somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

[ফিচার সিরিজ: ৩]- মনে পড়ে রেজা-ইকবালকে?

১১ ই নভেম্বর, ২০১২ রাত ১১:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

‘...গ্লোবালের মহাপরিচালক বিজ্ঞানী রবার্ট টমসন আমাকে তাঁর পরিকল্পিত মহাকাশযান MR-এর নেতৃত্ব দিতে বলেন। শুনে আমি পুলকিত হই। এমনকি যখন বলা হয়, সময়ের গহিন অরণ্যে আমি হারিয়ে যেতে পারি, তখনো আমার আগ্রহে ছেদ পড়েনি। এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি সে আগ্রহের মজা। পৃথিবীর সর্বকালের ইতিহাসে সর্বসেরা বিজ্ঞানীদের তালিকা তৈরি করলে আমার নাম ওপরের দিক
েই থাকবে। তবুও ৪৭টি সুপার ১২ কম্পিউটারের নাম নিয়েও এই সমস্যার সমাধান করতে পারছি না।...
...হঠাৎ এক তীব্র আলোকরশ্মি আমার মহাকাশযান গ্রাস করল। আমি হারিয়ে গেলাম অজানা ভুবনে...।’
হ্যাঁ, আসলেই অজানা ভুবনে হারিয়ে গেছে ইকবাল আর রেজা। সিলেট ক্যাডেট কলেজে প্রকাশিত অভিজ্ঞান নামের একটি ম্যাগাজিনে নিহত কিশোর ইকবালের লেখা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি থেকে ওপরের বাক্যগুলো নেওয়া। গতকাল ছিল ১১ নভেম্বর। আমরা ১৯৯৯ সালের ১১ নভেম্বরের কথা বলছি। সিলেট ক্যাডেট কলেজের শিশিরভেজা সবুজ মাঠ হঠাৎই ভয়াবহ এক রোলার দুর্ঘটনায় রক্তে ভিজে লাল হয়ে ওঠে। শান্ত, সবুজ চা-বাগান আর পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয় আর্তচিৎকার। অনেক স্বপ্নের আধার আমাদের দুই বন্ধু ক্যাডেট ইকবাল ও ক্যাডেট রেজা রোলার চাপা পড়ে নিহত হয়। রোলার টলানোর মতো ভারী শাস্তি দেওয়াটা আসলেই অমানবিক ছিল। মানুষ সোচ্চার হয় কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক শাস্তি দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে। সম্প্রতি শারীরিক শাস্তির অমানবিকতায় বিভিন্ন স্কুলে আরও কিছু শিশু-কিশোরের মারাত্মক আহত হওয়ার, এমনকি নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। নিষিদ্ধ হয় স্কুলে শারীরিক শাস্তি দেওয়ার মতো অমানবিক বিষয়টি।
আমি রেজা-ইকবালের নিহত হওয়ার ঘটনায় গঠিত ক্যাডেট কলেজের একটি তদন্ত কমিটিতে গিয়েছিলাম। আমাকে বলা হলো, তুমি রোলার দুর্ঘটনা ঘটার মুহূর্তে যা দেখেছ, রেজা-ইকবাল এবং অন্যদের অবস্থানসহ তার একটা ছবি এঁকে দেখাও। আমি কলম হাতে নিলাম, আমার হাত কেঁপে উঠল, আমাকে এখন আঁকতে হবে এমন একটি ছবি, যেখানে বেত হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাবার বয়সী একজন স্টাফ, যাঁর রক্তচক্ষু ক্লাস সেভেনে পড়া কিশোরদের ঠেলে দিয়েছিল মৃত্যুমুখে। আমাকে আঁকতে হবে চলন্ত ভারী একটি রোলারের নিচে ছটফট করতে করতে পিষ্ট হতে যাওয়া দুই প্রিয় বন্ধুকে। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
আমার চোখে ভেসে উঠল তাদের বস্ফািরিত চোখ। তারা অবাক চোখে কী দেখছিল? শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছিল খোলা আকাশ, সবুজ মাঠ, প্রিয় বন্ধুদের? নাকি চোখ ভারী হয়ে উঠেছিল—এসবের কিছুই আর দেখা হবে না বলে? অথবা হয়তো অবাক হয়ে দেখছিল, নিষ্ঠুর এক সত্য, যা দুটি কলিকে আর কোনো দিনই ফুল হয়ে উঠতে দেবে না।
রেজার স্বপ্ন ছিল, ক্যাডেট কলেজ থেকে পাস আউট করে সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা হবে। যুদ্ধ আর শান্তিতে সে নিজেকে নিয়োজিত করবে দেশের প্রয়োজনে। ইকবালের স্বপ্ন ছিল স্বপ্নের মতোই। কখনো বলত, দাবাড়ু হব, কখনো বলত, মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের মতো লেখক হব। বলত, বড় ইঞ্জিনিয়ার হব। স্বপ্ন দেখত বড় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। দুজনকেই আমরা জানতাম, যারা নিজেদের ব্যক্তি আর পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশ ও মানুষের হয়ে উঠতে চাইত। প্রিয় রেজা ও ইকবাল, শোনো, তোমাদের ক্যাডেট কলেজের বন্ধুরা, স্বজনেরা তোমাদের শারীরিক অনুপস্থিতি হয়তো মেনে নিয়েছে কিংবা মেনে নিতে হয়েছে কিন্তু তোমাদের স্বপ্নের প্রয়াণকে কখনোই মেনে নিতে পারেনি। তোমাদের বড় সার্থকতা হলো, তোমাদের দেশ ও মানুষের হয়ে ওঠার স্বপ্ন এখন তোমাদের বন্ধুদের স্বপ্ন হয়ে উঠেছে। তাদের অনেকে এখন দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ আর প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানের শেষ বর্ষে পড়াশোনা করছে, অনেকে পেশাজীবনে প্রবেশের দ্বারে দাঁড়িয়ে, অনেকে কর্মকর্তা হিসেবে সামরিক বাহিনীতে কর্মরত হয়েছে। জীবন থেমে থাকেনি, কিন্তু চলার পথে তারা সঙ্গে রেখেছে তোমাদের। তোমাদের স্মৃতিকে। তার চেয়েও বেশি লালন করছে তোমাদের স্বপ্নকে। আজ থেকে চার বছর আগে সিলেট ক্যাডেট কলেজের ২৪তম ব্যাচের ক্যাডেটরা পরম মমতায় গড়ে তুলেছিল ‘রেজা-ইকবাল মেমোরিয়াল অর্গানাইজেশন’, যার মাধ্যমে রেজা-ইকবালের বন্ধুরা গরিব মেধাবী ছাত্রদের জন্য নিয়মিত আর্থিক বৃত্তির ব্যবস্থা করছে। সাধ্যমতো চেষ্টা করছে শীতার্ত ও বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াতে, দরিদ্রদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে। গতকাল রেজা-ইকবালের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাদের বন্ধুরা গিয়েছিল কিশোরগঞ্জে ইকবালের বাড়িতে। ওখানে একটি দরিদ্র এতিমখানায় দেড় শ এতিমের জন্য একবেলা ভালো আহারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাদের কিছু তোশক ও বিছানার চাদরের দরকারের কথা জানতে পেরে সেগুলোও কিনে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিক্ষাবৃত্তির কলেবর আরও বাড়িয়ে রেজার বাড়ি বরিশাল এবং ইকবালের বাড়ি কিশোরগঞ্জেও নেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে।
রেজা-ইকবাল মেমোরিয়াল অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে আমরা রেজা-ইকবালের বন্ধুরা তাদের হারানোর ক্ষত দূর করতে আরও অনেক কিছু করতে চাই। আমরা যা কিছু করেছি বা করছি, তা আমরা যা করতে চাই তার সূচনামাত্র।
ইকবাল তার প্রকাশিত সায়েন্স ফিকশনের শেষ দিকে লিখেছিল, ‘...হায়! মনে মনে আবারও সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে গিয়ে লক্ষ করলাম, আমি বেঁচে থাকার আশা হারাইনি...’
আশা হারিও না বন্ধুরা, আমরা বেঁচে আছি তোমাদের স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে। তোমরা বেঁচে থাকবে, তোমাদের স্বপ্নের মাঝে। সিলেট ক্যাডেট কলেজের কলেজ বার্ষিকীতে ক্যাডেট রেজা একটি কবিতা লিখেছিল। ‘Step by Step’-এর প্রথম দুটি লাইন ছিল ‘Two and two make four
No one is idle here any more...’
বন্ধু এখানে আমরা আর কেউ যেন অলস না থাকি। কর্ম দিয়ে, উদ্যম দিয়ে আমরা যেন এগিয়ে যাই আরও অনেক অনেক দূর।
পাঠক, এই কলামের শিরোনামটি ছিল—মনে পড়ে রেজা-ইকবালকে? কেন মনে পড়তে হবে রেজা-ইকবালকে? এক. এমন করে কোনো প্রাণকে অসময়ে কারও অবহেলার জন্য যেন হারিয়ে যেতে না হয়। দুই. তাদের স্বপ্নগুলো যেন আমাদের স্বপ্ন হয়ে ওঠে এবং সেই স্বপ্নকে যেন আমরা কাজে লাগাতে পারি দেশ ও মানুষের ভালোবাসায়, কল্যাণে।

http://www.facebook.com/mohiuddin.kawsar.1
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্লগের ওসমান হাদী সৈয়দ মশিউর রহমানের ব্যান

লিখেছেন এল গ্যাস্ত্রিকো ডি প্রবলেমো, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৫০

এ আমি কী দেখলাম! ব্লগের প্রতিবাদী মুখ, ভারতের যম, ওসমান হাদীর মুখপাত্র, একাত্তরকা গণ্ডগোলের ব্যাপারে সচেতন মুখ সৈয়দ মশিউর রহমানের ব্লগটি স্থগিত অথবা বাতিল করা হয়েছে। দেশে যখন সামান্য চুমু... ...বাকিটুকু পড়ুন

জেফরি আর্চারের A Prisoner of Birth....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:০০




জেফরি আর্চারের A Prisoner of Birth....

জেফরি আর্চারের A Prisoner of Birth মূলত এমন এক উপন্যাস, যেখানে বন্ধুত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা, শ্রেণিবৈষম্য, বিচারব্যবস্থা, প্রতিশোধ এবং বুদ্ধিমত্তার লড়াই একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। উপন্যাসটির... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসার মোল্লা হুজুর থেকে আপনার সন্তানকে নিরাপদ রাখুন

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:০৭

গতকাল রাতে একটা বাচ্চার পা**র ছবি দেখেছিলাম ফেইসবুকে, অনেকেই শেয়ার করেছেন। পা কেটে হাসপাতালে আসার পর ডাক্তার সাপোজিটরি দিতে গিয়ে দেখে গর্তের মতো হয়ে গেছে। মাদ্রাসার হুজুরে বিকৃত কাজ করতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপি’কে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল বলার কোনো কারণ নাই!!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৩



জাতীয় সন্মাননা কি কোনো গোপন বিষয় । একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা’কে গার্ড অফ অনার দিতে এত অনীহা কেনো বর্তমান সরকারের ‼️

আজ বারবার আমার গোআ’র কুপুত্রের একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাসিনা-বিভ্রাট: এটা ট্রল নয়, কূটনৈতিক সতর্কসংকেত

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৮


হাসিনা-বিভ্রাট: এটা ট্রল নয়, কূটনৈতিক সতর্কসংকেত

জাপানের এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের একটি পোস্ট নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে হাসাহাসি চলছে। আমার মনে হয়, হাসির আড়ালে আসল প্রশ্নটা চাপা পড়ে যাচ্ছে।

ঘটনাটা কী
প্রধানমন্ত্রী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×