একনাগাড়ে ৪-৫ বছর কাজ করার পর রহিমের মনে হলো, নাহ! এবার আরেকটা চাকরি দেখি। লোকাল একটা কোম্পানিতে কাজ করত সে। কিন্তু কোনকিছু করার জন্য শুধু ভাবনাই যথেষ্ট নয়। সে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে দরখাস্ত পাঠাতে শুরু করল। ৫-৬ মাসে সে গোটা দশেক দরখাস্ত পাঠিয়ে দিলো। চাকরি প্রত্যাশীরা দরখাস্ত পাঠায় আর মানব সম্পদ বিভাগ ভাবে, এতো হাজার হাজার দরখাস্ত! এসব বাছাই করা একটা বিপদ বটে! তারা ৮-১০ টা দরখাস্ত কোনোভাবে বেছে নেয়। অনেক সময় উপরওয়ালাদের পছন্দের লোক থাকে। আবার উপরওয়ালাদের পছন্দের লোক থাকলে তাদের বরং সুবিধা। পছন্দের লোকটার সাথে আর দু-চার জনের সিভি আর দরখাস্ত নিয়ে নিলেই হলো। পরে চাকরি তো হবে পছন্দের লোকটারই!
এসব ব্যাপার রহিম ভালোই জানে। তাও মন তার কিছুতে মানে না। সে বিরামহীন দরখাস্ত লিখে চলল। ভাবল, দেশী কোম্পানিগুলোর পলিসি সেরকম ভালো না, সুযোগ-সুবিধাও কম। কোনোভাবে যদি একটা বিদেশী কোম্পানিতে ঢুকতে পারতাম!
বছর দেড়েক সাধ্য-সাধনার পর রহিম একটা বিদেশী কোম্পানি থেকে চাকরির পরীক্ষা দেয়ার ডাক পেল। রহিম এতে যত না খুশী হলো তার থেকে বেশি অবাক হলো! তার পরিচিত কেউ এখানে নেই। আবার কোম্পানিটিও বেশ নাম করা। ‘মামু-খালু’ ছাড়া চাকরির বাজারটা মন্দা! এরকম অবস্থায় এমন নামী কোম্পানি থেকে পরীক্ষার ডাক আসায় রহিম অবাক।
রহিম চিন্তা করেনি যে চাকরিটা তার হবে। তবু চাকরিটা তার হলো। সেখানে যোগ দিয়ে তার কাজের ইচ্ছা অনেক গুন বেড়ে গেল। মনে হলো, নাহ্! এই প্রথম নিজেকে উজাড় করে কাজ করার মতো পরিবেশ পাওয়া গেল।
সে খুব কম সময়ে বড় বসের নজরে পড়ল। কোম্পানির হেড অফিস মাদ্রিদে গিয়ে ট্রেনিং করার একটা সুযোগ সে পেয়ে গেল।
এখানে বলে রাখা ভালো যে রহিম অনেক খুঁজেও এই কোম্পানিতে তার চাকরি হওয়ার কারণ ধরতে পারেনি। কিন্তু তার সমবয়সী তার অন্য একজন কলিগ এর নিগুঢ় রহস্যটা জানে।
রহিম যে ডিপার্টমেন্টে ঢুকেছে তার প্রধান এবং সহকারী- কান্ট্রি -প্রধান তাদের নিজের নিজের লোককে এই পদে নিতে চেয়েছিল। অনেকে বলে, ডিপার্টমেন্ট হেড টাকা খেয়ে একজনকে চাকরি দিতে চেয়েছিল আর সহকারী কান্ট্রি-প্রধান চাকরিটা দিতে চেয়েছিল তার এক আত্মীয়কে। এমনকি নিয়োগ পরীক্ষাও হয়ে গিয়েছিল। ফাইনাল সিলেকশনে নিজের লোকের নাম না দেখে রাগে আগুন হয়ে যায় ডিপার্টমেন্ট হেড সহবত। সে সোজাসুজি কমপ্লেন করে বসে কান্ট্রি-প্রধানের কাছে।
পরবর্তীতে কান্ট্রি -প্রধান উপ কান্ট্রি-প্রধানকে দায়িত্ব দেন ব্যাপারটার সুরাহা করতে। এই সুরাহার ফলে উঠে আসে রহিম। তার মতো অজানা অচেনা এক মানুষ হাসিল করে নেয় চাকরিটা স্রেফ যোগ্যতার বলে।
এখন রহিমের অসাধারণ কাজে সবাই যখন বাহবা দেয় তখন তার বস সহবত ভাবে, ধুত! ওই ছেলেটা জয়েন করলেই বা সমস্যা কি ছিল? এখন রহিমের মতো পোলার প্রশংসা শুনতে শুনতে দিন শেষ! নিজের অধীনস্থ একজনের উন্নতি তাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে আজকাল।
তার কষ্টটা অনেকগুণ বেড়ে গেল রহিমের মাদ্রিদ যাওয়ার খবরে। সে রাগে আগুন, আমি হলাম ওর বস! আমাকে না জানিয়ে হেড অফিস কি করে সিদ্ধান্ত নেয়? মানব সম্পদ বিভাগের প্রধান যখন সহবতকে বলল যে রহিমের বিদেশ সফর মোটামুটি নিশ্চিত তখন সে নানান ফন্দী আঁটতে শুরু করল। ভাবল, থামাচ্ছি তোর বিদেশ! বদের ধামা দিয়া ওকে খেদাইতে হবে। সে রহিমের নামে হেড অফিসে একটা কমপ্লেন করে বসল।
হেড অফিসে যে মেয়েটি মানব সম্পদ বিভাগের দেখভাল করে, এরকম একটা কমপ্লেনে সে অবাক হলো। তার মনে সহবতকে নিয়ে সন্দেহ জাগল। তবু সে অফিসের নিয়ম অনুযায়ী রহিমের বিরুদ্ধে করা কমপ্লেনটি খতিয়ে দেখতে স্থানীয় অফিসের মানব সম্পদ বিভাগকে অফিসিয়াল মেইল করল। রহিমের বিদেশ যাত্রা আপাতত স্থগিত গেল!
এক সপ্তাহ পর মানব সম্পদ প্রধান রহিমকে একান্তে ডাকলেন। বললেন, রহিম সাহেব, আপনার নামে তো গুরুতর অভিযোগ! রহিম বিষয়টা কিছুতেই আঁচ করতে পারছে না যে অভিযোগটা কী হতে পারে। রহিমকে জানানো হলো যে সে তার এক সহকর্মীর ড্রয়ার ভেঙে হাজার দশেক টাকা চুরি করেছে। অভিযোগটা শুনে রহিমের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। চুরি! সে জীবনে কখনও কারও কিছু চুরির কথা মনেও ভাবেনি। যাই হোক তদন্ত শুরু হলো।
সপ্তাহের শেষ দিনে মাদ্রিদ অফিস জানালো যে তদন্ত যেহেতু শেষ হয়নি রহিম মাদ্রিদ যেতে পারে। তদন্তের শেষ ফলাফল না বের হওয়া পর্যন্ত সে নির্দোষ।
মাদ্রিদ অফিসের এমন ‘অপ্রত্যাশিত’ সিদ্ধান্তে সহবত ক্ষুব্ধ। মনে মনে সে পণ করে বসল, হালার পুতরে আমি মাদ্রিদ পাঠাইতাচি! সে অফিসের কম্পিউটার বিভাগের ছেলেটাকে হাত করে রহিমের ই-মেইলে ঢুকে রহিম সেজে মাদ্রিদ অফিসে জানাল যে তার মা অসুস্থ। এ মুহূর্তে তার পক্ষে দেশের বাইরে যাওয়া সম্ভব হবে না।
নতুন সপ্তাহ শুরু হলো। সপ্তার শুরুতে স্পেনের ভিসা পেয়ে গেল রহিম। রহিম এখন আশায় আছে, এই বুঝি প্লেনের টিকিট এলো।
সোমবার গেল। মঙ্গলবার পেরল। কিন্তু প্লেনের টিকিট আর এল না। অগত্যা বুধবার রহিম মাদ্রিদ অফিসে মেইল করল। তার মেইল পেয়ে সেখানকার মানব-সম্পদ বিভাগের মেয়েটি খুব অবাক হলো। সে রহিমের ই-মেইল থেকে পাঠানো মেইলটা ফরওয়ার্ড করল। তার সাথে লিখে দিলো যে তোমার এই মেইলের কারণে আমরা তোমার টিকিট কাটি নি।
পুরো ব্যাপারটা রহিমের কাছে ভুতুড়ে লাগল। সে তার পাঠানো ই-মেইল গুলো খুঁজে দেখল যে সেখানে এরকম কিছু নেই। সে মাদ্রিদ অফিসকে জানাল যে এরকম কোন মেইল সে পাঠায় নি। এবং এ ঘটনাটা কিভাবে ঘটল তাও সে বুঝতে পারছে না। মাদ্রিদ অফিস পুরো বিষয়টা নিয়ে ধাঁধায় পড়ে গেল। এ অবস্থায় তারা ঠিক করল যে রহিম আপাতত আসুক! কনফারেন্সটা শেষ হোক। এ বিষয়ে আমরা পরে ভেবে দেখব।
আজ সপ্তাহের শেষ দিনে রহিম জানতে পারল যে তার জন্য মাদ্রিদ অফিস টিকিট কেনার চেষ্টা শুরু করেছে।
রহিম এতদূর আসার পরও সহবত তার বিদেশ সফর পণ্ড করার সব চেষ্টা করে চলেছে। অন্যদিন সে রাত আটটা-নয়টা পর্যন্ত অফিসে থাকে। ছাদে উঠে বিড়ি খায়। মাঝে মাঝে বসদের জন্য বিয়ার বা রেড ওয়াইন কিনে আনে। কিন্তু আজ সে বিকেল হতেই নানান অজুহাতে অফিস থেকে চলে গেল। মানব-সম্পদ বিভাগের লোকদেরও কৌশলে ভাগিয়ে দিলো। অগত্যা রহিম একাকী তীর্থের কাকের মতো বসে রইল প্লেনের টিকিটের জন্য রাত এগারোটা পর্যন্ত!
সহবত অসময়ে ফোন করে রহিমকে জানাল, আপনি বাড়ি যান। ও টিকিট আজ আর আসছে না। রহিম বাড়ির পথ ধরল। এদিকে সহবত কম্পিউটার বিভাগের ছেলেটার অ্যাকাউন্টে চুরির পাওয়া সেই দশ হাজার টাকা পাঠিয়ে তাকে ফোন দিল, ভাই! ওর টিকিটটা রাত বারোটার দিকে আসবে। আসলে ওটা ডিলিট করে দিয়েন! হাজার দশেক পাঠিয়েছি আপনার অ্যাকাউন্টে!
রাত পেরিয়ে সকাল হলো। রহিম প্রতিদিনের মতো অফিসে হাজির। সে তার কাজ করে যাচ্ছে অন্য দিনের মতো। এমন সময় কম্পিউটার বিভাগের ছেলেটা সহবতকে ডাকল, বস! চলেন তো একটু সিগারেট খেয়ে আসি। তারা অফিসের ছাদে চলে গেল।
সিগারেট ধরিয়ে সহবত বলল, থ্যাঙ্ক ইউ! কাজটা ঠিকমতো করেছেন। কম্পিউটার বিভাগের ছেলেটা বলল, বস! খবর শুনছেন নাকি? সহবত জিজ্ঞেস করল, 'কোন খবর?' কম্পিউটার বিভাগের ছেলেটা বলল, যে ফ্লাইটে রহিমের টিকিট কাটা ছিল সেই ফ্লাইট তো ক্রাশ করছে। সব যাত্রী নিহত।
এ খবরে সহবত এক মুখ বিরক্তি প্রকাশ করল। ধুৎ শালা! এক মুখ বিরক্তি প্রকাশ করল সে। ভবিষ্যতে রহিম তার উপরে উঠে যেতে পারে এই ভয়ে সে ভীত হয়ে উঠল। আফসোস হলো তার, ক্যান যে কাজটা করলাম! ওই প্লেনে থাকলে হালারপুতটা তো আজই নিপাত হইত!
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মে, ২০২৬ সকাল ১১:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



