মানুষ, পাখি, প্রাণী ও প্রকৃতিকে তিনটি শরীরে উপস্থাপন করার দুঃসাহস নিয়ে তিন চরিত্র মঞ্চে সারাণ দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। পুরো সময়টাই মনে হয়েছে তাদের শরীর ও মন বৌদ্ধিক প্রকাশকের ভূমিকায় মেতে ছিলো। তাদের স্টকে পুরো নাটকের প্যাকেজ, যেন এইমাত্র তারা রচনা করছে, তাদের সামাজিক শরীর যে চিন্তাঐতিহ্য ধারণ করে আছে তার বাক্যসমূহ দৃশ্যকল্প হয়ে স্বভাব কবিয়ালের মতো কণ্ঠ ও পঞ্চেন্দ্রিয় থেকে প্রকাশিত হচ্ছে।
মধ্যবিত্তের চোখে যেটা অভিনয়, এ তা নয়। এ হচ্ছে মন ও শরীর নিংড়ে প্রকৃতি-সমাজ বর্ণনার বিকল্প ধারণা। এর পিছনে রয়েছে বাঙলার সমাজ-চিন্তা-দর্শনের একটি তুমুল প্রোপট। প্রচলিত সমাজে অবহেলিত যুবক চরিত্রের হাতে দেয়া হয়েছে চিরায়ত চিন্তাভাণ্ড। তা থেকে চরিত্রগুলি নিজেদের শরীরি মতার দাপটে একের মধ্যে শতচরিত্রের মহত্ব যোগ করেছেন অবলীলায়।
রতন, দিলীপ ও আনোয়ার স্টেজে দানিউল, আকমল ও বাহার চরিত্ররূপ নিয়ে তিনটি চিরায়ত বাঙালযুবার প্রতীকে অহরকণ্ডলকে জনপরিসরে উন্মোচিত করতে আলোআঁধারে উপস্থিত হন। তাঁরা তিনবন্ধু অথবা তিনভাই। দানিউল নান্দীকার, তার আবৃত্তি কথনো দোঁহা অথবা স্তব, কখনো দার্শনিক গুঢ় জিজ্ঞাসা ও উত্তরের ভাষান্তর। জগৎজন্মকথার লৌকিক ভাষ্য হিসেবে এ বাক্যসমূহকে বিবেচনা করলে অন্যায় হবে না। রতন নান্দীকার হয়ে তরুণ উপাসকের মতো সুরে বাঁধা কণ্ঠে প্রকৃতি বিষয়ে উদ্বোধনী ছবি আঁকতে গিয়ে শ্রোতৃ-দর্শকমণ্ডলীর চিন্তায় আঘাত করেন, তাদের গলায় বাষ্প জমে ওঠে, আনন্দের কষ্টের মতো। এসব শুরুতে বর্ণনা কৌশলের গুণ। শ্রোতৃ-দর্শকমণ্ডলি ও স্টেজ দখল হয়ে যায়। এর পর বিস্তার।
নান্দীকারের শরীর থেকে নিমেষে অভিনেতার শরীর হয়ে অন্য দু’জনের সাথে অসাধারণ নৈপুণ্যে গোল্লাছুট খেলে। পুরো সময়টাই হেঁয়ালি অথবা বাস্তবতার স্পর্শ নিয়ে অভিনেতাদের খেলা। তাঁরা মাটির গন্ধকে চিন্তার অলৌকিকতায় মিলিয়ে চাবুকের মতো জীবন-নিসর্গের অভিলাষকে রচনা করেছেন পরম মমতায়।
চরিত্র তিনটির অন্তর্দ্বন্দ্বকে কুশলতার সাথে ব্যবহার করে রূপ দিয়েছে তাদের সমাজউদ্গত জীবনউপলব্ধি, তাদের আকাক্সা, স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের সিকোয়েন্সগুলো। মতা ও চিন্তায় দানিউল এক উদ্যোগী যুবা। তাঁর কাছে প্রকৃতি ও সমাজের ছোটো ছোটো ঘটনার ছবি প্রধান ও স্বপ্নময়, জীবনের মতো। বন্ধুদের প্রলুব্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করেন, জীবন ও মৃত্যুর দিকে। তার শরীরে যতি ও গতির মতা স্টেজে দ্রষ্টব্য হয়ে ওঠে। অবশেষে সাধারণ কাহিনি এগিয়ে নিয়ে তাদের অভিনয়গুণে সম্ভ্রান্ত হয়ে যায়।
উপেণ্ড চামারের সারেণ্ডার বা ব্যক্তির ভেঙে পড়ার ছবিটি আনোয়ার যেভাবে এঁকেছেন তা ঢাকার স্টেজে প্রান্তজনের মনোকষ্টের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হয়ে থাকবে। শরীর ও কণ্ঠকে একসাথে অধস্তনতায় নুইয়ে ফেলে দুহিতা কল্পনার বাঁচার প্রয়োজনে যাবতীয় অন্তজকর্ম ও অর্ন্তজ্বালার নিপুণ ব্যাখ্যাকার আনোয়ার। মধ্যবিত্ত দর্শক-শ্রোতার মন কি এখানে দোল খায়? কোন দিকে যাবে সে? তাঁর চোখের সামনে ছাল ছাড়ানো দেবতার কষ্ট, অন্যদিকে মেয়ে কল্পনা। দানিউল অথবা রতন কঠিন বাস্তবের এ দ্বিধা ও উপলব্ধি প্রকাশ করেছেন তার অবয়ব ও দৃষ্টির কারুকাজে। জীবন কি কষ্টময়, অন্তর্জ্বালাময় অথবা চন্দ্রালোকের বন্যায় পাখির চোখের মতো কবিত্বময়? এ প্রশ্নকে সামনে রেখে এসময় অন্তজের আর্তি ও উপলব্ধি মধ্যবিত্তের কাছে মুহূর্তে উপেণ্ড চামারকে প্রধান ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে। ফলে বাহার প্রেমের বিচ্ছুরণ ঘটায় এবং ভগবতী ও বিভিন্ন ধর্ম-সংস্কৃতির সমমর্যাদাকে মহান করে তোলে। এরপর তাঁরা সম্মিলিতভাবে পরস্পরের প্রতি আঘাতের পর দৃষ্টিহীন হয়ে নতুন জীবনের সূত্রসন্ধান ও মৃত্যুকে ঢেকে ফেলার কৌশল আবিষ্কার করে মধ্যবিত্তের স্টেজে নিম্নবর্গের মতাকে প্রতিষ্ঠিত করে দেখিয়েছে যে, সাব-অল্টার্ন প্রকৃতপে শিল্পকে মহিমান্বিত করে। পুরোটাই ছিলো শিল্পীদলের অনায়াস নৈপুণ্যে গ্রন্থিত দৃশ্যমালা।
কেয়াংএ গৌতমের মূর্তি না থাকলেও, গাছপালারা নির্বাণের গূঢ় না জেনেও যেমন নুয়ে থাকে, তেমনি অহরকণ্ডলের ত্রয়চরিত্র শ্রোতৃ-দর্শকমণ্ডলির স্তব্ধ অনুভবগুলোকে প্রণোদিত করেছে অবলীলায়।
স্বপ্নপািখর মঞ্চবাস্তবতা (িকিিস্ত চার) শরীর ও মনের বৌদ্ধিক প্রকাশ
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।