একটা সমাজ কাদের দেখে বড় হয়? কাদের গল্প শুনে অনুপ্রাণিত হয়? কাদের জীবনকে সফলতার প্রতীক মনে করে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেকাংশেই নির্ধারণ করে মিডিয়া। কারণ মানুষ বাস্তবতাকে সবসময় সরাসরি দেখে না; অনেক সময় দেখে মিডিয়ার ক্যামেরার চোখ দিয়ে, শোনে মিডিয়ার ভাষ্যে, বুঝে মিডিয়ার তৈরি করা ফ্রেমে। আর সেই ফ্রেম যদি অসম্পূর্ণ হয়, তাহলে একজন মানুষকে নিয়েও সমাজের ধারণা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
বাংলাদেশে কর্পোরেট জগতে নারীর অংশগ্রহণ আজ যতটা স্বাভাবিক মনে হয়, দুই দশক আগে তা ছিল না। তখন বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি ছিল ব্যতিক্রমী ঘটনা। সেই সময়েই আলোচনায় আসে রুবাবা দৌলা নামটি। দেশের একটি মোবাইল ফোন কোম্পানির উচ্চপদে তার নিয়োগ শুধু একটি চাকরির খবর ছিল না; এটি ছিল সামাজিক মানসিকতার দেয়ালে প্রথম বড় আঘাতগুলোর একটি।
বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের কাছে তিনি তখন ছিলেন একধরনের বিস্ময়। সংবাদপত্রে নিয়মিত তার ছবি ছাপা হতো। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—কোন রুবাবাকে তখন আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল?
একজন মেধাবী নারীকে, নাকি একজন “দেখতে সুন্দরী” নারীকে?
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের গণমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরে নারীর সাফল্যকে তার চিন্তা, দক্ষতা বা প্রজ্ঞার চেয়ে তার বাহ্যিক উপস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। একজন নারী কর্পোরেট নেতৃত্বে পৌঁছালে তার কাজের বিশ্লেষণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তার পোশাক, স্টাইল বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে গসিপ। ফলে সমাজও তাকে সেভাবেই চিনেছে।
রুবাবা দৌলাকে নিয়েও দীর্ঘদিন এমনটাই হয়েছে। পত্রিকার পাতায় তার সাফল্যের গল্পের চেয়ে তার সাজসজ্জা বেশি জায়গা পেয়েছে। অথচ সময়ের সাথে বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও আলোচনায় উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানুষ—অসাধারণ মেধাবী, সংস্কৃতিমনা, শিল্পবোদ্ধা এবং গভীর পাঠাভ্যাসসম্পন্ন একজন নারী। জানা গেছে, তিনি শিক্ষাজীবনে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন, সংগীতচর্চা করেছেন, শিল্পকলার প্রতি তার গভীর অনুরাগ রয়েছে, এবং সবচেয়ে বড় কথা—তিনি অত্যন্ত চিন্তাশীল ও সংবেদনশীল একজন মানুষ।

এই দিকগুলো কেন আমরা আগে জানতাম না?
কারণ মিডিয়া আমাদের তা জানতে দেয়নি। তারা এমন একটি চরিত্র নির্মাণ করেছিল, যেখানে একজন নারীর সৌন্দর্য ছিল “সংবাদ”, কিন্তু তার প্রজ্ঞা ছিল “অদৃশ্য”।
এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। যখন কোনো সমাজে নারীর সাফল্যকে কেবল গ্ল্যামারের মোড়কে দেখানো হয়, তখন সেই সমাজের নতুন প্রজন্মও ভুল বার্তা পায়। তারা ভাবে, দৃশ্যমানতাই সাফল্য; অথচ প্রকৃত সাফল্য আসে মেধা, শ্রম, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আত্মনির্মাণ থেকে।
বাংলাদেশে আজও অসংখ্য মেধাবী নারী আছেন, যারা নিজেদের জায়গা থেকে অসাধারণ কাজ করে যাচ্ছেন। কেউ প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, কেউ গবেষণায়, কেউ শিল্পে, কেউ উদ্যোক্তা হিসেবে, কেউ শিক্ষায়, কেউ প্রশাসনে। কিন্তু তাদের গল্প খুব কমই সামনে আসে। কারণ আমাদের মিডিয়া এখনো “ভাইরালযোগ্য” বিষয়কে “মূল্যবান” বিষয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।
ফলে আমরা অনেক সম্ভাবনাময় মানুষকে হারিয়ে ফেলি জনচোখের আড়ালে।
একটি সমাজ এগিয়ে যায় তখনই, যখন সে তার মেধাবীদের দৃশ্যমান করে। শুধু রাজনীতি বা বিনোদনের তারকা নয়, বরং চিন্তাশীল, দক্ষ, সৃজনশীল এবং নৈতিক মানুষদের সামনে নিয়ে আসে। তরুণ প্রজন্মের সামনে যদি কেবল বিতর্ক, গসিপ আর বাহ্যিক চাকচিক্যের উদাহরণ তুলে ধরা হয়, তাহলে তাদের স্বপ্নও সেদিকেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।
আজ আমাদের দেশে আরও কয়েক’শ রুবাবা দরকার—যারা কর্পোরেট বোর্ডরুমে আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথা বলবেন, শিল্প-সংস্কৃতিকে ধারণ করবেন, আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জন করবেন, আবার একই সঙ্গে মানবিক ও সংবেদনশীল থাকবেন। কিন্তু শুধু রুবাবা তৈরি হলেই হবে না; তাদের গল্পও তুলে আনতে হবে।
কারণ অনুপ্রেরণা অদৃশ্য থাকলে সমাজ বদলায় না।
আমাদের মিডিয়ারও এখন আত্মসমালোচনার সময় এসেছে। একজন নারীর ছবি দিয়ে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সহজ, কিন্তু তার চিন্তার গভীরতা তুলে ধরা কঠিন। অথচ সমাজ গঠনের জন্য দ্বিতীয় কাজটিই বেশি জরুরি। গণমাধ্যম যদি সত্যিই পরিবর্তনের অংশ হতে চায়, তাহলে তাকে বাহ্যিকতার মোহ থেকে বের হয়ে মানুষের প্রকৃত অর্জনকে সামনে আনতে হবে।
রুবাবা দৌলার গল্প তাই কেবল একজন নারীর গল্প নয়; এটি আমাদের মিডিয়া-সংস্কৃতিরও আয়না। সেখানে আমরা দেখতে পাই—সমাজ কাকে দেখেছে, আর কাকে দেখতে ব্যর্থ হয়েছে।
এখন সময় এসেছে সেই ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার। কারণ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু আরও কয়েক’শ রুবাবার ওপর নির্ভর করছে না; নির্ভর করছে আমরা তাদের কীভাবে দেখি, কীভাবে মূল্যায়ন করি, এবং কীভাবে তাদের গল্প আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিই তার ওপরও।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

