
দীর্ঘ ১৫ বছরের টিএমসির শাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। গেরুয়া শিবিরের এই ভূমিধস জয়ের পেছনে অবশ্য মোদি ম্যাজিকের চেয়ে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতার ব্যর্থতার দায়ই বেশি। যারা কিছুটা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন— কাটমানি দুর্নীতি, রাজ্যে শিল্প ও কর্মসংস্থানের অভাব, এবং মমতার উদ্ধত কথাবার্তার কারণে টিএমসি এবার পশ্চিমবঙ্গবাসীর মন রক্ষা করতে পারেনি। ২০০৮ সালে কৃষকদের জমি রক্ষা এবং রাজ্য থেকে টাটাকে বিদায় করে যে মমতা বাহবা কুড়িয়েছিলেন, সেই তাকেই আজ এক যুগ পর কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পশ্চিমবঙ্গকে শিল্পে পিছিয়ে পড়ার দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে।
মির্জা গালিব তাঁর চিঠি ও কবিতায় কলকাতার প্রশংসা করেছিলেন এবং আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, “যদি অবিবাহিত হতাম, তবে সবকিছু ছেড়ে এই কলকাতারই হয়ে যেতাম।” এক সময়ের যে বাংলা ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী, শিল্প-সাহিত্য ও জ্ঞানী-গুণীর তীর্থভূমি— যে বাংলার জনসাধারণের চিন্তাভাবনা ও সৃজনশীলতা বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও কাজী নজরুলের মতো মনীষীদের জন্ম দিয়েছিল— আজ সেই বাংলায় সাম্প্রদায়িক শক্তির থাবা স্পষ্ট। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ছিল বাম রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এবং সাম্প্রদায়িক হিংসার ঊর্ধ্বে।
প্রতিবেশী দেশে হিন্দুত্ববাদীদের এই আকস্মিক উত্থানে আপাতত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে তেমন কোনো আশঙ্কা দেখছি না। তবে বিজেপি যেহেতু সাম্প্রদায়িক শক্তি, তাই মুসলিমবিদ্বেষ ও অনুপ্রবেশকারী ইস্যুকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি কিছুটা উত্তাল থাকতে পারে। পাশাপাশি হিন্দু ভোটব্যাংকের ক্ষোভ প্রশমনে ছোটখাটো ধর্মীয় সহিংসতার ঘটনাও দেখা যেতে পারে, যা সীমান্তে বাংলাদেশকে চাপে রাখবে।
তবে এত কিছুর পরও ভারতীয় গণতন্ত্র, সর্বোপরি আইন ও নির্বাচন ব্যবস্থা, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোর জন্য একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে। অশিক্ষা ও জাত-পাতভিত্তিক বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ভারতের নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং অনেকটাই দলীয় প্রভাবমুক্ত। ১/১১, সামরিক হস্তক্ষেপ, ডিপ স্টেট, ভুয়া ভোটার সংযুক্তি, বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ, সমঝোতা, ভাগ-বাটোয়ারা কিংবা আন্দোলন-সহিংসতার মাধ্যমে ভারতীয় বিধানসভা বা লোকসভায় ক্ষমতার পালাবদল হয় না। আবার নির্বাচনী ফলাফলের পর বয়কট, কারচুপি, হরতাল বা জ্বালাও-পোড়াও করে দেশ অচল করে দেওয়ার নজিরও খুব কম। দেশের সংকটকালীন বা জরুরি মুহূর্তে রাজনৈতিক দল-মত নির্বিশেষে একত্রে আলোচনায় বসে সমাধানের পথ খোঁজা হয়। ভারতীয় এমএলএ, মন্ত্রী কিংবা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জনগণের ট্যাক্স ও সরকারি ভর্তুকির টাকায় বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি, সরকারী খরচে লাক্সারি বাড়ি , বিদেশে চিকিৎসা বা অর্থ পাচারের নজির তুলনামূলকভাবে কম। বরং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে এখনো অনেক সময় সেই ব্রিটিশ আমলের অ্যাম্বাসেডর গাড়িও দেখা যায়। বারবার গণতন্ত্রে হোঁচট খাওয়া এবং আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে প্রাণ দেওয়া বাংলাদেশের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে ভারতীয় শাসনব্যবস্থা একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ হতে পারে।
ছবি: প্রিন্টারেষ্ট।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মে, ২০২৬ রাত ১২:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

