অহরকণ্ডল অলৌকিক পাখির অভিধায় নির্জলা সমাজসংগীত। কখনো ছড়া, কখনো গান, কখনো স্তব। অন্যদিকে কখনো গল্প, কখনো কবিতা, কখনো নাটক। কেউ কেউ বলতে পারেন কখনো স্বপ্ন, কখনো জীবন। এর সৌন্দর্য একান্ত নির্মম। নিঃসঙ্গ অবস্থায় ঝমঝম বৃষ্টি উপভোগের মতো লাগে, তবে তা একই সঙ্গে অনেকের অন্তর্লোককে নাচায় বলে আমার বিলক্ষণ বিশ্বাস জন্মেছে। মনে হয়েছে তিনটি চরিত্র অনেক সহস্র প্রাকৃতিক বস্তু, অবস্তু, মানুষ, প্রাণীকে চুষ্মান এমনকি নিরাকারকে শব্দবন্ধে সাকার করে তুলেছে। অথবা এমনও হতে পারে যে এই রচনাটি অলৌকিক চরিত্রের লোকচিন্তা মহাভারত।
বয়ান অথবা রচনাটি শুরু হয়েছে মানুষের শক্তি ও মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে। এটি উল্লেখ্য ও গতিশীল করে তাবৎ চিন্তাশীল করিৎকর্মাকে। তারা মানুষ। প্রকৃতির শক্তিকে মেনে ও অস্বীকার করে, প্রকৃতিকে বশ করে, প্রকৃতিকে দুধ-কলার মতো মিশিয়ে, তার কোলে চড়ে, গলা জড়িয়ে-ভালোবেসে, তার উপর রাগ করে যে মানুষ পৃথিবীতে চলাচল করে তাকে ও তার মননচর্চাকে এ রচনা আকাশচুম্বী করেছে। এটি রচনার একটি বিশেষণ।
এমন সময় ছিলো এ মানুষ জন্মের আগে, প্রকৃতিতে যখন কিছুই ছিলো না। শুধু 'নিরাকার তাহায় করেন বিহার'। শুরুর এ শব্দবন্ধটি অনায়াস, কিন্তু অসাধারণ এক পূর্বরূপচ্ছবি তুলে ধরে মনুষ্যচিন্তাস্রোতে ধাক্কা দেয়। নিমেষে সে স্রোত দর্শনপালে বাতাস যোগায় ও দ্রুতগতিতে অতীতের ওপারকে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তোলে। দরজাটা খুলে যেতেই, এরপর, প্রকৃতি জন্মের পর এ প্রাণরূপ 'নিরঞ্জনের অধিক কৌমের পুত্র' মর্যাদা নিয়ে প্রকৃতি-জীবন ও পাপ-পুণ্যকে একাকার করে ফেলে। এবং আশ্চর্য সত্য এই যে, আলমগীর চিরায়ত কথকতাকে উপস্থাপন করতে গিয়ে বলছেন, 'এ দৃশ্যকাব্য অহরকণ্ডল দিবস ও রাত্রিভর থাকে ও হারায়'। প্রাণ ও প্রকৃতির চলমানতার গল্প শুরু হয় জড়তাহীনভাবে। আসলে এটি জড় ও প্রাণের সমাজরূপকথা।
মানুষের জীবনের প্রতি মুহূর্তের চিন্তা ও জীবনযাপনের বাস্তবতা প্রতি সিকোয়েন্সে দানিউল, আকমল ও বাহারের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। তারা মাতাল, কবি, স্বাপ্নিক, প্রেমিক, চোর, পুত্র, খুনি ও অবশেষে লৌকিক মানুষ। তাদের মুখ দিয়ে উচ্চারিত হচ্ছে নিত্যলব্ধ দহন ও উত্থানের গান। তারা কৌমের পুত্র। তারা কখনো প্রাণীর বল্কল পরা প্রাণ। কখনো প্রকৃতির উড্ডয়নশীল জ্যোৎস্নার গন্ধমুগ্ধ জীবন।
তারা এখানে ত্রয়ী নান্দীকার- প্রকৃতি ও প্রাণের, ব্যক্তির মন ও চিন্তাসূত্রের, সবশেষে স্তরভিত্তিক সমাজসম্পর্কসূত্রের।
মজাটা এখানে যে, একটি বিশাল প্রেতি নিয়ে প্রাণসমূহের বুদ্বুদ্বায়মান চিন্তাস্রোত বাঁধা পড়েছে মাত্র তিনটি চরিত্রের কাব্যিক দেহভংগীতে। কবিতা ও মনজীবন একাকার করে বলা হয়েছে, 'রাত্রির বিচ্ছিন্ন ধ্বনিরা কোন অচিনলোক থেকে নামে। মহাকাল যেনো চড়ুইয়ের ঠোঁটে আমাদের আত্মা খুঁটে খায়, এ তারই ধ্বনি, ধ্বনিরা বহে।' এ ধারাবাহিকতায় নাচের বিন্যাস গড়ে ওঠে। 'যে নাচ কেউ দেখতে পায় না, কোন এক গহনান্তে শুনতে পায়।' এ নিত্যনৃত্য শুনতে নিরঞ্জন, সমুদ্র, পেঁচা, পালক, রাজহংস, সোনার পৈতা ও বাসুকিনাগ লাগে। এসব বাস্তব স্বপ্নকথার মধ্যেই 'একদানা মৃত্তিকা বড়ো হতে থাকে।' মৃত্তিকারূপ পৃথিবীর ত্বকবাসী ভালো-মন্দ আবিষ্কারক এ চরিত্রগুলো ভালো-মন্দের জীবনচিন্তাস্রোতে ভেসে যায়। তাই তারা গুনগুনায়মান কিশোর, ভয়ভীতিহীন রাত্রির দিগন্তে ভাসা নতুন যুবা হয়ে চাঁদনি রাতের মর্মার্থ উদঘাটনে নিজেদের নির্মাণপ্রস্তুতি গ্রহণ করে। যেনো আনন্দ ও কষ্ট সমান সমান মর্যাদা নিয়ে তাদের শরীরে প্রবিষ্ট হয়েছে, তাকে জীবনের উপলব্ধি দিয়ে ব্যবহার ও প্রকাশ করাটাই এখন প্রধান কাজ। শুধু তাদের শরীর স্তরভিত্তিক সমাজে নিচের দিকে টেনে ধরেছে, আর স্বপ্নসৌন্দর্য উপলব্ধিটা আকাশবিহারী হয়ে উঠেছে। এখানে অনেক অপ্রাপ্তি রূপ নেয় জলকেলির আনন্দে। পৌষের রাতে অজস্র ইচ্ছার ব্যতিক্রমী চর্চার মধ্য দিয়ে 'মানুষের শারীরিক কাঠামো তা ভালোবাসা ও ক্রোধের দৃশ্যমানতা' হয়ে ওঠে। তারপর কল্পনার চিকিৎসা নিমিত্তে উপেণ্ড চামারের গরুর চামড়া ছাড়িয়ে নেয়া বিষয়টি মানুষের চিন্তাশক্তিকে একটি সিদ্ধান্তমূলক স্থিতি দেয়। গরু নিজেকে আক্রমনের প্রকৌশল পায়নি আর মানুষের হাত আছে, দেবতার নেই। ফলে ক্রমে ক্রমে লোকবাক্য ও শ্রমের মহত্ব ও গুণত্ব চরাচরে ব্যাপ্তি পায় এবং মানুষের স্বপ্নগুলো অনন্তবিলাসী হবার সাহস অর্জন করে।
অনন্তর রচনাগুণমহিমা নিয়ে স্টেজে নক্ষত্রের ইঙ্গিতবাহী হয়ে ওঠে, মঞ্চায়নে। সেখানে এ বয়ান, অহরকণ্ডল পুনর্জন্ম পায় ও ব্যক্তি থেকে বহুতে মিলায়।
স্বপ্নপাখির মঞ্চবাস্তবতা (কিস্তি তিন) জড় ও প্রাণের সমাজরূপকথা
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!
প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন
মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন
জীবন চালাতে শহরে থাকা কিন্তু বেঁচে থাকা যেন বাড়িতেই
ঈদের ছুটিটা কেমন যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, এই তো সেদিন বাড়ি গেলাম—মায়ের হাতের রান্না, বাবার গল্প, ছোট মেয়ের হাসি, আর স্ত্রীর সেই নীরব অভিমান… সবকিছু মিলিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন
ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!
ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!
সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।