somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মা বিষয়ক

১১ ই মে, ২০২৬ রাত ৯:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক

মা দিবসের দুদিন আগে পৃথিবীর দুই প্রান্তে দুজন মায়ের মৃত্যু ঘটেছে প্রসব কালীন জটিলতায়। এই জটিলতা বিষয়ে আমার এই পোস্ট।

মা হওয়ার অনুভূতি আনন্দময়, কিন্তু এর সাথে থাকে শারীরিক এবং মানসিক অনেক কষ্টের অনুভূতি। অনেক কষ্ট সহ্য করার পরেই একজন মা সন্তানের জন্ম দিতে পারেন। সন্তান জন্ম দেওয়াও সহজ কোনো কিছু নয়, এতে সবসময় মায়ের মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে। সন্তান জন্মদান কালীন মায়ের মৃত্যুর ঘটনা শুধু অনুন্নত দেশে নয়, উন্নত দেশেও ঘটে থাকে। কয়েকদিন আগে আমেরিকায় জন্মদান কালীন এক মায়ের মৃত্যুর ঘটেছে। তিনি গর্ভধারণের পুরো সময় সুস্থ ছিলেন, সুস্থ অবস্থায় উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকা হাসপাতালে পৌঁছালেন এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রসব কালীন এক বিরল জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন। সন্তান জন্মদান কালীন এমন অনেক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যাতে উন্নত বিশ্বের আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাতেও মায়ের প্রাণহানি ঠেকানো যায় না, আমাদের দেশে তো এমন সবসময় ঘটছে। মৃত্যু ঝুঁকি তৈরি হয় এমন চারটি পরিস্থিতি নিয়ে লিখছি, আরো অনেক আছে কিন্তু সেগুলো লিখি নি।

১) এ্যামনিওটিক ফ্লুইড এম্বোলিজম (AFE)এ্যামনিওটিক ফ্লুইড এম্বলিজম এমন একটা বিপজ্জনক জটিলতা যাতে এ্যামনিওটিক ফ্লুইড প্রসবের সময় বা সন্তান জন্মের অল্প সময়ের মধ্যেই মায়ের রক্তের সাথে মিশে যায় এবং এরফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মায়ের হার্ট লাংস অকার্যকর হয়ে ব্রেন সেল মারা যেতে শুরু করে। AFE এর কারণ জানা যায়নি, কিন্তু এটা এত দ্রুত ঘটে যে প্রতিরোধ করা খুবই দুরূহ। AFE ঘটে খুব কম, কিন্তু AFE হলে মায়ের বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় শুন্য।

২) প্রসব কালীন মৃত্যু সবচেয়ে বেশি ঘটে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেরক্ত ক্ষরণে মৃত্যু। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ নানা কারণে হতে পারে, কিন্তু যথাসময়ে ব্যবস্থা নিতে পারলে মাকে বাঁচানো সম্ভব। কিন্তু ব্যবস্থা না নিতে পারলে মা খুব অল্প সময়ের মধ্যে শকে চলে যেতে পারে, যার ফলে পরবর্তীতে মৃত্যু ঘটতে পারে।

৩) অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মায়েদের ডায়বেটিস এবং ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাবার মত সমস্যা তৈরি হয়। দুই কারণেই জটিলতা সৃষ্টি হয়ে মায়ের মৃত্যু ঘটতে পারে। ব্লাড প্রেসার অতিরিক্ত বেড়ে গিয়ে কখনো প্রিএকলেম্পশিয়া এবং একলাম্পশিয়া হয়, একলেম্পশিয়াএতে স্ট্রোক করার এবং হার্ট কিডনি ইত্যাদি অকার্যকর হবার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এটাও একটা বিপজ্জনক অবস্থা যা অল্প সময়ের মধ্যে এমন জটিলতা সৃষ্টি করে যে অনেকক্ষেত্রেই তার সমাধান করা যায় না, ফলে মায়ের মৃত্যু ঘটে।

৪) স্পাইনাল এনেস্থেসিয়া বা এপিডিউরাল, যা প্রসবের ব্যথা কমাতে দেয়া হয়, সেটাও মায়ের মৃত্যুর কারণ হতে পারে এমন কোনো কোনো ক্ষেত্রে।

- ওষুধ ভুলবশত রক্তনালীতে বা খুব গভীরে চলে যায়। এর ফলে খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট, রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং হার্টের সমস্যা দেখা দিতে পারে। যথাসময়ে চিকিৎসা না দিতে পারলে মৃত্যু ঘটতে পারে। একে বলা হয় local anesthetic toxicity।

- High spinal block, এপিডিউরাল দিতে গিয়ে স্পাইনাল কর্ডের ভুল জায়গায় বেশি ওষুধ চলে যেতে পারে। এক্ষেত্রেও অচেতনতা, শ্বাসকষ্ট এই সব সমস্যা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা না করলে মৃত্যু ঘটতে পারে।

- এপিডিউরালের পরে রক্তচাপ হঠাৎ খুব কমে যেতে
পারে। সাধারণত ডাক্তাররা রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন । কিন্তু এই অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে মৃত্যু হতে পারে।

(আমি কয়েকটা ঘটনা শুনেছি, যেখানে এনেস্থেসিস্ট এপিডিউরাল পুশ করেই চা খেতে চলে যাওয়ায় রক্তচাপ কমে গিয়ে রোগীর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু সেটা ধামাচাপা দিতে রোগীর স্বজনদের বলা হয়েছে যে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু ঘটেছে!)

৫) এপিডিউরাল দেওয়ার সময় ভুলভাবে প্রয়োগের কারণেও Amniotic Fluid Embolism হতে পারে, ফলে কয়েক মিনিটের মধ্যে ব্রেইন সেল মরতে শুরু করে।

আমাদের দেশে অশিক্ষা- অজ্ঞানতার কারণে প্রসবের জটিলতা বুঝতে না পারায়, যথাসময়ে চিকিৎসা না পাওয়ায় অথবা ভুল চিকিৎসায় অনেক মা সন্তান জন্মের সময় মারা যান। কিছুটা সচেতনতামূলক ব্যবস্থা নিলেই সেই মৃত্যু এড়ানো সম্ভব। কয়েকদিন আগে সন্তান সম্ভাবা একজন মারা গেলেন, স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ডাক্তার হওয়া এবং উন্নত হাসপাতালে নেয়া সত্ত্বেও গর্ভাবস্থার জটিলতার কারণে সন্তান জন্মের সময় মা মারা গেলেন। view this link

এটা খুবই হতাশাজনক, চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই উৎকর্ষের সময়েরও মায়েদের মৃত্যু ঠেকানোর কোনো তরিকাই পাওয়া যায় না!

অবশ্য সন্তান প্রসবের সময়ের আগেও এদেশের অনেক মায়ের মৃত্যু হয় অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় পেটে লাথি খেয়ে। গুগল করলেই এমন অনেক খবর দেখা যায়।

দুই

এত কষ্টকর এবং বিপজ্জনক সময় পার করে মাতৃত্বের স্বাদ পাওয়া যায়, অথচ এই মাতৃত্ব নিয়ে আমাদের দেশে অনেকে মশকরা করেন। সন্তান ধারণ করা মায়েদের সাথে তাঁরা গরুর সাদৃশ্য খুঁজে পান, বলেন যে গরুর বাচ্চা জন্মাতে যদি সিজারিয়ান না লাগে তবে মানুষের বাচ্চা জন্মাতে কেন সিজারিয়ানের দরকার! কেন সিজারিয়ানের দরকার হয়, সেটা বুঝতে যতটুকু বিজ্ঞান শিক্ষা থাকা দরকার কিংবা মানবিকতার বোধ থাকা দরকার তা সম্ভবত আমাদের দেশের অধিকাংশ পুরুষেরই নেই। কারণ অনেকেই এই গরুকে সমর্থন করছেন। অবশ্য সমর্থনের কারণ হতে পারে যে সিজারিয়ান না করলে স্ত্রীর মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে, ফলে স্বামীর নতুন আরেকটা বিয়ে করার সম্ভাবনা বাড়ে! আবার মাদানী হুজুরের মতো লোক নতুন বিয়ের কারণ হিসেবে স্ত্রীর গর্ভাবস্থাকে উল্লেখ করেন। এই লোকের সমর্থনকারীও কম নেই।

এদের সবার জন্য কিছু ব্যবস্থা নেয়া জরুরী। প্রথমে তাদের পেটের সাথে ক্লিং wrap দিয়ে সময়ের সাথে সাথে বর্ধমান ওজন ভালোমত পেঁচিয়ে দিতে হবে, ছয় মাসে যা তিন কেজি হবে এবং তারপর আরও বাড়তে থাকবে। এরপর হাত-পায়ের আঙ্গুলের সমস্ত গিরায় আর হাঁটুতে হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি মেরে এমন ব্যথা করে দিতে হবে যেন চলতে ফিরতে সবসময় ব্যথা অনুভূত হতে থাকে। যদিও এই সামান্য কিছু দিয়ে এদের বোঝানো যাবে না অন্তঃসত্ত্বা হবার যাতনা।

আশা রাখি, এদেরকে প্রসবের যাতনা বোঝাবার ব্যবস্থাও শিগগিরই হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়ে প্রসব যন্ত্রণার সিমুলেশন করা যন্ত্র তৈরি হবে, মাদানী হুজুরদের সেই যন্ত্রের ভেতরে চব্বিশ ঘণ্টার জন্য ঢুকিয়ে দেয়া হবে।

তিন:

যত রকম গালি আছে তার মধ্যে সংখ্যায় সবচাইতে বেশি এবং মানে নিকৃষ্টতম গালির সবগুলো মাকে নিয়ে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরীব পুরুষ নির্বিশেষে এইসব গালি দিতে থাকেন অবলীলায়!!! জানিনা কোন মানসিকতার মানুষ এমন গালির সৃষ্টি করতে পারে।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:০৫
১৫টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আদ্ব দ্বীন হাসপাতাল ও বাংলাদেশ ফেসবুক বিচারক

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৫৪



সম্প্রতি আদ্ব দ্বীন হাসপাতালের ঘটনা কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ফেসবুক বিচারকগণ রায় দিয়েছেন “আদ্ব দ্বীন হাসপাতাল লাইসেন্স বাতিল করা যাবে না”।




...বাকিটুকু পড়ুন

ইমিগ্রেশনেই ধরা খেল বিএনপির কূটনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪০


ধরুন আপনার পাশের বাড়ির সাথে সম্পর্ক ভালো না। দীর্ঘদিনের পুরনো ঝামেলা, কথা বলাবলি বন্ধ, একে অপরকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। এই অবস্থায় পাশের বাড়িতে একটা বৈঠক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আহলে হাদিস সুনিশ্চিত ভাবেই আহলে মোনাফিক ও জাহান্নামী

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৫ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৬:১৫



সূরাঃ ৯ তাওবা, ১০৭ নং আয়াতের অনুবাদ-
১০৭। আর যারা মসজিদ নির্মাণ করেছে ক্ষতি সাধন, কুফুরী ও মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ইতিপূর্বে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অপারেশন মরুঝড়: রেড নোটিশের খোঁজে আরিয়ান

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৫ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:১৬



দুবাইয়ের জুমেইরাহ বিচের বিলাসবহুল পেন্টহাউসের কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরের কৃত্রিম দ্বীপগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলেন সায়েম চৌধুরী। একসময় ঢাকার পুলিশ কমিশনার এবং পরবর্তীতে পুলিশের বিশেষ বাহিনীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের গল্প- ১০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৫ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৫০



১। একজন মা (কোহিনূর) সারারাত ঘরের দরজা খুলে বসে থাকেন।
কারণ কেউ একজন এসে তাকে বস্তা ভরতি টাকা দিয়ে যাবে। গতকাল রাতের কথা। আমার বাসায় ফিরতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×