
১৯৪৭ সালটা সমস্ত বাঙ্গালীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দেশবিভাগের বছর শেখ মুজিব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রী লাভ করেন। ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হওয়ার সময়ে কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা হয়। এসময় মুজিব মুসলিমদের রক্ষা এবং দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সোহরাওয়ার্দীর সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত হন। পাকিস্তান-ভারত পৃথক হয়ে যাওয়ার পর শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি ৪ তারিখে প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব মুসলিম ছাত্র লীগ যার মাধ্যমে তিনি প্রধান ছাত্রনেতায় পরিণত হন।
কন্যার নাম নূরী। তিন বছর বয়স।
সে নতুন হাঁটতে শিখেছে। ঘরে থাকতে চায় না। সারা উঠান হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হলে হামাগুড়ি দেয়। তার মা তাকে কিছুতেই ধরে রাখতে পারে না। এক শীতের সকালে নূরী প্রতিদিনকার মতোন উঠানে হেঁটে বেড়াচ্ছিল। আপনমনে খেলা করছিল। মা রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। নূরী একাএকা খেলতে-খেলতে হঠাত পা পিছলে পুকুরে পড়ে যায়। ছোট্র নুরী পুকুরে পড়ে গিয়ে পারে উঠে আসার জন্য দাপাদাপি করে। দাপাদাপি করতে করতে নূরী মাঝপুকুরে চলে যায়। রান্না ঘর থেকে নূরীর মা দেখতে পান উঠানে নুরী নেই। অথচ মাত্রই তো ছিলো। কই গেলো নূরী। রান্না ঘর থেকে দৌড়ে আসেন নূরীর মা। এসে দেখেন তার মেয়ে মাঝপুকুরে ভেসে আছেন। সাথে সাথে তিনি পুকুরে ঝাঁপ দেন। এবং নূরীকে বুকে টেনে নেন। মরতে মরতে অল্পের জন্য বেঁচে যায় নূরী। নুরীর জন্ম হয়েছিল পৃথিবীতে পিছিয়ে পড়া এবং আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগা নারীদের পথ দেখাতে।
দেশভাগের সময় সাপ্তাহিক 'বেগম পত্রিকা' প্রকাশিত হয়।
বেগম পত্রিকা'র হাত ধরেই এদেশে প্রথম ঈদসংখ্যা প্রকাশিত হয়। ঈদ সংখ্যা ছাড়াও বিশেষ বিশেষ দিনে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ হতো। 'বেগম' পত্রিকাটি বহু নারীকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছে। নারীকে সবল ও সাহসী করার লক্ষ্যে 'বেগম ক্লাব' প্রতিষ্ঠা করা হয়। নূরজাহান বেগমের পিতা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন 'সওগাত' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, ছিলেন 'বেগম' পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ও ফাতেমা বেগমের একমাত্র মেয়ে নূরজাহান বেগম। ডাক নাম নূরী। ১৯২৫ সালের ৪ জুন চাঁদপুরের চালিতাতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন 'বেগম' পত্রিকার নূরজাহান বেগম।
নূরজাহান বেগমের শৈশব কাটে গ্রামের বাড়িতে।
বেগম পত্রিকার প্রকাশনা শুরু হয় ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই যখন নূরজাহান বেগম বিএ শ্রেণীতে পড়তেন। 'বেগম' পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন সুফিয়া কামাল। বেগমের শুরু থেকে নূরজাহান বেগম ছিলেন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। পিতা এবং কন্যা সমাজে নারীদের অগ্রগতি যেভাবে চিন্তা করতেন, ঠিক সে বিষয়গুলো বেগম পত্রিকায় প্রতিফলিত হতো। পাশাপাশি নারীদের গৃহকর্মের কথা, ছবি এবং তাদের নানা সমস্যার কথা প্রকাশিত হতো। নারীদের ছবি আঁকতে, লেখার জন্য উৎসাহ দিতেন নূরজাহান বেগম। বেগম পত্রিকা শুধু নারীদের উদ্দেশ্য করেই গোড়াপত্তন হলেও ধীরে ধীরে এই পত্রিকা পুরুষদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে উঠে।
ইদানিং রাতে শশীভূষনের একেবারেই ঘুম আসে না।
স্ত্রীও বেঁচে নেই যে রাত জেগে গল্প করবেন। অপলা'র এত তাড়াতাড়ি মরে যাওয়া ঠিক হয়নি। তার স্ত্রী অপলা ছিল তার বন্ধু। খুব ভালো বন্ধু। যে বন্ধুর কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। ইচ্ছা করলে কান্নাও করা যায়। এখন সে বড্ড একা। একমাত্র মেয়ে অলকা সেও লেখা পড়তে করতে চলে গেলো দেশের বাইরে। এখন মধ্যে রাত্রে চা খেতে ইচ্ছা করলেও বানিয়ে দেবার কেউ নেই। তিনি চা বানাতে পারেন না। অনেক বার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। দিনেরবেলা এদিক সেদিক যাওয়া যায়। এ পাড়ায় একটা লাইব্রেরী আছে, সেখানে বই নিয়ে বসলে সময় কিভাবে চলে যায় টের পাওয়া যায় না। রাতটা পার করাই বড্ড মুশকিল। রাতেরবেলা কোথাও যাওয়া যায় না। সময় তো পার করতে হবে তাই শশীভূষন ক্লান্তিহীন ভাবে তার ডায়েরীতে লিখে চলেছেন-
সমস্ত পৃথিবী জুড়েই দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে মানুষ।
তাদের একটি দল হচ্ছে শাসক শ্রেণী, অন্যটি শোষিত শ্রেণী। পৃথিবীর আদিতে এই সব শ্রেণী বিভাজন ছিল না। কারণ তখন রাজা প্রজার ভেদ বুঝতে পারতো না মানুষ। পশ্চিমা দেশগুলো সভ্যতার সংগ্রামের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। অন্ত পাঁচহাজার বছর আগে থেকে শুরু করতে পেরেছিল তারা। শশীভূষনের লেখা থামালেন। এখন তার মধ্যে কবিতা লেখার ভাব এসেছে। কলেজে পড়ার সময় তিনি প্রচুর কবিতা লিখতেন। পত্রিকাতে তার কবিতা ছাপানো হতো। তার কবিতার মুগ্ধ পাঠক ছিলেন অপলা, তার স্ত্রী। অবশ্য সেসব কবিতা তিনি জমা করে রাখেন নি। যদি কবিতা গুলো জমা করে রাখতেন তাহলে হাজার খানেক কবিতা হতো। শশীভূষন ব্যলকনিতে গিয়ে কিছুক্ষন রাতের আকশের দিকে তাকালেন তারপর তিনি কবিতা লিখতে শুরু করলেন।
অদৃশ্য কুয়াশায় দেখা যায় না ইষ্টিশন মাস্টারের ঘর,
ওয়েটিং রুমে বসে চোখে ভাসে তোমার কপালের টিপ
তুমি তো জানো- আমি আমার ইচ্ছা মতো লিখি
যেখানে ইচ্ছা কমা বসাই,,, যেখানে ইচ্ছা দাড়ি দেই।।।
বাড়িয়ে রাখো তোমার হাত- সময় মতো ধরে নিবো।
এতটুকু লিখে কবিতা আর এগোয় না।
শিশীভূষন মাথা চুলকায়। না নতুন কোনো শাব্দ আসছে না। অথচ তিনি নিজের কাছে জিদ ধরে বসে আছেন কবিতাটা শেষ না করে ঘুমাতে যাবেন না।
জওহরলাল নেহরু কে কারাবাস করতে হয় দীর্ঘদিন।
কারাবাসের দিনগুলো তাঁর নিজের জন্য খুব কষ্টের এবং বিশেষ অভিজ্ঞতা ছিল ঠিকই, তবে ওই অসহ্য বন্দী জীবনে থেকেই তিনি রচনা করেন গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বই। 'ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া' ওই তিন দারুণ গ্রন্থেরই একটি। বইটি দিনলিপি আকারে রচিত, যে দিনলিপিগুলি ধারণ করে আছে জওহরলালের ভারতচিন্তা ও ইতিহাস ভাবনা। নিজের ব্যক্তিগত জীবনকেও নানা আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন। স্ত্রী কমলা ও প্রিয় কন্যা ইন্দিরা গান্ধীর বর্ণনা উঠে এসেছে বারবার, স্ত্রীর অসুস্থতা ও মৃত্যুর সময়গুলোর দিনলিপি বর্ণনা করেছেন। মহাভারত, গীতা ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের নানা দিক উল্লেখিত হয়েছে বইটিতে। বইয়ের শেষ দিকে আলোচিত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ভারতবর্ষের রাজনীতি ক্ষেত্রে তার প্রভাব। বইটি শুরু হয়েছে তাঁর কারাজীবন ও ব্যক্তি জীবন দিয়ে।
ওমর আলীর হাতে পন্ডিত নেহেরু 'ডিস্কভারি অব ইন্ডিয়া' বইটি।
তিনি ৩১৪ পৃষ্ঠাটি খুব মন দিয়ে পড়ছেন। স্ত্রী সরলা বিবিকে বললেন, আমায় আরেক কাপ চা দিবে? ওমর আলী মনে করেন, ভারতকে বুঝতে হলে এই বইটি অবশ্যই পাঠ করতে হবে। ইতিহাস ব্যাপারটা যে এতো চমৎকারভাবে, ব্যতিক্রমী দৃষ্টিতে উপস্থাপন করা যায় তা এ বইটি না পড়লে জানা হতো না। ওমর আলী হচ্ছেন আমার নানা। তিনি খুবই সহজ সরল একজন মানুষ। আমৃত্যু নানান বিষয় নিয়ে লেখাপড়া করে গেছেন। আমার যখন তিন বছর বয়স, তখন নানা মারা যান। মায়ের কাছ থেকে নানার অনেক গল্প শুনেছি। জওহরলাল নেহ্রু'র সাথে বাংলাদেশের একজন রাজনীতিবিদের সাথে খুব মিল আছে, বলুন তো দেখি আমি কার কথা বলছি?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


