আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপলব্ধি
ইকবাল জিল্লুল মজিদ
তারিখ: ২৬.০১.২৬
মানুষ জন্ম নেয় একটি উদ্দেশ্য নিয়ে—সে উদ্দেশ্য কখনো স্পষ্ট, কখনো অচেতন, কখনো আবার সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে আবিষ্কৃত হয়। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি তখনই ঘটে, যখন মানুষ নিজের সেই মৌলিক লক্ষ্য ভুলে যায়। আধ্ব্যাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং আত্মিক বিচ্যুতি, আত্মপরিচয়ের সংকট এবং অন্তর্গত শূন্যতার সূচনা।
আধ্ব্যাতিকভাবে মানুষের লক্ষ্য শুধু অর্থ, পদ, ক্ষমতা বা সামাজিক স্বীকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের প্রকৃত লক্ষ্য হলো আত্মশুদ্ধি, নৈতিক উন্নয়ন, সত্যের অনুসন্ধান এবং সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্টার সংযোগ উপলব্ধি করা। কিন্তু বাস্তব জীবনে মানুষ যখন বাহ্যিক সাফল্যের মোহে পড়ে যায়, তখন ধীরে ধীরে তার অন্তরের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে আসে। সে ভুলে যায়—আমি কে, কেন এসেছি, এবং কোথায় যাচ্ছি।
লক্ষ্য বিস্মৃতির এই প্রক্রিয়াটি হঠাৎ ঘটে না। এটি ঘটে ছোট ছোট আপসের মাধ্যমে। আজ সত্যের সঙ্গে সামান্য আপস, কাল বিবেকের সঙ্গে এক চুল ছাড়, পরশু নৈতিকতার সঙ্গে নীরব সমঝোতা—এই ধারাবাহিকতায় মানুষ একসময় এমন এক জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে সে নিজেই নিজেকে চিনতে পারে না। বাহ্যিকভাবে সে সফল, কিন্তু অন্তরে সে দারিদ্র্যগ্রস্ত।
আধ্ব্যাতিক জ্ঞান বলে, মানুষ যখন নিজের লক্ষ্য ভুলে যায়, তখন সে সময়কে নিয়ন্ত্রণ করে না; বরং সময় তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। সে পরিস্থিতির দাস হয়ে পড়ে, কামনা-বাসনার চাকায় আবদ্ধ হয়, এবং জীবনের গভীর অর্থের বদলে ক্ষণস্থায়ী সুখের পেছনে ছুটতে থাকে। এই ছুটে চলা আসলে এক ধরনের আত্মবিস্মরণ—নিজের আত্মাকে ভুলে যাওয়া।
আরও গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, লক্ষ্য ভুলে যাওয়ার মূল কারণ হলো আত্মসমালোচনার অভাব। মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়—আমি কি সঠিক পথে আছি? আমার কাজ কি আমার আত্মাকে শান্ত করছে? আমি কি শুধু বেঁচে আছি, নাকি সত্যিকার অর্থে জীবন যাপন করছি? এই প্রশ্নগুলো না থাকলে জীবন যান্ত্রিক হয়ে পড়ে, আর আত্মা হয়ে যায় ক্লান্ত ও ভারাক্রান্ত।
তবে আধ্ব্যাতিক দৃষ্টিতে আশার দিকও আছে। মানুষ যত দূরেই বিচ্যুত হোক না কেন, আত্মজাগরণের দরজা কখনো বন্ধ হয় না। একটি গভীর উপলব্ধি, একটি নীরব অনুশোচনা, কিংবা একটি আন্তরিক আত্মসমর্পণ—এই তিনের যেকোনো একটি মানুষকে আবার তার আসল লক্ষ্যের পথে ফিরিয়ে আনতে পারে। কারণ লক্ষ্য আসলে বাইরে কোথাও নয়; লক্ষ্য মানুষের অন্তরের গভীরেই নিহিত।
পরিশেষে বলা যায়, মানুষের সবচেয়ে বড় বোকামি সত্যিই নিজের লক্ষ্য ভুলে যাওয়া—কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রজ্ঞা হলো, সেই ভুলটি একদিন উপলব্ধি করা। যে মানুষ আবার নিজের লক্ষ্য স্মরণ করতে পারে, সে নতুন করে জন্ম নেয়—শরীরে নয়, আত্মায়। আর সেই আত্মিক পুনর্জন্মই মানুষের জীবনের প্রকৃত সাফল্য
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




