somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ আমাদের খারাপ দিনের পর

০৪ ঠা মে, ২০২৬ দুপুর ২:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


করোনার সময় নানান উত্থান পতন ছিল আমাদের, আব্বা মা ছোটবোন সহ আমি নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় মরে যেতে যেতে বেঁচে গিয়েছিলাম শেষ মুহূর্তে, বেঁচে গিয়েছিল আমাদের ছোট্ট সোনার সংসার। পুনরায় নিজেরা ছন্দে ফিরেছিলাম সবাই সবার জীবনে। দীর্ঘ সময় আব্বার কাজকর্ম আমাদের দুই ভাইবোনের লেখাপড়া মোটামুটি বন্ধ থাকার পর আব্বার ছোট একটা পোশাক কারখানা চালু করেছিল ভালোভাবেই আবার, মায়ের হাতে সকাল দুপুর রাতের রান্না করা খাবার আর ছোট বোন লাবণীর আর আমার পড়ালেখা সবই আবার আগের মত শুরু হয়ে গিয়েছে তখন।

এতদিনের এতকিছুর পর একটা জিনিস আমাদের সবাইকে বিমর্ষ করছিল।
বাবার ভেতরের বাইরের আচরণের একটু একটু করে পরিবর্তন সবাইকে অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছিল দিন দিন।

আমি জাইয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। দিনের বেলায় পড়ার টেবিলে নিয়ম করে বসে বসে একমনে পড়াই এখন আমার একমাত্র কাজ, কিন্তু রাত হলেই আমাদের সুখের নিশ্চিত সুন্দর ঘরের ভেতর অন্য এক অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। বাবা কাজ শেষে বাসায় ফেরার পর তার উচ্চ শব্দে সস্তা রিংটোন ঘন ঘন বেজে উঠতো, অকারণে, অপ্রয়োজনে।

শুনেছি যার সাথে কথা বলে সে আব্বার কারখানার একজন নারী কর্মচারী, তার নাম ইয়াসমিন, রোজ রোজ আব্বাকে ফোন দিয়ে তারা ঘন্টাব্যাপী এত কি কথা বলে শুরুতে আমলে নেই ই নাই আমরা কেউ, কথাবার্তা গুলো ও ছিল সাধারণ এই যে আব্বা খেয়েছে কিনা, সে কী করছে, কোন রুমে আছে, ছেলেমেয়েরা কি করছে, আমার মা কোথায় এইসকল সাধারণ আলাপ।

আব্বা দিন দিন নির্লজ্জ হয়ে গেলেন তিনি আমাকে অথবা মাকে অথবা পরিবারের যে কাউকে দেখলেও ফোনে ঐ মহিলার সাথে কথা বলা বন্ধ করতেন না; বরং আমাদের সকলের সামনেই কথা বলতেন স্বাভাবিক ভাবে; উচ্চ স্বরে; শুনিয়ে শুনিয়ে; কারখানা ও তার সংসারের আমি তুমি তারা সহ সকলকে নিয়ে সকল বিষয়ে।

ইয়াসমিন নামের ঐ মহিলার আগে দুইবার বিয়ে হয়েছিল, দুইবারই বিচ্ছেদ হয়েছে, আর এখন উনি মনে প্রাণে বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী হতে চাইছে। সে নানাভাবে বাবাকে তা প্রকাশ করছেন, বাবাও নিমরাজি হয়ে আছেন যেকোনো সময় ইয়াসমিনকে বিয়ে করে ফেলতে পারেন কথাগুলো জানলাম বাবার পুরোনো ম্যানেজার হারুন চাচার কাছ থেকে নানান চেষ্টায়। এইসব কিছু শুনে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো, এসব কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না, মেনে নিতে পারছিই না, মা!! মা শুনলে কি হবে তখন! লজ্জায় ঘৃণায় যদি মরে যায়!! কি করতে পারি এখন, মাকে নিয়ে বোনকে নিয়ে এসব থেকে দূরে কোথাও চলে যাবো!! সংসার কিভাবে চলবে; এখনো তো পড়াটাই শেষ করিনি, চাকরি বাকরি তো অনেক দূর।
এদিকে দিন দিন আব্বা তার আচরণ দিয়ে প্রকাশ করতে লাগলেন উনি খুব শিগগিরই কি করতে যাচ্ছেন, আব্বা আগে কারখানা থেকে বাড়ি ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে যেতেন, এখন আর দুপুরে বাড়ি ফিরেন না, তার ম্যানেজারের থেকে শুনেছি ওই মহিলা নাকি রোজ আব্বার জন্য রান্না করে নিয়ে আসেন, আমার আব্বার জীবন নতুন বসন্তের রঙে সয়লাব।

আমার ছোট বোন লাবণী তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে অতো কিছু এখনো বোঝে না, তবু একদিন স্কুল থেকে ফিরে মাকে আমতা আমতা করে বললো ওর স্কুলে নাকি কোন মহিলা ওকে চকলেট চিপস দিয়ে এসেছে আর বলেছে সে ওর নতুন মা, তারপর বললো আচ্ছা মা আব্বা কি ঐ মহিলাকে বিয়ে করেছে? মায়ের মুখ একদম ছাইয়ের মত কালো বর্ন ধারন করলো কথা গুলো শুনে, ঠাস করে চড় বসিয়ে দিল লাবনীর গালে, তারপর মুখে আঁচল চেপে দৌড়ে তার ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

সারাদিন কোনরকম কাটলেও রাতে বইয়ের পাতায় চোখ রেখে মনযোগ আর ধরে রাখা যায় না, ইদানিং আব্বার ফোনের ঐ মহিলার সাথে নানা রকম আপত্তিকর কথোপকথনে। আব্বা প্রতিদিন বাড়ি ফিরে ঐ মহিলার সাথে দাঁত বের করে বিস্তৃত হাসি মুখে ছড়িয়ে হেসে হেসে বলে, খুব শিগগিরই তোমায় বিয়ে করে আমার ঘরে রানী বানিয়ে নিয়ে আসবো পরান পাখি।

আব্বার এইধরনের কথায় মায়ের চেহারাটা একদম মৃত মানুষের মত ঠান্ডা ফ্যাকাশে হয়ে যায় তখন, অপরুপ রুপবতী হয়েও স্বামীর অবহেলা, অপমান মারধরই ছিল তার সংসার জীবনে একান্ত বাধ্যতামূলক স্বাভাবিক আচরণ।

সবথেকে বড় কথা সমস্যার মূল কারখানার ঐ মহিলা ইয়াসমিন আমাদের পুরো পরিবারকে; আমাদের জীবনকে করোনার মতনই ভয়াবহ ভাবে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছিলেন।

এসবের ভেতর আরেক বিপদ হলো টাকা পয়সার অভাব অনটনের ভেতর আমরা ভয়াবহ ভাবে আটকে গিয়েছি। আব্বার কারখানা থেকে যে টাকা আসতো আব্বা খুশি মনে ঐ মহিলার হাতে সব তুলে দিচ্ছিলেন গত কয়েক মাস ধরে। ধীরে ধীরে আমরা শুধু ডাল অথবা আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছিলাম বাধ্য হয়ে।

আমি অনেক ভাবলাম, কি হতে যাচ্ছে খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছি, অথচ কিছুই করতে পারছি না, ভোরগুলোতে আমার ঘুম ভাঙে দুশ্চিন্তায়। আব্বা আজকাল নিয়মিত মাকে মারধর করেন, কথায় কথায় তালাকের হুমকি দেন, বিচ্ছিরি ভাষায় গালাগালি করেন, গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে আশেপাশের মানুষজনকে ডেকে আমরা কতটা খারাপ কুলাংগার সেটা জনে জনে বলে নিজেকে উল্টো ভিকটিম দাবী করেন।

এই পর্যায়ে এসে জীবনের প্রত্যেকটা দিন নরকের মতন অসহ্য মনে হতে লাগলো, আসলে মহিলার উদ্দেশ্য শুধু আব্বাকে বিয়ে করা তা নয়, আব্বার সকল সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়াই তার একমাত্র লক্ষ্য, হারুন চাচা একদিন বাড়ি এসে আমাদের বললেন, তিনি আব্বাকেও এই ব্যাপারে বুঝিয়েছেন কিন্তু আব্বা ততদিনে ঐ মহিলার ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে গিয়েছেন, ভালো মন্দ কোন বিচার বিবেচনা করার বিবেক এখন আর তার অবশিষ্ট নেই। ( দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:০৪
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হিন্দু মুসলমান ভুলে গিয়ে, আমরা সবাই মানুষ হই

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:৫৭



আমি জন্মগত ভাবে মুসলমান।
অবশ্য ধর্মীয় নিয়ম কানুন কিছুই মানতে পারি না। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। এখন তো আর এটা ফকির লালনের যুগ না। মানবিক এবং সচেতন... ...বাকিটুকু পড়ুন

নান্দাইলের ইউনুস ও স্বপ্নভঙ্গের বাংলাদেশ

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০


নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় একটি নাটকে একজন ভাড়াটে খুনীর চরিত্র ছিল। খুনীর নাম ইউনুস - নান্দাইলের ইউনুস। গ্রামের চেয়ারম্যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ভালো মানুষ স্কুল শিক্ষককে হত্যার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বনির্ভর অর্থনীতি থেকে ঋণনির্ভর, আমদানিনির্ভর, পরনির্ভর রাষ্ট্রে পরিনত হতে যাচ্ছি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪




মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতজানু হয়ে যে রাষ্ট্রগুলো নিজের অর্থনীতি, কৃষি আর ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দেয়- তার পরিণতি কী, তার জীবন্ত উদাহরণ পাকিস্তান। কোটি কোটি মানুষকে ভিক্ষুক বানানোর সেই পথেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

এরা খুবই বিপদজনক

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ০৩ রা মে, ২০২৬ রাত ১১:০১

যে তোমার সাফল্য দেখে হিংসে করে,
যে তোমার বিপদ দেখে খুশি হয়,
যে তোমার সামনে এক আর পেছনে আরেক।
তাকে তোমার গোপন কথা কিংবা তোমার কোনো পরিকল্পনার কথা বলতে যেও না।
সবসময় তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্পিরিট শোন বাই আমেরিকান এয়ারলাইন্স-এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত!

লিখেছেন ঢাকার লোক, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ ভোর ৪:১৫

গতকালের একটা বড় খবর ছিল আমেরিকার একটি অন্যতম জনপ্রিয় বিমান সংস্থা স্পিরিট এয়ারলাইন্স দেউলিয়া হয়ে তাদের সব সেবা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই স্পিরিট অর্থনৈতিক সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছিলো,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×