ফেলা যায়, তাহলে দুর্গম জায়গা বা বনজঙ্গলে অবস্থানের সময় খাদ্য সংকট দেখা দিলেও কোনো অসুবিধা হবে না।
৫টি মন্তব্য ২টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
গ্রেট প্রেমানন্দ মহারাজ

'প্রেমানন্দ' একজন ভারতীয় হিন্দু তপস্বী ও গুরু।
১৯৭১ সালে কানপুরের কাছে 'আখরি' গ্রামে তার জন্ম। দরিদ্র পরিবারে জন্ম। ১৩ বছর বয়সে প্রেমানন্দ সন্ন্যাসী হওয়ার জন্য গৃহ ত্যাগ করেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন
অনুতাপ (ছোট গল্প)
একনাগাড়ে ৪-৫ বছর কাজ করার পর রহিমের মনে হলো, নাহ! এবার আরেকটা চাকরি দেখি। লোকাল একটা কোম্পানিতে কাজ করত সে। কিন্তু কোনকিছু করার জন্য শুধু ভাবনাই যথেষ্ট নয়। সে চাকরির... ...বাকিটুকু পড়ুন
গল্পঃ আমাদের খারাপ দিনের পর

করোনার সময় নানান উত্থান পতন ছিল আমাদের, আব্বা মা ছোটবোন সহ আমি নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় মরে যেতে যেতে বেঁচে গিয়েছিলাম শেষ মুহূর্তে, বেঁচে গিয়েছিল আমাদের ছোট্ট সোনার... ...বাকিটুকু পড়ুন
ডোগান- এক রহস্যময় জাতি

আফ্রিকার মালি এর হৃদয়ে, খাড়া পাথুরে পাহাড় আর নির্জন উপত্যকার মাঝে বাস করে এক বিস্ময়কর জনগোষ্ঠী ডোগান। বান্দিয়াগারা এস্কার্পমেন্ট অঞ্চলের গা ঘেঁষে তাদের বসতি । এরা যেন সময় কে... ...বাকিটুকু পড়ুন
আল কোরআনের ১১৪ সূরায় হানাফী মাযহাবের সঠিকতার অকাট্য প্রমাণ (পর্ব-১৩)

সূরাঃ ১৩ রাদ, ১১ নং আয়াতের অনুবাদ-
১১। মানুষের জন্য তার সম্মুখে ও পশ্চাতে একের পর এক প্রহরী থাকে। উহারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে। আর আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।