somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাদের খারাপ দিনের পর

০৫ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




আমার মাথা যেন আর কাজ করছিল না। বাইরে থেকে আমি স্বাভাবিক হাঁটছি, চলছি, পড়ছি, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছি কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলাম মায়ের কথা ছোট বোনটার কথা আর অনাগত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভেবে এমন এক হতাশায় ডুবে যাচ্ছি যে; যেখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছি না কোনভাবেই।
আমরা থাকি ঢাকার অদূরে এক মফস্বল এলাকায়। এখানে একটাই বড় হাসপাতাল। বন্ধুদের সাথে বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে হসপিটালের এক সাইডে দাঁড়িয়ে গল্প করছিলাম, তখন দেখলাম ইয়াসমিন নামের আব্বার সেই প্রিয়তমা মহিলা হাসপাতালের ভেতরে ঢুকছে, এর আগে তাকে আব্বার কারখানায় আরো দুইবার দেখেছি কাজেই চিনতে অসুবিধা হয়নি মোটেও, মনে পড়লো আগের দিন আব্বার সাথে ফোনে ডাক্তার দেখানোর কথা বলতে উনাকে, এই খরচও নিশ্চিত আব্বার কাছ থেকেই সে নিয়েছে।

কি করছি না করছি এরকম কোন কিছু না ভেবে আমি বন্ধুদেরকে রেখে তার পিছু নিয়ে হসপিটালে ঢুকলাম, দেখলাম একজন মেডিসিন ডাক্তারের চেম্বারের সামনে বসে আছে সিরিয়াল নম্বরের টোকেন হাতে নিয়ে। আমি মুখে মাস্ক পরে তার থেকে একটু দূরে গিয়ে বসলাম। একের পর এক রোগী ঢুকছে, বের হচ্ছে।

দেখতে দেখতে তার সিরিয়াল এলো। তাকে ভেতরে ঢুকে যেতে দেখতে দেখতে মাথায় একটা বুদ্ধি এলো, ডাক্তারকে বলে ওকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা যায় কি না।
সময়গুলো এত বাজে ভাবে কাটছিলো যে ঐ চিন্তা ছাড়া এর থেকে ভালো কোন চিন্তা আর আসছিলোই না মাথায়; আসার কথাও না।

আমি বাইরে ফিরে এসে এক বন্ধুর থেকে ডাক্তারের ভিজিট ৫০০ টাকা ধার নিয়ে আবার চেম্বারের সামনে এসে বসে পড়লাম। কেন করছি, কী করছি কিছুই বুঝতে পারার শক্তি ভেতরে আমার আর অবশিষ্ট ছিল না।
কিছুক্ষণ পর মহিলা ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হলো হাতে প্রেসক্রিপশন আর কয়েকটা টেস্টের কাগজ নিয়ে সে অন্য দিকে চলে গেল। তারপর আরও তিনজন রোগীর পর আমার সিরিয়াল এলো।
ভেতরে ঢুকলাম।
ফর্সা, লম্বা, শান্ত চেহারার একজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক ডাক্তার,
রোগী দেখতে দেখতে খানিকটা ক্লান্ত তিনি, শান্ত গলায় বললেন,
- কি সমস্যা তোমার?

আমি বললাম আমি অসুস্থ না, আমি আপনার কাছে কিছু কথা বলতে চাই, ডাক্তার তার শান্ত স্নিগ্ধ চোখে আমার দিকে তাড়া দেয়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো; বলো বাবা কি বলতে চাও, বাইরে আরো রোগী আছে তারা আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।

ডাক্তারের তাড়া খেয়ে গড়গড় করে এতদিনের জমানো সবকিছু তাকে বলে ফেললাম কোন ভনিতা দাঁড়ি কমা ছাড়া।
বললাম ঐযে সবুজ শাড়ি পড়া শ্যামলা করে মহিলাটা একটু আগে আপনার কাছে এসেছে সেই ই; সেই আমাদের সুখের সংসারটা শেষ করে আমার মায়ের আমার আর আমার ছোটবোনের জীবন ধংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তাকে আপনি বিষ দিয়ে মেরে ফেলুন প্লিজ স্যার, আপনি তো ডাক্তার কেউ কিছু বুঝতে পারবেনা।
কথাগুলো বলতে বলতে রাগে দুঃখে প্রতিশোধের তীব্র ইচ্ছায় আমার গলা কাঁপছিল চোখের জলে ভিজে যাচ্ছিল গাল।

ডাক্তার চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ,
তারপর জিজ্ঞেস করলেন,
- তুমি কী করো?
বললাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি
- কোথায় ভর্তি হতে চাও?
- এইতো, পারি আর না পারি মেডিকেলে চেষ্টা করবো স্যার, কারন মায়ের আমাকে নিয়ে অনেক বড় আশা; সে চায় আমি ডাক্তার হই
- কোন কোন মেডিকেলের ফর্ম তুলেছো?
- ঢাকা মেডিকেল কলেজেরই শুধু, আমার কাছে সব মেডিকেল কলেজের ফর্ম কেনার টাকা নাই, বাবা সংসারে টাকা ও আমাদের খরচ দেওয়া এক প্রকার বন্ধই করে দিয়েছে।
ডাক্তার এবার একটু আশ্বাস দেয়ার ভঙ্গিতে হেসে বললেন,
- ডাক্তার জাইয়ান, একজন ডাক্তার হিসেবে প্রধান দায়িত্ব রোগীকে সুস্থ করা, তার ক্ষতি করা না। আর তোমার এখন এসব দিকে মন না দিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া উচিত।
- তুমি তো মুসলিম?
- জি
- তাহলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ো। মসজিদে যাও যা বলার আল্লাহর কাছে বলো। ইনশাআল্লাহ তিনি একটা পথ বের করে দেবেন।

আমি আর কিছু বলতে পারলাম না, কিংবা বলার মতন কোন কথাও অবশিষ্ট অপশন ও তিনি রাখেন নাই।
তার চেম্বার থেকে বের হই জীবনের সকল সমস্যা ভুলে অদ্ভুত এক অনুভূতি নিয়ে, তিনি আমাকে ডাক্তার জাইয়ান বলে সম্বোধন করলেন!! তার এই সম্মোধন টুকু যেন আমাকে অবাক করা শক্তি সাহস দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন আমাকে বানিয়ে দিল।

সেদিনের পর থেকে আমি আর কিছুতেই মাথা ঘামালাম না, কিংবা মাথা ঘামানোর অবসরটুকু পেলাম না। শুধু একটা জিনিস পড়াশোনা। যেভাবেই হোক, আমাকে মেডিকেলে চান্স পেতেই হবে। দিনরাত এক করে শুধু পড়তে থাকলাম।
এর পাশাপাশি মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তাম রোজ। মোনাজাতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনায় সব খুলে বলতাম কাঁদতাম আর অদ্ভুতভাবে মনটা একটু একটু করে হালকা হতে শুরু করলো।
ধীরে ধীরে একদিন খেয়াল করলাম বাড়ির পরিবেশও বদলাচ্ছে।

আব্বা আগের মতো ফোনে এত কথা বলছেন না। শুরু শুরুতে আব্বা সারা রাত ফোন দিত ওই মহিলাকে, ক্রমাগত অপরপ্রান্তে রিং হবার শব্দ স্পষ্ট শোনা যেত পাশের ঘর থেকে, কিন্তু অদ্ভুত কারণে মহিলা ফোন রিসিভ করতো না।
সন্ধ্যার পর সেই অস্বস্তিকর পরিবেশটাও আর আগের মতো নেই এখন ঘরে।
কেন এই পরিবর্তন আমি বুঝতে পারছিলাম না আল্লাহর কাছে দুহাত তুলে শুকরিয়া আদায় করতে শুরু করলাম। তারই মধ্যে একদিন ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। আর!!!
অবিশ্বাস্যভাবে!! আমি ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলাম।
খবরটা মুহূর্তেই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে গেল ঐ দিন মাগরিবের নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বের হচ্ছি হঠাৎ আব্বা কোথা থেকে ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, এর ওর মুখে ছড়িয়ে কথাটা ইতিমধ্যে আব্বার কানেও গিয়েছে হয়তো।
কাঁদতে কাঁদতে বললেন
- আমার আব্বা মেডিকেলে চান্স পাইছে!! আমার জাইয়ান ডাক্তার হবে!! আমি তোমারে অনেক কষ্ট দিছি গো আব্বা! আমাকে মাফ করে দাও।
এত দিনের অভিমান জমা মন নিমিষেই গলে পানি হয়ে গেল, আমিও সবার সামনেই আব্বাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদতে লাগলাম।

এরপর সবকিছু দ্রুত গতিতে ঠিক হতে শুরু করল যা ছিল আমার কল্পনার বাইরে।
হারুন চাচার কাছ থেকে একদিন শুনলাম, ইয়াসমিন নামের সেই মহিলাকে আব্বা প্রচন্ড অপমান করে কারখানা থেকে বের করে দিয়েছে, সে নাকি ঠিকমতো কারখানায় আসতো না তার কোন কাজই ঠিকঠাক করতো না, সে আর তার পাতানো ভাই মিলে টাকা আত্মসাৎ করেছে অনেকের, আর প্রায় সবার সাথে খারাপ ব্যবহার করতো যেন তারাই কারখানার মালিক, যাকেই তাদের পছন্দ হতো না তাকেই কারখানা থেকে বের করে দেওয়ার হুমকির উপর রাখতো।

এখন আমি মেডিকেলের তৃতীয় বর্ষে পড়ি, আমাদের সবকিছু ঠিক হয়ে গিয়েছে, বাবা মাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে তাদের বিবাহিত জীবনের শুরুর দিকের মতন। আব্বা মাকে আজকাল ডাক্তারের মা বলে সম্বোধন করে, যতবার আব্বার মুখে এই ডাক শুনি আমি ভেতর থেকে অনেক প্রেরণা পাই। একদিন ক্লাসে ঢুকে দেখি,
সেই চেম্বারের ডাক্তার আমাদের ক্লাস নিতে এসেছেন, তিনি যে একজন প্রফেসর ও সে কথা এর আগে জানতামই না, পুরনো দিনের সেই কথা মনে করে আমি লজ্জিত হলাম, ক্লাস খুব ভালোভাবে সম্পন্ন হলো, আমি ভাবলাম সে আমার কথা ভুলেই গিয়েছে।

কিন্তু ক্লাস শেষে তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সে বলে উঠলেন ডাক্তার জাইয়ান না?
অনেকদিন পর সেই কণ্ঠস্বর সেই একই সম্বোধন শুনে হতবাক হয়ে, আশ্চর্য হয়ে, লজ্জায় লাল হয়ে তার দিকে তাকালাম। বললেন
- সব ঠিক আছে?
বললাম জী স্যার, তারপর ভয়ে ভয়ে বললাম স্যার সেদিন ! মানে আপনার সাথে সেদিন দেখা হবার পর কিভাবে যেন ম্যাজিকের মতন সব ঠিক হয়ে গিয়েছিল স্যার। ওই মহিলা আব্বাকে আগের মতন ফোন দিত না, এমনকি ফোন রিসিভ ও করতো না, এর কি কারন আমি কিছুতেই ভেবে পাইনি আজ ও,
তিনি হালকা হেসে বললেন
- আমি ডাক্তার মানুষ, কাউকে ক্ষতি করতে পারি না। তারপর একটু থেমে ঠোঁটের কোনায় দুষ্ট একটা হাসি দিয়ে বললেন
- শুধু ঘুমের ওষুধের ডোজটা একটু বাড়িয়ে দিয়েছিলাম, যাতে সে শান্ত থাকে, আর তোমাদের জীবনটাও একটু শান্ত হয়, বাকী যা কিছু হয়েছে সেটা হবারই কথা, সেই মহিলার নিজের হাতে তৈরী করা তার নিজের নিয়তি।

স্যার চলে যাওয়ার পর আমি বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম সেখানেই অনেকক্ষন।
সেদিন বুঝেছিলাম, নিজের দুঃখ ও সমস্যার কথা জনে জনে বলা প্রায় সকলেই বলে যে ঠিক না, কিন্তু যদি সঠিক ব্যক্তির কাছে বলা যায়, তাহলে অনেক বড় ধরনের পরিণতি থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়।


(সমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩১
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গল্পঃ আমাদের খারাপ দিনের পর

লিখেছেন সামিয়া, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ দুপুর ২:৩৩


করোনার সময় নানান উত্থান পতন ছিল আমাদের, আব্বা মা ছোটবোন সহ আমি নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় মরে যেতে যেতে বেঁচে গিয়েছিলাম শেষ মুহূর্তে, বেঁচে গিয়েছিল আমাদের ছোট্ট সোনার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডোগান- এক রহস্যময় জাতি

লিখেছেন কিরকুট, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ বিকাল ৫:১০



আফ্রিকার মালি এর হৃদয়ে, খাড়া পাথুরে পাহাড় আর নির্জন উপত্যকার মাঝে বাস করে এক বিস্ময়কর জনগোষ্ঠী ডোগান। বান্দিয়াগারা এস্কার্পমেন্ট অঞ্চলের গা ঘেঁষে তাদের বসতি । এরা যেন সময় কে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল কোরআনের ১১৪ সূরায় হানাফী মাযহাবের সঠিকতার অকাট্য প্রমাণ (পর্ব-১৩)

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



সূরাঃ ১৩ রাদ, ১১ নং আয়াতের অনুবাদ-
১১। মানুষের জন্য তার সম্মুখে ও পশ্চাতে একের পর এক প্রহরী থাকে। উহারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে। আর আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অসভ্যদের আছে কি আর মান সম্মান?

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ রাত ৯:৪১

মনুষ্যত্ব বিকিয়ে ধরো সাধু সাজ।
আসলে তো তুমি হলে আস্ত এক ভণ্ড।
হারায়েছো সবখানে তোমার সকল লাজ।
শুয়োরের মতো তুমি জানোয়ার অখণ্ড।
পাপেতে মিশিয়া গাও পুণ্যের গান।
অসভ্যদের আছে কি আর মান সম্মান?
— শ্রাবণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান বাংলাদেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ০৫ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১:২৯

পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয় এবং এর ফলে উদ্ভূত আদর্শিক পরিবর্তন কেবল ভারতের একটি প্রাদেশিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×