১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া খানের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানে কিভাবে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলো?
ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের নির্বাচনে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন মনে করেননি। কারণ, ওনার ধারণা ছিল যে, পাকিস্তান মুসলিম লীগ, এবং জামাত-ই-ইসলাম-এর সামনে মুজিবকে বেশ শক্ত প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে।
নির্বাচনের আগে ইয়াহিয়া খান-এর হাতে যে গোয়েন্দা তথ্য ছিল তা অনুযায়ী মুজিবউর রহমান-এর জেতার সম্ভাবনা ছিল অত্যধিক বেশি। কিন্তু, ইয়াহিয়া খান এই সকল গোয়েন্দা তথ্য উপেক্ষা করেছিলেন, এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর নিজের মূল্যায়ন ছিল যে, পূর্ব পাকিস্তানে মুজিবের পক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সম্ভব হবে না।
বাস্তবে যেটা হয়েছিল তা হচ্ছেঃ
(১) মোহাম্মদ আলী বগুড়া এর প্রবর্তিত "ওয়ান-ইউনিট" ব্যাবস্থা আইয়ুব খান কর্তৃক বিলুপ্ত হবার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে সীট বন্টনের দিক দিয়ে আওয়ামী লীগ সব সময়েই সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। যেটা করা উচিত ছিল, তা হচ্ছে, পূর্ব পাকিস্তানকে ভেঙ্গে একাধিক প্রদেশ বানানো। সম্ভবতঃ, তা করা হয়নি কারণ, মিলিটারী শাসকরা এই বিষয়টি অনুধাবন করতে ব্যার্থ হয়েছিল। অথবা, আইয়ুব খান মনে করেছিলেন যে পূর্ব পাকিস্তানে উন্নয়ন কর্মকান্ডের বরাদ্দ বাড়ালে তাদের মাথা ঠাণ্ডা হবে। অথবা, পূর্ব পাকিস্তান ভেঙ্গে আলাদা প্রদেশ বানাতে গেলে তিনি তাঁর ক্ষমতা হারাবেন। তাঁর বোঝা উচিত ছিল যে তিনি লড়ছিলেন ভারত এবং আওয়ামী লীগের যৌথ কূট বুদ্ধির বিরুদ্ধে।
(২) মাওলানা ভাসানীর ন্যশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) এবং অন্যান্য বামপন্থীরা নির্বাচন বয়কট করেছিল। ফলে তাদের ভোট গুলো যেয়ে পড়ে আওয়ামী লীগের ঝুলিতে।
(৩) নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দল গুলো প্রচারনা চালানোর জন্য প্রায় এক বছর সময় পেয়েছিল; ফলে মুজিব তার বক্তৃতা দেবার স্বভাবমুলভ দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে পাবলিকের ব্রেন ওয়াশ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পেয়েছিলেন।
(৪) ভোলা সাইক্লোন-এর ত্রাণ কার্যক্রমের ধীর গতি মুজিবের জন্য শাপে বর হয়ে দেখা দিয়েছিল। আওয়ামী লীগ এটাকে প্রোপাগান্ডা হিসাবে কাজে লাগায়। আসলে, ভোলা সাইক্লোনের ত্রানের ধীর গতির জন্য পাকিস্তান সরকার মোটেও দায়ী ছিল না। দায়ী ছিল ভোলা সাইক্লোনের ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপক আকার। বাঙ্গালিদের দ্বারা ত্রাণ সামগ্রীর ব্যাপক লুটপাট।
(৫) জামাত এবং মুসলিম লীগ ইলেকশনে সম্পূর্ন পর্যুদস্ত হয়, যেটা ইয়াহিয়া খানের মিলিটারি মগজ আগে থেকে অনুমান করতে পারেনি।
.
তার মানে কি নির্বাচন সুষ্ঠ হয়েছিলো?
মোটেও না।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে —
(১) পূর্ব পাকিস্তানের ইলেকশনের সকল কর্মকর্তা ছিল আওয়ামী লীগের বাছা বাছা লোক।
(২) সকল ভোট কেন্দ্র আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। লীগের সাপোর্টার ছাড়া কাউকে ভোট কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হয়নি। যারা আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করে ভোট কেন্দ্রে ঢোকার চেষ্টা করেছিল তাদেরকে মারধোর করা, গুলি করা, বা ছোরা মারা হয়েছিল।
(৩) মুজিবকে এরকম বলতে শোনা গিয়েছিল যেঃ "আমরা ইচ্ছা করলে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২ আসনের সবগুলোই দখল করতে পারতাম, কিন্তু করিনি।"
.
প্রশ্ন হতে পারে যে, ইয়াহিয়া এরকম হতে দিলেন কেন?
এর উত্তর হচ্ছে -
(১) মিলিটারী বুদ্ধি সব সময় সিভিলিয়ান বুদ্ধির অর্ধেক হয়। সেখানে তিনি লড়ছিলেন আওয়ামী লীগ এবং ভারতের যৌথ কূট বুদ্ধির বিরুদ্ধে।
(২) নির্বাচনের আগে গোয়েন্দারা ইয়াহিয়া খানকে মুজিবের জয়ের ব্যাপারে সতর্ক করলেও তিনি তা পাত্তা দেননি।
(৩) ইয়াহিয়া ইলেকশনকে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দিতে চাননি। অর্থাৎ, তিনি একটি প্রকৃত ফেয়ার ইলেকশন চেয়েছিলেন।
(৪) পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ বাদে অন্যান্য যে দলগুলো ছিল সেগুলোর উপরে তাঁর আস্থা বাস্তব অবস্থার চেয়ে বেশি ছিল। সম্ভবতঃ ইয়াহিয়া খানের সামনে ঐ দল গুলো নিজেদের শক্তিমত্তা ফুলিয়ে ফাপিয়ে প্রদর্শন করেছিল।
.
কিন্তু একটা সুষ্ঠ নির্বাচন দিয়েও পরবর্তীকালে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করা হলো কেন?
কারণ, নির্বাচনে জেতার পরে ১৯৭১ সালের ৩-রা জানুয়ারী রমনার রেসকোর্সের ময়দানে ভোটে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের ন্যাশনাল এবং প্রভিন্সিয়াল এম,পি,-রা মুজিবের নেতৃত্বে শপথ নেয় যে তারা দেশ ভাগ করা ছাড়া অন্য কিছুই মেনে নেবে না।
এই খবর ইয়াহিয়ার কাছে পৌছার পরে তিনি ১২ই জানুয়ারী পূর্ব পাকিস্তান সফর করে মুজিবের সাথে দেখা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন। ভুট্টো মুজিবের সাথে ছয়-দফা নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেন।
মুজিব এসব প্রত্যাখ্যান করেন। অর্থাৎ, মুজিব এবং আওয়ামী লীগ তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। অধিকন্তু, এসবের মধ্যেই মুজিব ৭ই মার্চ-এর ভাষণ দিয়ে বসেন।
ফলে, ভুট্টোর সাথে আলাপ করে ইয়াহিয়া সিদ্ধান্ত নেন যে মুজিবের হাতে ক্ষমতা দেয়া হবে না।
.
বিঃদ্রঃ এক হাতে কখনও তালি বাজে না। একটি দেশ যখন ভাঙ্গে তখন বুঝতে হবে যে উভয় পক্ষেরই অপরাধ ৫০-৫০।
.
রেফারেন্স
(১) Talbot, I. (2012). Pakistan: A Modern History (First Edition). Hurst & Co., Page-193.
(২) Click This Link
(৩) Click This Link
(৪) Click This Link
(৫) Click This Link
১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া খানের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানে কিভাবে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলো?
ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের নির্বাচনে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন মনে করেননি। কারণ, ওনার ধারণা ছিল যে, পাকিস্তান মুসলিম লীগ, এবং জামাত-ই-ইসলাম-এর সামনে মুজিবকে বেশ শক্ত প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে।
নির্বাচনের আগে ইয়াহিয়া খান-এর হাতে যে গোয়েন্দা তথ্য ছিল তা অনুযায়ী মুজিবউর রহমান-এর জেতার সম্ভাবনা ছিল অত্যধিক বেশি। কিন্তু, ইয়াহিয়া খান এই সকল গোয়েন্দা তথ্য উপেক্ষা করেছিলেন, এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর নিজের মূল্যায়ন ছিল যে, পূর্ব পাকিস্তানে মুজিবের পক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সম্ভব হবে না।
বাস্তবে যেটা হয়েছিল তা হচ্ছেঃ
(১) মোহাম্মদ আলী বগুড়া এর প্রবর্তিত "ওয়ান-ইউনিট" ব্যাবস্থা আইয়ুব খান কর্তৃক বিলুপ্ত হবার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে সীট বন্টনের দিক দিয়ে আওয়ামী লীগ সব সময়েই সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। যেটা করা উচিত ছিল, তা হচ্ছে, পূর্ব পাকিস্তানকে ভেঙ্গে একাধিক প্রদেশ বানানো। সম্ভবতঃ, তা করা হয়নি কারণ, মিলিটারী শাসকরা এই বিষয়টি অনুধাবন করতে ব্যার্থ হয়েছিল। অথবা, আইয়ুব খান মনে করেছিলেন যে পূর্ব পাকিস্তানে উন্নয়ন কর্মকান্ডের বরাদ্দ বাড়ালে তাদের মাথা ঠাণ্ডা হবে। অথবা, পূর্ব পাকিস্তান ভেঙ্গে আলাদা প্রদেশ বানাতে গেলে তিনি তাঁর ক্ষমতা হারাবেন। তাঁর বোঝা উচিত ছিল যে তিনি লড়ছিলেন ভারত এবং আওয়ামী লীগের যৌথ কূট বুদ্ধির বিরুদ্ধে।
(২) মাওলানা ভাসানীর ন্যশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) এবং অন্যান্য বামপন্থীরা নির্বাচন বয়কট করেছিল। ফলে তাদের ভোট গুলো যেয়ে পড়ে আওয়ামী লীগের ঝুলিতে।
(৩) নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দল গুলো প্রচারনা চালানোর জন্য প্রায় এক বছর সময় পেয়েছিল; ফলে মুজিব তার বক্তৃতা দেবার স্বভাবমুলভ দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে পাবলিকের ব্রেন ওয়াশ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পেয়েছিলেন।
(৪) ভোলা সাইক্লোন-এর ত্রাণ কার্যক্রমের ধীর গতি মুজিবের জন্য শাপে বর হয়ে দেখা দিয়েছিল। আওয়ামী লীগ এটাকে প্রোপাগান্ডা হিসাবে কাজে লাগায়। আসলে, ভোলা সাইক্লোনের ত্রানের ধীর গতির জন্য পাকিস্তান সরকার মোটেও দায়ী ছিল না। দায়ী ছিল ভোলা সাইক্লোনের ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপক আকার। বাঙ্গালিদের দ্বারা ত্রাণ সামগ্রীর ব্যাপক লুটপাট।
(৫) জামাত এবং মুসলিম লীগ ইলেকশনে সম্পূর্ন পর্যুদস্ত হয়, যেটা ইয়াহিয়া খানের মিলিটারি মগজ আগে থেকে অনুমান করতে পারেনি।
.
তার মানে কি নির্বাচন সুষ্ঠ হয়েছিলো?
মোটেও না।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে —
(১) পূর্ব পাকিস্তানের ইলেকশনের সকল কর্মকর্তা ছিল আওয়ামী লীগের বাছা বাছা লোক।
(২) সকল ভোট কেন্দ্র আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। লীগের সাপোর্টার ছাড়া কাউকে ভোট কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হয়নি। যারা আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করে ভোট কেন্দ্রে ঢোকার চেষ্টা করেছিল তাদেরকে মারধোর করা, গুলি করা, বা ছোরা মারা হয়েছিল।
(৩) মুজিবকে এরকম বলতে শোনা গিয়েছিল যেঃ "আমরা ইচ্ছা করলে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২ আসনের সবগুলোই দখল করতে পারতাম, কিন্তু করিনি।"
.
প্রশ্ন হতে পারে যে, ইয়াহিয়া এরকম হতে দিলেন কেন?
এর উত্তর হচ্ছে -
(১) মিলিটারী বুদ্ধি সব সময় সিভিলিয়ান বুদ্ধির অর্ধেক হয়। সেখানে তিনি লড়ছিলেন আওয়ামী লীগ এবং ভারতের যৌথ কূট বুদ্ধির বিরুদ্ধে।
(২) নির্বাচনের আগে গোয়েন্দারা ইয়াহিয়া খানকে মুজিবের জয়ের ব্যাপারে সতর্ক করলেও তিনি তা পাত্তা দেননি।
(৩) ইয়াহিয়া ইলেকশনকে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দিতে চাননি। অর্থাৎ, তিনি একটি প্রকৃত ফেয়ার ইলেকশন চেয়েছিলেন।
(৪) পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ বাদে অন্যান্য যে দলগুলো ছিল সেগুলোর উপরে তাঁর আস্থা বাস্তব অবস্থার চেয়ে বেশি ছিল। সম্ভবতঃ ইয়াহিয়া খানের সামনে ঐ দল গুলো নিজেদের শক্তিমত্তা ফুলিয়ে ফাপিয়ে প্রদর্শন করেছিল।
.
কিন্তু একটা সুষ্ঠ নির্বাচন দিয়েও পরবর্তীকালে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করা হলো কেন?
কারণ, নির্বাচনে জেতার পরে ১৯৭১ সালের ৩-রা জানুয়ারী রমনার রেসকোর্সের ময়দানে ভোটে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের ন্যাশনাল এবং প্রভিন্সিয়াল এম,পি,-রা মুজিবের নেতৃত্বে শপথ নেয় যে তারা দেশ ভাগ করা ছাড়া অন্য কিছুই মেনে নেবে না।
এই খবর ইয়াহিয়ার কাছে পৌছার পরে তিনি ১২ই জানুয়ারী পূর্ব পাকিস্তান সফর করে মুজিবের সাথে দেখা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন। ভুট্টো মুজিবের সাথে ছয়-দফা নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেন।
মুজিব এসব প্রত্যাখ্যান করেন। অর্থাৎ, মুজিব এবং আওয়ামী লীগ তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। অধিকন্তু, এসবের মধ্যেই মুজিব ৭ই মার্চ-এর ভাষণ দিয়ে বসেন।
ফলে, ভুট্টোর সাথে আলাপ করে ইয়াহিয়া সিদ্ধান্ত নেন যে মুজিবের হাতে ক্ষমতা দেয়া হবে না।
.
বিঃদ্রঃ এক হাতে কখনও তালি বাজে না। একটি দেশ যখন ভাঙ্গে তখন বুঝতে হবে যে উভয় পক্ষেরই অপরাধ ৫০-৫০।
.
রেফারেন্স
(১) Talbot, I. (2012). Pakistan: A Modern History (First Edition). Hurst & Co., Page-193.
(২) Click This Link
(৩) Click This Link
(৪) Click This Link
(৫) Click This Link

সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০২১ বিকাল ৪:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



