somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তরুণ ভের্টারের দুঃখগাথাঃ যে বই পড়ে মানুষ আত্মহত্যা করেছিল



০৮ ই জানুয়ারি, ২০১৮ সকাল ৭:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলা সাহিত্যের অ আ ক খ-ই জানিনা, সেখানে বিশ্বসাহিত্যের খোঁজে আমার মত নাদানের পক্ষে ঠিক স্বস্তিদায়ক ও কার্যকর প্রচেষ্টা চালানো হয় ধুরন্ধরতা অথবা সাহিত্যে বিরাট পারদর্শিতা প্রকাশ করবার গোপন বাসনা, বাস্তবে যা আসলে লবডংকা বৈ কিছু নয়। প্রখ্যাত বিদেশী লেখকদের যে অনুবাদগুলো পড়েছি তা আঙ্গুল গুনে বলা যাবে। এক্ষেত্রে আমার দৌড় ঐ আন্তন চেখব, ও হেনরি, ফ্রানৎস কাফকার কয়েকটি করে ছোটগল্প আর জর্জ অরওয়েলের দুটি উপন্যাস। 


জোহান উলফগাং গোয়েথে (১৭৪৯-১৮৩২), শুধু জার্মানি নয় পুরো ইউরোপ মহাদেশের সাহিত্য জগতে এক প্রবাদপ্রতিম নাম। তাঁরই শুরুর দিককার একটি বই 'দি সরোজ অব ইয়াং ভের্টার' ( জার্মান নাম 'দি লাইডেন ডেস ইউঙ্গেন ভের্টারস' ) যা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল প্রায় আড়াইশো বছর পূর্বে ১৭৭৪ সালে। বইয়ের কথায় পড়ে আসছি, তার আগে বলে নিতে চাই কি করে এই বই সম্পর্কে আমি জানলাম এবং আগ্রহী হয়ে উঠলাম।





২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারীতে ঢাকার একুশে বইমেলায় আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন জার্মানির সবচেয়ে পুরনো হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ডঃ হ্যান্স হার্ডার। তিনি আধুনিক দক্ষিণ এশীয় ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রধান। তিনি বঙ্কিমচন্দের শ্রীমতভগবতগীতার উপর পিএইচডি করেছেন। বাংলা সাহিত্য, বাংলাদেশের ধর্ম, সুফিবাদ, সাধু সন্নাসীর জীবনধারা, চট্টগ্রামের মাইজভান্ডারী গান ইত্যাদি নিয়ে তিনি প্রচুর গবেষণা করেছেন এবং এসব বিষয়ে তাঁর একাধিক বই, জার্নাল ও আর্টিকেল রয়েছে। বইমেলায় পরিষ্কার বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে সকলের দৃষ্টি নিজের দিকে নিবন্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। মানবজীবনে সাহিত্যের প্রভাব কত ব্যাপক তা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি গোয়েথের 'দি সরোজ অব ইয়াং ভের্টার' বইটির কথা উল্লেখ করেন। কারণ এই বইটি পড়ে সেকালে তরুণেরা আত্মহত্যা পর্যন্ত করেছিল। আমার আগ্রহের সেই শুরু। বই পড়ে মানুষ আত্মহত্যা করেছিল! এও সম্ভব! আমাকে পড়তেই হবে বইটি।





জার্মান সাহিত্যের অঙ্গনে তখন ঝড় আর উত্তেজনার (storm and stress) কাল, সেসময়েই চব্বিশ বছর বয়সে বইটি লেখেন গোয়েথে। গল্পের মূল নায়ক সংবেদনশীল চরিত্রের ভের্টার ১৭৭৪ সালের জানুয়ারী হতে মার্চ পর্যন্ত প্রিয় বন্ধু উইলহেমকে নিজের দৈনন্দিন জীবনাবস্থা জানিয়ে চিঠি লিখেন। বইটি মূলত সেই চিঠিগুলোর সংকলন। বইটি প্রকাশের পর পুরো ইউরোপ জুড়ে ভের্টার-জ্বর শুরু হয়েছিল। রাতারাতি গোয়েথে পরিচিত লেখকে পরিণত হন।



গল্পের ভের্টার থাকতেন ছবির মত সুন্দর এক মায়াবী গ্রামে। সেখানে তিনি শার্লট নামের অতি রুপবতী মেয়ের সাক্ষাৎ পান। মেয়েটি কিছু এতিম শিশুদের দেখভাল করে। ভের্টার এই মেয়ের প্রেমে পড়ে যান যদিও তিনি জানতেন শার্লট আরেকজনের বাগদত্তা স্ত্রী। শার্লটের চেয়ে এগারো বছরের বড় তার নাম আলবার্ট। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ সত্ত্বেও ভের্টার তাদের উভয়ের সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলছিলেন। নীরবে নিভৃতে অবাধ্য প্রেমানলে প্রতি মুহুর্তে ভের্টার জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হতেন। এক পর্যায়ে গভীর বেদনাবোধের তাড়নায় গ্রাম ছেড়ে চলে যান।



দূরে এসে যেন তিনি জ্বলন্ত উনুনে নিপতিত হলে। মনপ্রাণ উজাড় করে অন্যের বাগদত্তা যে স্ত্রীকে তিনি ভালবেসেছেন তাকে চোখের আড়ালে রেখে মনোকষ্ট তার দ্বিগুন। তাই আর দূরে থাকতে না পেরে ফিরে গেলেন আগের গ্রামে। কিন্তু হায়! ততদিনে শার্লট আর আলবার্ট বিয়েকর্ম সেরে ফেলেছে। ভের্টারের বুঝতে সক্ষম হলেন যে শার্লট কখনোই তার ভালবাসা গ্রহণ করতে পারবে না। শার্লট এক পর্যায়ে ভের্টারকে বলে দেয় আর যেন কখনো সে তার সাথে সাক্ষাৎ করতে না আসে। 

ভের্টারের বোধদয় হল। তিনি দেখতে পেলেন তিনত্রয়ীর একজনকে এখান থেকে সরে দাঁড়াতে হবে আর মৃত্যুই হল একমাত্র পথ। কিন্তু কে মরবে! ভের্টার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি নিজেই নিজেকে শেষ করে দিতে চান কারণ অন্য কাউকে হত্যা করা বা আঘাত করার সাহস বা ক্ষমতা কোনটাই তার নেই। তিনি বিদায়ী পত্র লিখতে বসলেন আলবার্টকে, অনুরোধ করলেন তার পিস্তলটা চেয়ে। উল্লেখ করলেন যে, তিনি কোথাও 'ভ্রমণে' যেতে চান, পিস্তলটি প্রয়োজন। চিঠি পড়লো শার্লটের হাতে। তিনি পিস্তল পাঠিয়ে দিলেন। শার্লটের পাঠানো পিস্তল দিয়েই নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করলেন তিনি। মৃত্যুর আগ মুহুর্তে বললেন, "শার্লট হয়ত ভাঙ্গা হৃদয় নিয়েই একদিন মারা যাবে কিন্তু আমি ওর দুঃখবোধ নিয়ে কিছু বলব না...শার্লটের জীবনে তা বড় নৈরাশ্যের ব্যাপার..."।





বইটি আশাতীত সাড়া ফেলেছিল। নেপোলিয়ন বলেছিলেন, 'বইটি ইউরোপীয় সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন'। তিনি তরুণ বয়সে নিজেকে ভের্টার ভাবতেন এবং তার মতই নিজেকে নকল করতেন এটাও বলেছেন।
 ইউরোপ জুড়ে তখন ভের্টার-জ্বর। উপন্যাসে বর্ণিত ভের্টারের পোশাক আসাক থেকে শুরু করে চালচলন সবই প্রভাবিত করলো তরুণদের। অতি আবেগী আর সংবেদনশীল তরুণেরা ভের্টারের মতই পোশাকে সেজে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে আত্মহত্যায় মেতে উঠলো। অধিকাংশ মৃতদেহের পাশে বইটি পড়ে থাকতে দেখা যায়। যেসব তরুণেরা প্রেমে ব্যর্থ, জীবনে হতাশ তারাই নিজেদের ভেতর ভের্টারকে দেখতে পেতে থাকল এবং এই দুঃখজনক পরিণতির দিকে এগিয়ে গেল কেউ কেউ। কপিক্যাট সুইসাইড নামক টার্মটির উৎপত্তি তখন থেকেই। এক পর্যায়ে কোন কোন দেশ এই বইকে নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়।



একটি অনবদ্য বই শুধুমাত্র একটি বই হিসেবে গণ্য হয় না যদি তা ব্যক্তি সমাজ রাষ্ট্রে অসাধারণ অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারে। তখন তা ইতিহাসেরই অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। শুধু ইউরোপে নয়, সারা দুনিয়ার ধ্রুপদী সাহিত্যাকাশে "তরুণ ভের্টারের দুঃখগাথা" তেমনি একটি জ্বলজ্বলে তারকা উপন্যাস। কোনদিন যদি সময় সুযোগ মেলে তবে ছোট আকারের এই বইটির বঙ্গানুবাদ করার গোপন ইচ্ছা প্রকাশ করে লেখার যবনিকাপাত টানলাম।



জাহিদ কবীর হিমন

মাস্টার্স ইন ইন্টারনেট টেকনোলজিস এন্ড ইনফর্মেশন সিস্টেমস

লাইবনিজ বিশ্ববিদ্যালয় হ্যানোভার, জার্মানি
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জানুয়ারি, ২০১৮ সকাল ৭:১৫
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ডিস্কভারি অব ইন্ডিয়া

লিখেছেন রাজীব নুর, ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৪



১৯৪৭ সালটা সমস্ত বাঙ্গালীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দেশবিভাগের বছর শেখ মুজিব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রী লাভ করেন। ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হওয়ার সময়ে কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার মহাজাগতিক ভাবনাকে এআই আমার সেরা পোষ্ট হিসাবে সাব্যস্ত করেছে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:১২



মহাজাগতিক ভাবনা

মহাজগতের প্রথমের পূর্ব অবস্থান শূন্য। কারণ প্রথমের পূর্ব অবস্থান শূন্যই হয়ে থাকে।শূন্য অবস্থানে সীমাদাতা না থাকায় তাতে যা হবে তা’ অসীম হবে।সকল অসীম একত্রে মিলে এক হবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সালমান মুক্তাদিরের বিরুদ্ধে এ্যাকশান নিয়ে সরকার কি বার্তা দিচ্ছে?

লিখেছেন আফনান আব্দুল্লাহ্, ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫

সালমান মুক্তাদির দেখি জঘন্য মানুষ। ওয়াইন, ওম্যান আর ওয়েল্থ – পুরুষ নষ্টের এই তিন ডব্লিউ-ই তার অস্থিমজ্জা ও লিভারে ঢুকেছে



এদিক-ওদিক ব্যাপক আম-লিচু করে বেড়িয়েছে। নিজের স্টুডিওতে আজেবাজে শুটিং করেছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিনয়: মুমিনের এক অনন্য মহৎ গুণ; কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একটি বিশ্লেষণ

লিখেছেন নতুন নকিব, ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৫

বিনয়: মুমিনের এক অনন্য মহৎ গুণ; কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একটি বিশ্লেষণ

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ভূমিকা

মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য তার বাহ্যিক চেহারা, ধন-সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদায় নিহিত নয়। বরং তাঁর চরিত্র,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার দিনগুলি আর ফিরবে নারে || সহেলিয়া ও সোনারুর কণ্ঠে নতুন ভার্সন

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:৩০

আমার দিনগুলি আর ফিরবে নারে
যারে হারাইয়াছি মায়ের কোলে
আর কি ফিরা পাবো তারে

মন যে আমার কান্দে সদাই
ফিরা যাইতে সোনার শৈশবে
হায়রে কোথায় আমার ঘুড্ডি নাটাই
খেলার সাথি কই সবে

কে যে আমায় নিত্যি ডাকে
ঘুমের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×