somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাতের বার্লিন আর বাঙ্গালির যৌনতা (পর্ব ১)

১৪ ই মে, ২০২১ বিকাল ৪:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বার্লিন, পৃথিবীতে এক বিখ্যাত শহরের নাম। বিশ্ববহ্মাণ্ডে দুটি বিরাট যুদ্ধ হয়েছে, কোটি প্রাণের মৃত্যু হয়েছে। এমন দুটি অস্বাভাবিক যুদ্ধেরই কারিগর এই বার্লিন শহর। যুদ্ধ শেষে অতি দ্রুত আবার আগের স্থানে ফিরে গিয়ে রুপ-যৌবনে চিরলাবণ্যলাভ করেছে এই শহর। পৃথিবীতে পুনরায় শক্তিশালী জার্মানি প্রতিষ্ঠার রাজনীতি হয়েছে এই বার্লিন থেকেই। যুদ্ধের দামামা নেই সেই কবে থেকেই, এই নগর এখন সুন্দর-সৌন্দর্য, অপরুপ-ঐশ্বর্য্য, শিল্প-সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান আর সীমাহীন ভোগ-উপভোগের শহর। প্রতিনিয়ত এই শহরে কত কিছু হয়, যা পৃথিবীর আর কোথাও হয় না। শুক্রবার শেষ হলেই সপ্তাহান্তে এই শহরের ৩০০ টির মত ক্লাব তো বটেই, সড়কের আনাচে কানাচে সংখ্যাহীন ছোটখাট পানশালা, অপেরা, ডিস্কোবার হয়ে উঠে নাগরিকদের মনোবিনোদনের কেন্দ্র।

শিরোনাম দেখে যারা লেখাতে ঢুকেছেন এবং আশা করছেন কখন যৌনতা নিয়ে আলাপ শুরু করবো তাঁরা ধৈর্য ধরুন, সবুরে মেওয়া ফলতেও পারে। তার আগে আমরা সংক্ষেপে জেনে নিতে চাই বেলা ডুবে গেলে, রাতের আঁধারে উর্বশী বার্লিনে কী কী হয়, কোথায় কী কী করা যায় ইত্যাদি। বলছিলাম বার্লিনে ক্লাবের সংখ্যা ৩০০ টি’র মতো, রাতের গল্প করতে গেলে এগুলোর কথাই আসবেই।

গ্রীষ্মে দুপুরের পরপরই জমতে শুরু করে ক্লাবগুলো। মাঝে মাঝে পোশাকে আশাকে থাকে থিম। একবার এক ক্লাবে গিয়েছিলাম যেখানে বেশিরভাগ নারী পুরুষ পঞ্চাশের দশকের পোশাক পরে ঘুরছে, মাঝে আমি এক বলদ বাঙ্গাল ভাঁড় হয়ে বসে রইলাম। আমার পরনে ঢোলাঢালা টি-শার্ট। তবে পোশাকের ব্যাপারে জোরজবরদস্তি নেই, থিম মেনে পোশাক না পরলেও কেউ জাজ করবে না। এটিই বার্লিনের সৌন্দর্য। মুক্তমনে যা ইচ্ছা করা যায়, পরা যায়। ডান্সক্লাবগুলোতে লোকজন একটু দেরিতে আসে সারা রাত ধরে মদ্যপান আর উদ্যাম নৃত্যগীতে বুঁদ হয়ে থাকতে। এমন কিছু বিখ্যাত ক্লাবের মধ্যে Berghain, Tresor, Matrix, Renate, SchwuZ, Anomalie Art Club, KitKat ইত্যাদি। কিছু কিছু ক্লাব শুধুমাত্র বিষমকামীদের (straight) জন্য, কিছু শুধুমাত্র সমকামীদের (Homosexual) জন্য। উভকামী (Bisexual) আর রুপান্তরকামীদের (Transgender) জন্যেও আলাদা আলাদা ক্লাব রয়েছে। কিন্তু এসব ক্লাবে যে কেউ যেতে পারে, তার জন্যে সুনির্দিষ্ট কোন জেন্ডারের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে না। তবে বিশেষ কিছু ক্লাবের বিশেষ কিছু দিন থাকে, যেখানে কিছু বাধ্যবাধকতা থাকে। যেমন ধরুন ন্যুড ক্লাব, সেখানে গেলে শরীরের কাপড় খুলেই যেতে হবে। অসংখ্য সেক্স ক্লাব রয়েছে, সেখানে গেলে আপনাকে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়েই যেতে হবে। এছাড়া ফেটিশ, জম্বি, যাজকের বেশ ধরেও অনেক স্থানে পার্টি হয়। তবে যেখানে যাই হোক না কেন, বার্লিনের সবস্থানে একটা হৃদয়কাড়া শৈল্পিক ছোঁয়া থাকে। এমনি এমনি তো বার্লিনকে সংস্কৃতি আর সৃষ্টিশীল শিল্পের রাজধানী বলা হয় না!

Berghain ক্লাবের কথা বিশেষভাবে বলতে হবে। এটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ক্লাব নির্বাচিত হয়েছে বহুবার। পৃথিবীর বহু দেশ থেকে মানুষ বার্লিনে আসে শুধুমাত্র এই ক্লাবে পার্টি করতে। এটির আকার প্রকাণ্ড যেখানে একসাথে প্রায় হাজার দুয়েক লোক একত্র হতে পারে। এখানে আছে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সাউন্ড সিস্টেম আর অসাধারণ ইন্টেরিওর ডিজাইন। সপ্তাহান্তে টানা তিনদিন এখানে পার্টি হয়, একটা বড় অংশ শুক্রবার রাতে ঢুকে সোমবার সকালে বের হয়। এই ক্লাবে ঢোকা স্বর্গে ঢোকার থেকেও কঠিন। ৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে দরজা থেকে ফিরিয়ে দেয়া খুবই কমন দৃশ্য। কারণ ব্যাখ্যা করা ছাড়াই ঢুকতে দেবে না- এই মানসিকতা নিয়েই মানুষ ওখানে যায়।

এই ক্লাবে আমার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে চাই। আমাদের কলিগ আন্দ্রেয়াস চাকরি ছেড়ে চলে যাবে ২০১৯ এর গ্রীষ্মে। যাবার আগে সবাইকে একবেলা পান করিয়ে যাওয়া এখানে নিয়ম। সিদ্ধান্ত হল সহকর্মীরা সকলে মিলে এই বার্গহাইনে (Berghain) যাবে। বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীর সবথেকে বেশি কঠিন এই ক্লাবে ঢোকা। ভাগ্যের দেবতা সেদিন সুপ্রসন্ন ছিলেন, আমরা ঢুকতে পেরেছিলাম। সবাই যার যার পানীয় সংগ্রহ করে নাচানাচি আরম্ভ হল সাথে কড়া টেকনো মিউজিক। আমাদের একজনকে দেখলাম কাপড় সব খুলে রেখে শুরুমাত্র অন্তর্বাস পরিধান করে ঝলঝলে ভুঁড়ি দুলিয়ে নাচছে। নারী সহকর্মীরাও ইচ্ছামত পোশাক পরিধান করে লাফালাফি শুরু করে দিল। এর মধ্যেই আমার সাথে পেছনের একজনের হালকা ধাক্কা লাগল। আমি সরি বলতে মাথা ঘোরালাম। এরপর যা দেখলাম একটু হলে মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিলাম। একজোড়া কপোত কপোতি শতশত মানুষের নাচানাচির মধ্যেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যৌনকর্মে লিপ্ত হয়েছে। গায়ে কোন কাপড় নেই, কেউ ভ্রুক্ষেপও করছে না!

অধিক পান করলে ঘন ঘন মূত্রবিসর্জন দিতে হয়। চিপা চাপা দিয়ে টয়লেটে গিয়ে যা দেখলাম, বাকি জিন্দেগীতে ভুলবো না। দেখি তিনজন পুরুষ মিলে একজন নারীর মুখে মূত্র বিসর্জন করছে। ওখানে আরো নারী ও পুরুষ বসে থাকে আপনার মুত্রপান করতে। একটা পুরুষের গ্রুপ দেখলাম মুখলেহন (blowjob) করার জন্যে বসে আছে, যার ইচ্ছা হচ্ছে যাচ্ছে ওখানে। আলো আঁধারি পরিবেশ, অসংখ্য টয়লেট, কোনায় কোনায় মানুষ বসে আছে এইসব অফার দিয়ে। অন্য একটা গ্রুপের কাজ হল একটা অভিনব প্রতিযোগিতা। তাঁরা একটা বাটিতে পুরুষের স্পার্ম (বীর্য) সংগ্রহ করে এক ঢোকে গিলে খায়।

ক্লাবের এসব একটি দিক, আরো অন্য অনেক দিক নিশ্চয়ই রয়েছে। উপরে যে বর্ণনা দিলাম, তাঁর থেকেও খোলামেলা ক্লাব বার্লিনে রয়েছে। তবে বার্গহাইন ক্লাবটি বার্লিনের সাংস্কৃতিক বিবর্তনে ভূমিকা রেখে চলেছে। তাই ২০১৬ সালে বার্লিনের একটি আদালত সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বিবেচনায় ক্লাবের ট্যাক্স ১৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ শতাংশ করার নিদেশ প্রদান করে।

লেখার নিয়ম হল একসময় থামতে হবে। লেখার এ পর্যায়ে এসে তথ্য আর তত্ত্বের প্রণয় ঘটিয়ে, কিছু জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিয়ে লেখা শেষ করাই যায়। বলাই যায়, ব্যক্তির শরীরে অধিকার একমাত্র সেই ব্যক্তিরই, সেই শরীর নিয়ে সে কি করবে এটি একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার, সেটি মানবাধিকারের সমান, অথবা যৌনতা এমন একটি বিষয় তা যত নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হবে, তত বিকৃত যৌনচিন্তা নিয়ে মানুষ বেড়ে উঠবে– এই টাইপ কিছু জ্ঞান দিয়ে লেখা শেষ করতে পারতাম। কিন্তু যে বাঙ্গালি জাতি বিশ্বাস করে তাঁরা সবাই কলাগাছ ফেটে জন্ম নিয়েছে, অথবা আকাশ থেকে পড়েছে ঈসা নবীর মত, তাঁদের যৌনতার ইতিহাস কেমন ছিল গত দুইশ বছরে সেই বাঙ্গালির যৌনতা নিয়ে পরবর্তী কিস্তি লেখার প্রত্যাশা রেখে আজকের পর্বের সমাপ্তি টানলাম এখানেই।

৩০ বৈশাখ ১৪২৮
ধন্যবাদান্তে
জাহিদ কবীর হিমন, বার্লিন থেকে
সম্পাদক, জার্মান প্রবাস
https://www.germanprobashe.com/

সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মে, ২০২১ বিকাল ৪:৩৯
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নিশীরাতের ভিখারিনী

লিখেছেন সোনাগাজী, ০৩ রা মার্চ, ২০২৪ ভোর ৪:৩৬



এটি একজন দরিদ্র আফ্রিকান আমেরিকান মেয়ের কাহিনী।

আমি তখন নিউইয়র্ক শহর থেকে ১১০ মাইল উত্তরে এক গ্রামে একটি কোম্পানীতে কাজ করতাম; শনি, রবিবারে নিউইয়র্ক শহরে গিয়ে কিছু ছেলেমেয়েকে চাকুরীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

বইমেলার কবিতার বই: পাঁচ বছরে বাজারে এসেছে প্রায় ছয় হাজার, মান নিয়ে বিতর্ক

লিখেছেন এম ডি মুসা, ০৩ রা মার্চ, ২০২৪ সকাল ১১:৫২

তবে কবিতার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গবেষণারাও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বায়তুল্লাহ কাদেরী বলেন,হ্যাঁ, কবিতার মান ঠিক নেই। কিন্তু এখন মান দেখার তো লোক নেই। যার যেমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

পবিত্র মাহে রমজানের প্রস্তুতি -ঈষৎ সংশোধিত পুনঃপোস্ট

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৩ রা মার্চ, ২০২৪ দুপুর ১২:৫৩

পবিত্র মাহে রমজানের প্রস্তুতি

ছবিঃ অন্তর্জাল হতে সংগৃহিত।

প্রাককথনঃ

দেখতে দেখতে পবিত্র মাহে রমজান-২০২৪ আমাদের দোড়গোড়ায় এসে উপস্থিত। রমজান, মুমিনের জীবনের শ্রেষ্ঠতম আনন্দের ক্ষণ, অফুরন্ত প্রাপ্তির মাস, অকল্পনীয় রহমতলাভের নৈস্বর্গিক মুহূর্তরাজি। রমজান... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাপ-মেয়ের দ্বৈরথ

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০৩ রা মার্চ, ২০২৪ সন্ধ্যা ৬:৫৩


আমার দাদির ঝগড়াঝাঁটির স্বভাব কিংবদন্তিতুল্য ছিল। মা-চাচীদের কাছ থেকে শোনা কষ্ট করে রান্নাবান্না করলেও তারা নাকি নিজে থেকে কখনও মাছ-মাংস পাতে তুলে খেতে পারতেন না। দাদি বেছে বেছে দিতেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বৃষ্টি খাতুনই অভিশ্রুতি, এনআইডিতে নাম সংশোধনের আবেদন করেছিল। ধর্মান্তরিত হওয়ার পিছনে দায়ী কে?

লিখেছেন এম ডি মুসা, ০৩ রা মার্চ, ২০২৪ রাত ৮:৩৩





বেইলি রোডের সেইদিনের অগ্নিকাণ্ডে নিহত অভিশ্রুতি শাস্ত্রীর প্রকৃত নাম বৃষ্টি খাতুন। অভিশ্রুতি ও বৃষ্টি খাতুন নামে দুইজন একই ব্যক্তি বলে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ সূত্রে নিশ্চিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×