somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মাইথোলজি পর্ব ০১: ধর্ম, মাইথোলজি ও মানবসমাজের বিবর্তন

২১ শে জুলাই, ২০২২ রাত ১১:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সনাতন ধর্মে পুরাণে উল্লিখিত ৩৩ কোটি দেবতার মানে কি ৩৩,০০,০০,০০০ জন দেবতা?

কোটি শব্দের একটি বিশেষ অর্থ হইলো উচ্চ শ্রেণি। সে হিসাবে ৩৩ কোটি দেবতা বলতে বোঝাচ্ছে ৩৩ জন উচ্চ শ্রেণির দেবতা। সংস্কৃত ভাষায় ত্রয়োত্রিংশ কোটি বলতে "তেত্রিশ গুণ সম্পন্ন বা তেত্রিশ প্রকার"-কে বোঝাচ্ছে। সম্প্রতি একটা লেখায় কিঞ্চিত আভাস পেয়ে গুগলের সহায়ে কিছুটা ঘাঁটাঘাঁটি করে এটা জানতে পারলাম।

এই ৩৩ প্রকার বা ৩৩ জন দেবতার হলেন-
ক. অষ্ট বসু বা ৮ জন বসু (ধরা, অপ, অনল, অনিল, প্রত্যুষ, প্রভাস, সোম ও ধ্রুব)
খ. বারো আদিত্য বা ১২ জন আদিত্য (বিষ্ণু, বরুণ, মিত্র, ইন্দ্র, অংশুমান প্রমূখ)
গ. এগারো রুদ্র বা ১১ জন মরুত (মনু, মহীন, হর, শম্ভু, কাল, বামদেব প্রমূখ)
ঘ. দুই অশ্বিন (নসত ও দস্র)

[বিঃদ্রঃ ত্রুটি মার্জনীয়, ভুল সংশোধনীয়]

এই যে ৩৩ কোটি দেবতা, এগুলা কিন্তু মিথিক্যাল চরিত্র একেকটা। সনাতনী পুরাণগুলোর একেকটায় তাদের নামেরও ভিন্নতা আছে বটে।
মাইথোলজি একটা বেশ আগ্রহ জাগানিয়া বিষয়। মাইথোলজি খালি অতিপ্রাকৃত অস্তিত্বের কথা কয় না, মানবসভ্যতার সামাজিক বিবর্তনের আখ্যানটাও ব্যাখ্যা করে। মাইথোলজিস্ট জোসেফ ক্যাম্পবেলের এক আলাপচারিতা পড়ে চমকে উঠেছিলাম এটা জেনে যে প্রত্যেকটা মিথের পেছনে মানুষের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ভোগলিক-অর্থনৈতিক কার্যকারণ বিদ্যমান।

এই যে মিথ বা মিথিক্যাল চরিত্রগুলা অতিপ্রাকৃত অনেকাংশে। যদিও রাহুল সংকৃতায়ন মনে করেছেন, এসব চরিত্র আদতে কোনো রক্ত মাংসের মানুষ যারা কালক্রমে বিবর্তিত ও অতিরঞ্জিত হয়ে উত্তরসূরী মানুষের শ্রদ্ধা-কল্পনায় অতিপ্রাকৃত রূপ ধারণ করে মিথে পরিণত হয়েছে।

অনেকাংশে একেকটা চরিত্রের আরও কয়েকটা রূপ-নাম-ডাকও আছে। কালক্রমে বিবর্তিত হইতে হইতে একেকটা রূপভেদও আবার একেকটা স্বতন্ত্র চরিত্রে পরিণত হয়ে গেছে।

আরও অবাক হতে হয় যে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এই মিথ বা মিথিক্যাল চরিত্রগুলায় অদ্ভুত মিল। অঞ্চলভেদে এসব চরিত্র বা মিথকে ভিন্ন নামে বা সংশ্রয়ে ডাকা হইলেও তাদের গড়ে ওঠা ও কার্যকলাপেও ব্যাপক মিল পাওয়া যায়।

এই ধরেন, পারস্য বা প্রাচীন ইরানীয় ধর্ম জরথ্রুস্টবাদে দেয়া একেশ্বরবাদী স্রষ্টা সম্পর্কিত মৌলিক ধারণার সাথে কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের তিন প্রধান ধর্মের (ইহুদীবাদ, খ্রিষ্টান ও ইসলাম) ব্যাপক মিল পাওয়া যায়।

আবার ভারতীয় সনাতনী ধর্মের মাইথোলজির সাথে গ্রীক মাইথোলজির অনেক মিল পাওয়া যায়। যেমন- গ্রীক দেবতা জিউস ও ভারতীয় দেবতা ইন্দ্রের ঐশ্বরিক শক্তি ও নারী আসক্তিতে মিল। কিউপিড/ইরোস আর কামদেব দুজনেই শারীরিক প্রেমের দেবতা। তেমনি আফরোদিতি আর রতি দুজনেই প্রেম, কাম ও ভালোবাসার দেবী। গ্রীক পাতাললোকের শাসক হেডিসের ভারতীয় রূপ যমদেব। ট্রয় নগরী ধ্বংসলীলায় পরম বীর একিলিস যেন মহাভারতের বীর কর্ণেরই পশ্চিমা রূপ!

প্রশ্ন জাগে, পৃথিবীজুড়ে নানা প্রান্তে মিথোলজির এমন অদ্ভুত মিল কেন? উত্তরখানা জটিল নয় বোধ হয়। বলাবাহুল্য বর্তমান বিশ্বে যাবতীয় মিথোলজির মূলে আছে আর্যরা আর তাদের ক্রিয়াধারা। এই আর্যদের একটা অংশ যারা ভারতে এসেছে, তাদের হাত ধরে সৃষ্টি হয়েছে ভারতীয় মাইথোলজি। তেমনি আর্যদের যারা মধ্যপ্রাচ্যের মরূ অঞ্চলে থেকেছে তারা জরথ্রুস্টবাদী মিথোলজি সৃষ্টি করেছে। আবার আর্যদের যে অংশটা তুরষ্কের পথ দিয়ে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বসবাস শুরু করে তারা গ্রীক মাইথোলজির স্রষ্টা।

জেবস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের ছবি যেমন মহাবিশ্ব সৃষ্টিরহস্য উদঘাটনে এক অন্যন্য পদক্ষেপ, তেমনি পৃথিবীতে সামাজিক বিবর্তন, জ্ঞানীয় সভ্যতার উন্নয়ন, ধর্মের উৎপত্তি ও বিবর্তন- মোদ্দাকথা মানবসভ্যতার বিবর্তনের ব্যাখ্যার সহায়হ একটা ব্যাপার স্যাপার হতে পারে মাইথোলজিগুলো। জোসেফ ক্যাম্পবেলের মত মাইথোলজিস্টরা সেই ব্যাপারটাই তুলে ধরেছেন তার দীর্ঘ গবেষক-জীবনে।

মাইথোলজি, ধর্ম, সমাজ আর মানুষের সভ্যতার বিবর্তনের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক-কার্যকারণ আরও ভালো করে বোঝার জন্যে আমিনুল ইসলাম ভুইয়া অনূদিত 'মিথের পথ' বইটা পড়তে পারেন। পাশাপাশি সহজ করে গল্পোচ্ছলে মানবসভ্যতা, সমাজ ও ধর্মের বিবর্তন বোঝার জন্যে রাহুল সংকৃত্যায়নের 'ভোলগা থেকে গঙ্গা' পড়ে নিতে পারেন।


খুর্শিদ রাজীব
২১ জুলাই ২০২২
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জুলাই, ২০২২ রাত ১১:৫৬
১৪টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আল্লাহর সুন্নাতের পরিবর্তে রাসূলের (সা.) বিভিন্ন মতের অনুমোদন সংক্রান্ত হাদিস বাতিল হবে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:৪৭



সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ৪৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
৪৩। পৃথিবীতে অহংকার প্রকাশ এবং কূট ষড়যন্ত্রের কারণে (অকল্যাণ)।কূট ষড়যন্ত্র এর আহলকে(এর সাথে সংযুক্ত সকল ব্যক্তি) পরিবেষ্ঠন করে। তবে কি এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতিটি শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি নির্মম দলিল।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৫:৫৫

প্রতিটি শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি নির্মম দলিল।
ইউনূস ক্ষমতা দখল ছিল লুটের উদ্দেশ্যে। কেন শিশুদের টিকা দেয়া হয় নাই? তাদের দায়িত্ব ছিল টিকা পৌঁছে দেওয়া, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গার্মেন্টসের ভিতরে লুকানো বাস্তবতা—যা আমরা কখনো দেখি না

লিখেছেন Sujon Mahmud, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৭:৫২



সকাল ৬টা। ঘুম ভাঙার আগেই যেন জীবন তাকে টেনে তোলে। রহিমা চোখ খুলেই কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়—
আরেকটা দিন, আবার সেই একই লড়াই।

রহিমা একজন গার্মেন্টস কর্মী। বয়স মাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

দায়বদ্ধতা ও সময়োচিত সিদ্ধান্ত: ২০০৬ থেকে বর্তমানের শিক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:২৫

Photo - আপলোড না হওয়ায় ইমেজ লিংক:

“দায়বদ্ধতা ও সময়োচিত সিদ্ধান্ত: ২০০৬ থেকে বর্তমানের শিক্ষা”

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সে সময় রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে গঠিত উপদেষ্টা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইস্টার ফ্রাইডে এবং যিসাসের শেষ যাত্রা: জেরুজালেমের স্মৃতিবিজড়িত পথে

লিখেছেন সৈয়দ নাসের, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৪




দিলু নাসের
আমার এই তিনটি ছবির সঙ্গে পৃথিবীর খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের বেদনাবিধুর ইস্টার ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। প্রতিটি ছবিই যেন এক একটি অধ্যায়, একটি যাত্রার, যা শুরু হয়েছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×