somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার প্রথম বিদেশ ভ্রমন-ভারত(পর্ব-২)

২১ শে এপ্রিল, ২০১৭ রাত ১০:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভিসা ত হয়েই গেল, এবার সেই বহুল প্রতীক্ষিত সময়ের বেলা।আমার খুব বরফ দেখার ইচ্ছে। তাই ভাবলাম এবার বরফ দেখবই। আর সময়টাও উপর্যুক্ত। হিমাচল প্রদেশে গেলেই বরফ পাব। তাই আমার ভ্রমণ পরিকল্পনা হচ্ছে কলকাতা - দিল্লি - মানালি - দিল্লি - কলকাতা। তো দিনক্ষন চূড়ান্ত করা হলো। জানুয়ারির ১৯ তারিখ রাতে আমি ও আমার দাদা বেনাপোলের উদ্দেশ্যে রওনা হব বলে ঠিক করলাম। কিন্তু হায়! এইটাতো শীতকাল। রাতে ত ফেরি ঘাট কুয়াশার জন্য অনেক ঘন্টা আটকা থাকতে পারে। ফেবুতে ট্রাভেলার্স অফ বাংলাদেশ গ্রুপএ এই সম্পর্কে জানার জন্য পোষ্ট দিলাম যে এর মধ্যে যাওয়ার উপায় কি, অনেক মন্তব্য পেয়েছিলাম। শেষে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম শেষ বিকালের গাড়িতে উঠব যাতে রাত ১১/১২ টার মধ্যে আরিচা থাকতে পারি। কারণ ফেরি মধ্যরাতে বন্ধ হয়। তো যেই ভাবা সেই কাজ। টিকেট কাটলাম সাতক্ষীরা এক্সপ্রেস বিকাল ৭ টার সাভার থেকে।

অবশেষে সেই ১৯ তারিখ আসলো। ব্যাগ ঠ্যাগ সব রেডি। ৬.৩০ এ উপরের উনারকে স্মরণ করে বেড়িয়ে পরলাম আমি আর আমার দাদা। ৭ টায় যেয়ে শুনি তখন বাস কেবল গাবতলী থেকে রওনা হয়েছে। আমরা বসে রইলাম। ৭.৩০ এ বাস সাভারে আসলে আমরা উঠে পরলাম। বাসটা ভালই ছিল। পুরোপুরি উত্তেজনা নিয়ে চুড়ান্তভাবে রওনা হলাম বেনাপোলের উদ্দেশ্যে। উত্তেজনার চোটে সাথে সাথেই পাসপোর্ট হাতে ছবি তুলে ফেবু তে আপ করলাম আর কেপশন হলো "প্রথম বিদেশ ভ্রমণ"। আমি আর দাদা গল্প করতে করতে যাচ্ছি। দাদা এর আগে একবার গিয়েছিল তাই তার আগের অভিজ্ঞতার গল্প শুনাচ্ছিল।

গল্প করতে করতে কখন যে ফেরিঘাটে চলে আসলাম টেরই পেলাম না। কিন্তু এ কি! ভেবেছিলাম কত্ বড় লাইনেই না দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। কিন্তু বাস ত কোনভাবেই না থেমে সোজা ফেরিতে। যাক! কি সৌভাগ্য আমাদের। শীতের রাতে পদ্মা নদীতে যেমন ঠান্ডা থাকার কথা তেমন ঠান্ডা নাই। বেশ তাড়াতাড়িই পৌছে গেলাম ওপারে। এবার বাস মহাবেগে ছুটে চলেছে গন্তব্যের দিকে। আর আমরা ঘুমের রাজ্যে চলে গেলাম।

ঘুম থেকে উঠেই দেখি আমরা যশোর শহর পার করছি। রাত তখন ১ টা। গুগল ম্যাপ বের করে দেখলাম বেনাপোল বেশি দূরে না। আমি দাদাকে বললাম দাদা রাত তো কেবল ১ টা, পৌছাতে আর বেশিক্ষন লাগবে না। তবে এখন ? দাদাও চুপ, আমিও চুপ। কিছুক্ষন দাদা বললো- হয়তবা এই ঘুমন্ত রাতে ওই জায়গা জেগে থাকবে। বর্ডার এরিয়া তো তাই।

তো কিছুক্ষন পর আমাদেরকে নাভারন-সাতক্ষীরা মোড়ে নামিয়ে দিল। কারন গাড়ি সাতক্ষীরা যাবে। আমরা নেমে একটু দাঁড়িয়ে অবস্থার পর্যবেক্ষণ করতে থাকলাম। সাথে কয়েকজন আছে তবে তারা আমাদের মত ভারতে উদ্দেশ্যের যাত্রী না। লোকাল মানুষ, ঢাকায় গিয়েছিল আর কি। একটা টেম্পু আসলো। আমরা আর ওই লোকগুলা উঠে পরলাম। টেম্পু বেনাপোলেই যাবে। মনে হয় এটাই তার শেষ ট্রিপ ছিল। আমরা বেশ ভয়েই ছিলাম। কাউকেই চিনি না। জায়গাও চিনি না। আবার শীতে বরফ হয়ে গিয়েছি। রাস্তায় সাদা কুয়াশা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। টেম্পু ত ওই হাড় কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যেও জোরে চালিয়ে ঠান্ডা বাতাসে আরো ঠান্ডার তীব্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। দাদা মাঝে মাঝে ড্রাইভারটার সাথে এ কথা ও কথা বলে উনার ভাব বুঝে নিচ্ছে। ভয়ে ত জান শুকনা হয়ে যাইতেছিল। যদি আমাদের কিডন্যাপ করে নিয়ে যায়। আস্তে আস্তে টেম্পুর সবাই নিজ নিজ জায়গায় নেমে পরল। ভয় ত আরো বেড়ে গেল। কিছুক্ষন পর বেনাপোল বর্ডারে চলে আসলাম। ড্রাইভারটা আমাদের বলল, রাতে থাকার জন্য জায়গা লাগবে কিনা। আমরা বললাম আমাদের লোক আছে সে আসবে আমাদের নিতে। কিন্তু আসলে ও্ইখানে আমাদের কেউ ছিল না আর আমরা কাউকে চিনিও না। লোকটা আবার বলল। আমরা আবার না করলাম। লোকটা আসলে বুঝেই গেসিলো।

পরে টেম্পু ছেড়ে আমরা একটু এদিক ওদিক করে দেখলাম কেউ নাই। শুধু একজন মহিলা জোরে জোরে আওয়াজ করে ঝারু দিচ্ছিল। আমরাতো পুরাই শকড। ভাবলাম এত বড় একটা বর্ডার, কোথায় মানুষজন থাকবে তা না বরং একটা বর্ডার গার্ডকেও দেখলাম না। কি ভয়ঙ্কর একটা ব্যাপার। এখন যদি কোনো ছিনতাইকারি এসে আমাদের সব নিয়ে যায়!! এত ডলার, দামি মোবাইল। ছিমছিম একটা জায়গা। পরে আমরা আমাদের ব্যাগ দুইটা এক দোকানের অন্ধকার জায়গায় লুকায় রেখে এমন ভাবে একটা বেঞ্চে বসলাম যাতে কেও তাকিয়েই আমাদের দেখে ভাবে যে আমরা হয় গার্ড না হয় লোকাল কেও। মাথায় সোয়েটারের টুপি দিয়ে ঢেকে একদম সেইভাবেই বসে রইলাম। প্রচন্ড ঠান্ডা। এর মধ্যেই আমরা ওই খোলা জায়গায় বসে রইলাম। মাঝে মাঝে একটা গার্ড আসছিল কিন্তু আমাদের পাত্তা দিচ্ছিল না।

বসে বসে ওই মহিলার ঝারু দাওয়ার আওয়াজ শুনছিলাম। কি জোরে জোরে ঝারু দিচ্ছে। আর কোনো বিরাম নেই। সেই কখন থেকে রাস্তাটা ঝারু দিয়েই যাচ্ছে। মাথাটাও উঁচু করছে না। আমরা জলজ্যান্ত মানুষ দুইটা যে বসে আছি তার দিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নাই। আমি বসে বসে ভাবলাম এ ত আবার ওই ভুতের বইটার মত ভুত নয় ত। আমাদের হঠাত ভয় দেওয়ার জন্য অভিনয় করে যাচ্ছে। কারন এই যুগে এত রাতে এভাবে এত মন দিয়ে কেউ কাজ করে নাকি। কিন্তু আমার সেই ভুল ধারণা কিছুক্ষনের মধ্যেই ভেঙ্গে গেল। সে আমাদের কাছে আসতেই আমরা বলি যে সে প্রতিরাতেই এভাবে কাজ করে নাকি। সে অনেক নম্রতার সহিত বলল প্রতিরাতেই সে কয়েক টাকার বিনিময়ে এই কাজ করে। তার ছেলেকে পড়াশুনা করানোর জন্য। এত কম টাকা পায় !! সে কাজ করতে করতেই অন্যদিকে চলে গেল।

সময় যেন কাটে না। ২টা পার হয়, ৩টা পার হয় কিন্তু কার কোনো দেখা নাই। মনে হচ্ছে পুরা জগতে আমি আর আমার দাদাই। আর কেউ নাই। এমনি সময় ঘড়ির কাটা ভালোই দৌড়াইতে পারে। আজকে কি ও এনার্জি ড্রিংকস খায় নায় না কি! কিছক্ষন পর পর এক একটা বড় বড় বাস আসে কিন্তু বাস গুলা আবার ঘুরেই চলে যায়।

অবশেষে রাত ৩.৩০ থেকে ৩.৪৫ এর দিক একটা মানুষভর্তি গাড়ি আসে। দেখলাম অনেক মানুষ গাড়ি থেকে নামছে। আমরাও গেলাম তাদের দিকে। যাক। তখন যে কি শান্তি লাগছিল যা বলার মত না। কিন্তু একি! এই মধ্যরাতেও গলা চেঁচিয়ে ঝগড়া! হায়রে বাঙালি। পুরা এলাকাটাই ঝগড়াটে গলায় মাতিয়ে তুল্লো। কাহিনী হচ্ছে ওই বাসটা নাকি প্রাইভেট কারটাকে অভারটেকিং করে পুরো উপরেই পাঠিয়ে দিচ্ছিল। প্রাইভেট কারের মালিক আর ড্রাইভার বাসের ড্রাইভারকে ত মেরেই ফেলবে মনে হচ্ছিল। আর এমন ভাব মনে হয় যেন সে দেশের সব থেকে সম্মানের কেউ। বোঝাই যাচ্ছিল ব্যাটা কিছু খেয়েই রাস্তায় নেমেছে। গন্ধও আসছিল। ব্যাটা প্রাইভেট কার নিয়ে এমন ভাবে বাসটার দিক তেড়ে আসছিল মনে হয়েছিল যেন রেস লাগসে। বাস বনাম প্রাইভেট কার।

যাই হোক, পরে আমরা ওই বাসের যাত্রী গুলার সাথে ভিতরে কাউন্টারে ঢুকে গেলাম। বাহ! অনেকটা গরম। আর বাইরে প্রচুর ঠান্ডা। আমরা অন্য সবার মত চুপচাপ বসে আছি। মনে হচ্ছে এখানে নিরাবতা পালন চলছে। সবাই বরিশাল থেকে এসেছে। সব হিন্দু। পাশে জোরে করে একজন হিন্দুদের গান বাজিয়ে রেখেছে। সবাই বিরক্ত। বারণও করল। কিন্তু কে শুনে কার কথা। আমি বসেই একটু ঘুমিয়ে নিলাম। রাতটা আসলেই অনেক বড় লাগছিল।

আস্তে আস্তে অনেকে আসলো। কিন্তু সূর্যের আলোর কোনো দেখা নাই। মোবাইলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ৫.৩০ বাজে। মনে প্রশান্তি ফিরে এসেছে। কিছুক্ষন পরেই বর্ডার খুলবে। চা খেয়ে শরীরটাকে একটু চাঙ্গা করে নিয়ে গেলাম বর্ডারের গেটের সামনে। মনে হচ্ছে খুললেই দৌড় দিব।

সর্বশেষ এডিট : ২২ শে এপ্রিল, ২০১৭ দুপুর ১২:১৬
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"নিজেদের কেলেঙ্কারিই যখন নিরাপদ নয়, প্রধানমন্ত্রী কতটা নিরাপদ"

লিখেছেন রিয়াজ হান্নান, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:২৭


মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রিয় তারেক রহমান রাহিমাহুল্লাহ,আপনাকে সবার আগে বাংলাদেশের জন্য ভালোবাসি। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি আপনার আশেপাশের লোকেরা কেলেংকারির সাথে জড়িত,এরা আবার ইলিয়াসের আগেই নিজেকে নিজে এক্সপোজ করে দেয়।

এরা নিজেরাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আধিপত্যবাদী নীতি

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:৫২

নেপাল সেনাবাহিনীর সম্মানসূচক জেনারেল পদমর্যাদা সম্প্রতি ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরাজ শেঠকে দেওয়াকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশের কিছু সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি করেছে ।
গত ১৭ আগস্ট নেপালের রাজধানী... ...বাকিটুকু পড়ুন

গোলাপী এখন বাসে ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:২০


দেশে আজ থেকে পিংক বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। ঢাকা সহ আরও তিনটি বড় শহরে এই বাস চলবে। খবরটা শুনে মনে হলো, দেশ যেন হঠাৎ করেই এক ধাপ আধুনিক হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

"বহু দিন পর বন্ধু"

লিখেছেন সনজিত, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৮


বহু বছর পর হঠাৎ তোর সঙ্গে দেখা।
প্রথমে চিনতেই পারিনি।
তারপর একচিলতে হাসি-
মনে হলো,
সময় আমাদের চেহারা বদলেছে,
কিন্তু শৈশবের মুখটা এখনো একই রয়ে গেছে।

চোখের কোণে ক্লান্তির রেখা,
চুল অর্ধেকটা সাদা রং,
কাঁধে সংসার,... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিচারিতার এক অদ্ভুত মহাকাব্য

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:২৩



দ্বিচারিতার এক অদ্ভুত মহাকাব্য

যতদিন যাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছ -এই দেশের তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশকে নিয়ে আশাবাদী হওয়াটা রীতিমতো বিলাসিতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সেদিন দেখলাম, এক ছাত্রশিবির নেতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×