নতুনপুকুরের দক্ষিণ পাড়ে শান বাঁধানো ঘাট, দু'পাশে বসার জায়গা। আগে বিশিষ্টজনেরা ঘাটে বসতেন বিকেলে, আমরা শিশুকালে এই ঘাটে কুমির-কুমির খেলতাম। চড়কের সময় চৈত্রের শেষদিনে জল কমে যাওয়া নতুন পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম কিনারে আগের দিন সন্ধ্যায় দরিদ্র কার্তিকের প্রোফাইলধারী মৎস্যজীবী রেজো মণ্ডল মাটি দিয়ে একটা কুমির গড়তেন। কুমিরের পিঠ তৈরি হতো পাকা খেজুর গেঁথে গেঁথে। পরদিন সে কুমির পুজো শেষে চড়কের উৎসব শুরু হতো। পরে ত্রিকোণ মন্দিরের মাঠে চড়কের ঝাঁপ। সকল নারী-পুরুষ জড়ো হতো সেখানে। গান, আনন্দ, মিছিল আর প্রায় তিনতলা উপর থেকে নিচে দড়ির জালে রাখা ধারালো ছুরির উপর ঝাঁপ দেয়া, আমরা দেশিভাষায় বলতাম পাটাস ভাঙা। আশ্চর্য এই, সারাবছর সমাজের অগোচরে বাস করেও বছরের একদিন এই অচ্ছুত রেজো মণ্ডলই প্রধান সামাজিক উৎসবের প্রধান ব্যক্তি। ছয়ফুট সুদর্শন হাসিমুখো প্রান্তিকজন রেজো মণ্ডল হয়ত সেদিন বলতে চাইতেন দেখো হে সমাজ, আমিই আজ শিব-আমিই প্রধান। তাঁর সারা বছরের অধঃস্তনতার দৈন্য মুছে গ্রামবাসিকে জানান দিতেন, আজ তিনি একদিনের মাণ্ডলিক। অন্য সমাজঅন্তজ কালি কাহার, গ্রামের সকলের কালিদা ঢাক বাজাতেন মগ্নতায়। লাল সালুর চাদরে ঢাকা ঢাকের প্রতিটি স্ট্রোক নেচে নেচে জানান দিতো সমাজ উৎসবের ছন্দ ও আনন্দ তাদেরই চিন্তা ও শরীরে। আগের বছরের শেষদিন ও নতুন বছরের প্রথম দিনে সে উৎসবে আমাদের যাবতীয় গ্রামীণ লোকজীবনের স্বপ্নকর্মআকাঙ্ক্ষা সংগীত বেজে উঠতো পরম মমতায়, উচ্চ-নিচ, বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে।
সে উৎসবস্থলের উপরেই বাস করতো কুল্লোপাখি, শিশুকালের ভয়-কল্পনা-আনন্দ-মমতা মিশানো পাখি। যেনো ডালে বসে বসে গ্রামের স্তরভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন ও উৎসব নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ করছে।
উৎসব শেষে রাতে যখন রেজো মণ্ডল একা একা সরুপথ বেয়ে কষ্টের পরিবারে ফিরতেন, তখন দক্ষিণবিলে হয়ত জ্যোৎস্নার বন্যা। সে আনন্দআলোয় ভিজতে ভিজতে হয়ত কাপড় উঁচু করে কুমিরহীন হানরের খাল পার হতেন দুঃখের বারান্দায় বসার জন্য। ঠিক তখনই প্রকৃতি, মানুষ ও কবিতার সম্পর্কের একটি সিকোয়েন্স বাঁধা পড়তো নিশীথবিহারী পাখির জ্যোৎস্নামাতাল চোখে।
এখন বুঝি হয়ত কুমির ছিলো আমাদের গ্রামের কৌম সমাজের প্রাণপ্রতীক।
আজ ঈশ্বরীপুর গ্রামে জটাবুড়ির মতো আমাদের বয়োবৃদ্ধ অশ্বত্থ গাছটি থাকলেও সে পাখি আর নেই। উৎসবেরও আর সে প্রাণ নেই। অনেক কিছুর মতো হারিয়ে গেছে। শুধু স্বপ্ন-চিন্তা-কল্পনায় রয়ে গেছে তার ডাক। ভাগ্য ভালো নতুন পুকুর ও অশ্বত্থ গাছটি এখনো ঈশ্বরীপুর গ্রামের প্রাণ। সেগুলিও হয়ত আগামীতে কল্পকথা হবে। বর্তমানকে বয়ে নিয়ে যাবে অন্য উৎসব।
বাংলার প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক গল্প-কথায় এমন অনেক পাখি অনেক গ্রামে স্বপ্ন যোগাতো, সে কল্পনার ফুলপাখি সমাজকে পথ দেখাতো।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ সকাল ১০:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


