somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বপ্নপাখির মঞ্চবাস্তবতা: (প্রথম কিস্তি) ভয়-কল্পনা-আনন্দ-মমতা মিশানো পাখি

২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ সকাল ১০:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের গ্রামের বাড়ির সামনে একশো বছরের নতুনপুকুর। তার ওপারে পরিবারের এক প্রাচীনার লাগানো ইটের মঞ্চে দ্বিশতবর্ষী অশ্বত্থ গাছ। সে গাছের উত্তরডালে পত্রপল্লবফাঁকে বাসা ছিলো চিলবংশের লম্বা পাখার লাল-কালো রঙ মিশানো এক ধরনের পাখির। দেশি ভাষায় আমরা বলতাম কুল্লো। অন্য নাম আছে কী না ইনাম-আল হক বলতে পারবেন। সে রঙিন পাখির অলৌকিক ডাক শিশুকালে সন্ধ্যাবেলা আমাদের হৈ চৈ থামিয়ে দিয়ে শিশুভদ্রলোক বানিয়ে ছাড়তো।

নতুনপুকুরের দক্ষিণ পাড়ে শান বাঁধানো ঘাট, দু'পাশে বসার জায়গা। আগে বিশিষ্টজনেরা ঘাটে বসতেন বিকেলে, আমরা শিশুকালে এই ঘাটে কুমির-কুমির খেলতাম। চড়কের সময় চৈত্রের শেষদিনে জল কমে যাওয়া নতুন পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম কিনারে আগের দিন সন্ধ্যায় দরিদ্র কার্তিকের প্রোফাইলধারী মৎস্যজীবী রেজো মণ্ডল মাটি দিয়ে একটা কুমির গড়তেন। কুমিরের পিঠ তৈরি হতো পাকা খেজুর গেঁথে গেঁথে। পরদিন সে কুমির পুজো শেষে চড়কের উৎসব শুরু হতো। পরে ত্রিকোণ মন্দিরের মাঠে চড়কের ঝাঁপ। সকল নারী-পুরুষ জড়ো হতো সেখানে। গান, আনন্দ, মিছিল আর প্রায় তিনতলা উপর থেকে নিচে দড়ির জালে রাখা ধারালো ছুরির উপর ঝাঁপ দেয়া, আমরা দেশিভাষায় বলতাম পাটাস ভাঙা। আশ্চর্য এই, সারাবছর সমাজের অগোচরে বাস করেও বছরের একদিন এই অচ্ছুত রেজো মণ্ডলই প্রধান সামাজিক উৎসবের প্রধান ব্যক্তি। ছয়ফুট সুদর্শন হাসিমুখো প্রান্তিকজন রেজো মণ্ডল হয়ত সেদিন বলতে চাইতেন দেখো হে সমাজ, আমিই আজ শিব-আমিই প্রধান। তাঁর সারা বছরের অধঃস্তনতার দৈন্য মুছে গ্রামবাসিকে জানান দিতেন, আজ তিনি একদিনের মাণ্ডলিক। অন্য সমাজঅন্তজ কালি কাহার, গ্রামের সকলের কালিদা ঢাক বাজাতেন মগ্নতায়। লাল সালুর চাদরে ঢাকা ঢাকের প্রতিটি স্ট্রোক নেচে নেচে জানান দিতো সমাজ উৎসবের ছন্দ ও আনন্দ তাদেরই চিন্তা ও শরীরে। আগের বছরের শেষদিন ও নতুন বছরের প্রথম দিনে সে উৎসবে আমাদের যাবতীয় গ্রামীণ লোকজীবনের স্বপ্নকর্মআকাঙ্ক্ষা সংগীত বেজে উঠতো পরম মমতায়, উচ্চ-নিচ, বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে।

সে উৎসবস্থলের উপরেই বাস করতো কুল্লোপাখি, শিশুকালের ভয়-কল্পনা-আনন্দ-মমতা মিশানো পাখি। যেনো ডালে বসে বসে গ্রামের স্তরভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন ও উৎসব নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ করছে।
উৎসব শেষে রাতে যখন রেজো মণ্ডল একা একা সরুপথ বেয়ে কষ্টের পরিবারে ফিরতেন, তখন দক্ষিণবিলে হয়ত জ্যোৎস্নার বন্যা। সে আনন্দআলোয় ভিজতে ভিজতে হয়ত কাপড় উঁচু করে কুমিরহীন হানরের খাল পার হতেন দুঃখের বারান্দায় বসার জন্য। ঠিক তখনই প্রকৃতি, মানুষ ও কবিতার সম্পর্কের একটি সিকোয়েন্স বাঁধা পড়তো নিশীথবিহারী পাখির জ্যোৎস্নামাতাল চোখে।

এখন বুঝি হয়ত কুমির ছিলো আমাদের গ্রামের কৌম সমাজের প্রাণপ্রতীক।

আজ ঈশ্বরীপুর গ্রামে জটাবুড়ির মতো আমাদের বয়োবৃদ্ধ অশ্বত্থ গাছটি থাকলেও সে পাখি আর নেই। উৎসবেরও আর সে প্রাণ নেই। অনেক কিছুর মতো হারিয়ে গেছে। শুধু স্বপ্ন-চিন্তা-কল্পনায় রয়ে গেছে তার ডাক। ভাগ্য ভালো নতুন পুকুর ও অশ্বত্থ গাছটি এখনো ঈশ্বরীপুর গ্রামের প্রাণ। সেগুলিও হয়ত আগামীতে কল্পকথা হবে। বর্তমানকে বয়ে নিয়ে যাবে অন্য উৎসব।

বাংলার প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক গল্প-কথায় এমন অনেক পাখি অনেক গ্রামে স্বপ্ন যোগাতো, সে কল্পনার ফুলপাখি সমাজকে পথ দেখাতো।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ সকাল ১০:৫০
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×