somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

িজল্লুল
চিকিৎসা সাধনা: হোমিওপ্যাথির দীর্ঘ পথগত ৪৪ বছর ধরে নিয়মিত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বিজ্ঞান চর্চা করে আসছি। চিকিৎসা আমার কাছে শুধু একটি পেশা নয়; এটি একটি মানবিক সাধনা। রোগীর শরীরের অসুস্থতার পাশাপাশি তার মানসিক অবস্থা, পারিবারিক বাস্তবতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট

আমরা এখন লিখতে পারি

০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমরা এখন লিখতে পারি

ইকবাল জিল্লুল মজিদ

আমরা এখন লিখতে পারি—এই বাক্যটি যতটা আনন্দের, ততটাই সতর্কতার। কারণ এটি কোনো স্থায়ী বিজয়ের ঘোষণা নয়; এটি একটি দীর্ঘ দমবন্ধ করা সময়ের পর সাময়িকভাবে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ। ২০০৮ সাল থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতির ওপর যে ফ্যাসিবাদী চক্র ধীরে ধীরে চেপে বসেছিল, তারা শুধু ক্ষমতা দখল করেনি—তারা দখল করেছিল আমাদের চিন্তা, আমাদের ভাষা, আমাদের কলম, এমনকি আমাদের নীরবতাকেও।

এই সময়টা ছিল এমন এক সময়, যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা অপরাধে পরিণত হয়েছিল, প্রশ্ন করা রাষ্ট্রবিরোধী হয়ে উঠেছিল, আর সত্য লেখা মানে ছিল নিজের জীবনের ঝুঁকি নেওয়া। আজ আমরা আপাতত মুক্ত—কিন্তু সেই মুক্তির অর্থ বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে এই দীর্ঘ অন্ধকার সময়ের দিকে।

ফ্যাসিবাদ হঠাৎ জন্ম নেয় না

ফ্যাসিবাদ কখনো হঠাৎ করে জন্ম নেয় না। এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে—জনগণের ক্লান্তি, ভয়, নিরাপত্তাহীনতা এবং রাজনৈতিক উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে। ২০০৮ সালের পর আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় যে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার সংস্কৃতি গড়ে উঠল, তা ধীরে ধীরে গণতন্ত্রকে একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামোতে পরিণত করল, যার ভেতরের প্রাণশক্তি ক্রমশ শুকিয়ে যেতে লাগল।

নির্বাচন থাকল, কিন্তু অংশগ্রহণ সংকুচিত হলো। সংসদ থাকল, কিন্তু বিতর্ক হারিয়ে গেল। গণমাধ্যম থাকল, কিন্তু স্বাধীনতা নয়। এই শূন্যতার মধ্যেই ফ্যাসিবাদী মানসিকতা শক্তি সঞ্চয় করল। তারা বুঝে গেল—মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আগে তাদের ভাষা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, তাদের চিন্তাকে ভয় দেখাতে হবে।

কলম ছিল সবচেয়ে বড় শত্রু

এই সময়ে লেখক, সাংবাদিক, ব্লগার, গবেষক, কার্টুনিস্ট—সবাই হয়ে উঠেছিল সন্দেহভাজন। রাষ্ট্রের চোখে প্রশ্নকারী মানেই বিরোধী, আর বিরোধী মানেই শত্রু। ডিজিটাল আইন, বিশেষ আইন, অদৃশ্য নজরদারি—সব মিলিয়ে একটি ভয়ংকর পরিবেশ তৈরি করা হলো, যেখানে মানুষ নিজের কথা নিজেই কেটে ফেলতে শুরু করল।

সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণ (self-censorship)। মানুষ আর বলত না, লিখত না—কারণ তারা জানত, সত্য বলার শাস্তি আছে, কিন্তু মিথ্যা বলার পুরস্কার। এইভাবে একটি সমাজ ধীরে ধীরে নীরব হয়ে পড়ে। আর নীরব সমাজই ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

অপশক্তি ও প্রতিহিংসার রাজনীতি

ফ্যাসিবাদ কেবল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অপশক্তি ও প্রতিহিংসার রাজনীতি। ভিন্নমতকে শুধু দমন করা হয়নি, তাকে ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত করা হয়েছে। চরিত্রহনন, মামলা, চাকরিচ্যুতি, সামাজিক বয়কট—সবকিছুই ব্যবহৃত হয়েছে ভয়ের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে।

এই প্রতিহিংসার রাজনীতি সমাজকে বিভক্ত করেছে। মানুষকে শিখিয়েছে—চুপ থাকাই বাঁচার উপায়। এই অবস্থায় আমাদের চিন্তা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়েছে, ভাষা হয়েছে সতর্ক, লেখা হয়েছে অস্পষ্ট। আমরা লিখেছি, কিন্তু পুরো সত্য লিখতে পারিনি।

৫ আগস্ট ২০২৪: আপাত মুক্তি

৫ আগস্ট ২০২৪ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এই সময় থেকে আমরা দেখতে পেলাম—ভয়ের দেয়ালে ফাটল ধরেছে। মানুষের কণ্ঠে আবার শব্দ ফিরছে, লেখায় ফিরে আসছে সাহস। আমরা আবার বলতে পারছি—আমরা লিখতে পারি।

কিন্তু এই “পারছি” শব্দটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি “পেরেছি” নয়। অর্থাৎ, লড়াই শেষ হয়নি। ফ্যাসিবাদ পরাজিত হয়নি, তারা শুধু পিছু হটেছে। তারা রূপ বদলায়, কৌশল বদলায়, কিন্তু লক্ষ্য বদলায় না।

কেন তারা এমন হয়ে উঠেছিল

প্রশ্ন আসতে পারে—কেন তারা এমন হলো? কারণ ক্ষমতা যখন জবাবদিহি হারায়, তখন তা স্বৈরতন্ত্রে রূপ নেয়। কারণ দীর্ঘদিন প্রশ্নহীন শাসন মানুষকে অহংকারী করে তোলে। কারণ রাষ্ট্র যখন নাগরিককে অংশীদার না ভেবে শত্রু ভাবে, তখন ফ্যাসিবাদ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

আর আমরা—নাগরিকরাও পুরোপুরি দায়মুক্ত নই। আমরা অনেক সময় সুবিধার জন্য চুপ থেকেছি, ভয়কে স্বাভাবিক মেনে নিয়েছি, অন্যায়ের সাথে আপস করেছি। এই সম্মিলিত নীরবতাই ফ্যাসিবাদকে শক্তি জুগিয়েছে।

ভবিষ্যৎ: লিখতে পারবো, তবে সতর্ক থাকতে হবে

আমরা লিখতে পারি—কিন্তু কীভাবে লিখবো, কেন লিখবো, এবং কিসের জন্য লিখবো—এই প্রশ্নগুলো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে আমাদের লেখার দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ যারা একবার কলম ভাঙতে চেয়েছে, তারা আবার চেষ্টা করবেই।

সতর্ক থাকতে হবে যেন:

আমরা আবার ভয়কে স্বাভাবিক করে না নিই

স্বাধীনতাকে স্থায়ী ধরে নিয়ে অলস না হয়ে পড়ি

ভিন্নমতকে শত্রু না ভাবি

এবং রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করাকে দেশবিরোধিতা বলে মেনে না নিই

লেখা শুধু আবেগ নয়, লেখা দায়িত্ব। লেখা ইতিহাসের সাক্ষ্য। আমরা যদি না লিখি, তাহলে আবার কেউ আমাদের হয়ে ইতিহাস লিখবে—আর সেই ইতিহাস হবে বিকৃত, একপেশে, ভয়ংকর।

শেষ কথা

আমরা এখন লিখতে পারি—এই কথাটি একটি অর্জন, কিন্তু একই সঙ্গে একটি সতর্ক সংকেত। ফ্যাসিবাদী চক্রের হাত থেকে আমরা আপাতত মুক্ত, কিন্তু মুক্তির স্থায়িত্ব নির্ভর করবে আমাদের সাহস, সততা এবং ধারাবাহিকতার ওপর।

কলম থামলে অন্ধকার ফিরে আসে।
কলম চললে ইতিহাস বাঁচে।

তাই আমরা লিখবো—
সত্য লিখবো,
ভয়ের বিরুদ্ধে লিখবো,
এবং সতর্ক থেকেও লিখবো।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:০৬
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Epstein File-মানবতার কলঙ্ক

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮

গত ৩০ জানুয়ারি Epstein Files এর ৩ মিলিয়নেরও বেশি পৃষ্ঠার নথি, ২,০০০ অধিক ভিডিও এবং ১৮০,০০০টি ছবি প্রকাশিত হয়েছে। আমেরিকা ও ইসরায়েলের সব কুকর্ম ফাঁস করা হয়েছে!
যারা মানবতা, সভ্যতা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

রোজার ২৪ আধুনিক মাসআলা, যেগুলো জেনে রাখা প্রয়োজন সকলেরই - রিপোস্ট

লিখেছেন নতুন নকিব, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৪০

রোজার ২৪ আধুনিক মাসআলা, যেগুলো জেনে রাখা প্রয়োজন সকলেরই - রিপোস্ট

ছবিঃ অন্তর্জাল।

পবিত্র মাহে রমজান খুবই নিকটবর্তী। আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজাবা ওয়া শা'বান, ওয়া বাল্লিগনা রমাদান। হে আল্লাহ,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামায়াতের আমিরের একাউন্ট হ্যাক আওয়ামী লীগের হ্যাকাররা করে থাকতে পারেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৫৮



নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লিখছি। গত বছর, লন্ডন থেকে আমার এক আত্মীয় হঠাত একদিন আমাকে জানান যে, 'গ্রামের রাজনীতি' নামক এক ফেসবুক পেইজে আমার উপরের ছবি দেওয়া হয়েছে। আমি হতবাক!... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একটি জোনাক প্রহর দেবে আমায়=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৩৮


গাঁয়ের বাড়ি মধ্যরাতে
জোনাক নাকি বেড়ায় উড়ে,
ঝিঁঝি নাকি নাকি সুরে
ডাকে দূরে বহুদূরে?

মধ্যরাতের নীল আকাশে
জ্বলে নাকি চাঁদের আলো!
রাতে নাকি নিরিবিলি
বসে থাকলে লাগে ভালো?

শিয়াল ডাকে হুক্কা হুয়া;
কুকুর ডাকে একা ঘেউ ঘেউ;
মধ্যরাতে গাঁয়ে নাকি
ঘুমায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাকিস্তানের বির্যে জন্ম নেয়া জারজরা ধর্মের ভিত্তিতে, বিভাজিত করতে চায় বাংলাদেশের নাগরিকদের ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:২৯



বাংলাদেশী ধর্মান্ধ মুসলমান,
বাঙালি পরিচয় তোমার কাছে অপ্রয়োজনীয় বাহুল্য।
তুমি কি দেশে দেশে Ehtnic Cleansing এর ইতিহাস জানো? জাতিগত নিধন কী বোঝো?
বাঙালি জাতি নিধনের রক্ত-দাগ প্রজন্ম থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×