
সাধারণ মানুষকে আমরা তার ব্যক্তি চরিত্র দিয়ে বিচার করি, কিন্তু একজন ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রপ্রধান বা রাজনীতিবিদকে ব্যক্তিজীবন দিয়ে নয়, বরং তার কর্ম, নীতি, আদর্শ ও সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এটা সত্য যে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিজীবনের ছাপ তাদের কর্ম, নীতি ও আদর্শে প্রতিফলিত হয়। রাজনীতিবিদকে যদি আমরা ব্যক্তি মানুষ হিসেবে দেখি, তাহলে দোষে-গুণে মানুষ হিসেবে তাদের প্রতি আমরা সহজেই সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ব। তাদের কাজগুলো তখন চোখের আড়ালে চলে যাবার সম্ভাবনা থাকে। যেটা প্রয়োজন, তা হলো কর্তৃত্ব ও ক্ষমতাকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করা। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার মাধ্যমেই তাদের সঠিক পথে রাখা সম্ভব হয়। তাদের ভক্ত হওয়ার মধ্যে নয়।
গতকাল খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে কয়েক লক্ষ মানুষ সমবেত হয়েছিলেন। ঘটনাটি বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান এবং নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যেতে পারে। মানুষ আদিকাল থেকেই দলবদ্ধভাবে শোক প্রকাশ করে এসেছে। মানুষের মনের গভীরে থাকা এটা একটি সামাজিক প্রতিক্রিয়া। সমাজবদ্ধ মানুষ হিসেবে আমরা গোষ্ঠীসংহতি ও মৃত্যুকে অর্থ দেওয়ার চেষ্টা করি। খুব আনন্দের মুহূর্তে যেমন আমরা একসাথে বসে খাওয়া-দাওয়া করি, শোকে ও দুঃখেও তাই করি। আমাদের আদি পিতামাতা শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানকে সামাজিক জীবনের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাই এটা আমাদের সামষ্টিক স্মৃতি ও মস্তিষ্কে এভাবেই কাজ করে। ব্যক্তিগত শোককে সমষ্টিগত করে তোলার মাধ্যমে গোষ্ঠীর ভেতরের বন্ধন দৃঢ় হয়, যা প্রাগৈতিহাসিক মানবগোষ্ঠীর টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে, এরকম বড় জানাজা এবং শোকসমাবেশ অনেকগুলো সামাজিক কাজ সম্পন্ন করে। এটি সমষ্টিগত পরিচয়কে নিশ্চিত করে। খালেদা জিয়া কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি রাজনৈতিক যুগ, সংগ্রাম ও পরিচয়ের প্রতীক। এত মানুষের একত্র হওয়া মানে একজন নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো শুধু নয়, একটি যৌথ ইতিহাসকে দৃশ্যমান করে তোলা। এই দৃশ্যমান ইতিহাসের ভিতরের কথাটা হলো খালেদা জিয়ার প্রতি যে অন্যায়, অসম্মান এবং জুলুমগুলো করা হয়েছে, সেগুলো মনে করে নিজেদের কাজের পর্যালোচনা করা।
প্রাচীন সমাজগুলোতেও শেষকৃত্যের আচার ছিল জীবিতদের নিজেদের সামাজিক অবস্থান ও পরিচয় মনে করিয়ে দেওয়ার একটি উপায়। এই ধরনের সমাবেশ শোককে স্মরণে রূপান্তরিত করে। ইতিহাসজুড়ে দেখা যায়, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মৃত্যু জাতীয় বা সামষ্টিক আত্মসমালোচনা ও ভাবনার মুহূর্ত তৈরি করে।
আবার, বৃহৎ শোকানুষ্ঠান সমাজের জন্য এক ধরনের প্রতীকী নিরাময়। মানুষ যেমন একসময় শিকার বা খাদ্য ভাগাভাগি করে টিকে ছিল, তেমনি শোক ও ক্ষতিও ভাগ করে নেওয়ার সামাজিক প্রক্রিয়া গড়ে তুলেছিল। নেতৃত্ব ও পরিচয়ের প্রতীক কোনো মানুষের মৃত্যু সমাজে শূন্যতা তৈরি করে। সম্মিলিত শোক সেই শূন্যতাকে অর্থ দেয় এবং সমাজকে আশ্বস্ত করে যে ক্ষতির পরও গোষ্ঠী বন্ধন অটুট রয়েছে।
খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের এই বিপুল উপস্থিতি দেখায়, হাজার বছর আগে মানুষ জীবন ও মৃত্যুকে ঘিরে একটি সামাজিক আচার গড়ে তুলেছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল মানুষ হিসেবে একসাথে থাকার বোধ, যৌথ জীবনের শক্তির অনুভুতি এবং মৃত্যুকে অর্থ দেওয়া। এই জনসমুদ্র প্রাচীন মানবিক প্রবৃত্তিরই আধুনিক প্রকাশ।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



