somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই এ নিয়ে নানাজনের নানা “জ্ঞানগর্ভ” মারা পোস্ট আর নানারকম রবীন্দ্র বিদ্বেষমূলক পোস্ট প্রায়ই দেখা যায়। এটাও দেখানোর চেষ্টা করা হয় তিনি কতো মুসলমানবিরোধী ছিলেন, কাজী নজরুল ইসলামকেও নাকি তিনি বিষ খাইয়ে পাগল বানিয়ে দিয়েছিলেন। এসব নানা নোংরা অপপ্রচার কদিন পরপরই অনলাইনে দেখা যায়। কিন্তু কথা হচ্ছে এগুলোর ভিত্তি আসলে কোথায়?
আজ ঢাকায় এক নারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে চুনকালি মাখতে গিয়ে। এই যে ঘৃণা, এই যে হিংসা-বিদ্বেষ রবীন্দ্রনাথের প্রতি এগুলোর ব্যাপারে কিছু বলা দরকার।
প্রথম কথা হচ্ছে “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” এসব কথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবে কোথায় কোন লেখায় বলেছিলেন এসব প্রশ্নের কোনও যথার্থ উত্তর, সুনিশ্চিত প্রমাণ, দালিলিক প্রমাণ বা ঐতিহাসিক রেফারেন্স কোনটাই কিন্তু কেউ দিতে পারেন না। ইদানিং আবার শুরু হয়েছে কোনও অখ্যাত লেখকের উক্তি বানিয়ে সেটাকে রেফারেন্স হিসেবে চালিয়ে এসব বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করার অপপ্রচেষ্টা। বলা বাহুল্য এসব কুরুচিপূর্ণ মিথ্যা প্রচারের ক্ষেত্রে মূল মোটিভেশন হিসেবে কাজ করছে অন্ধ ভারতবিদ্বেষ।
ইদানিং দেখা যাচ্ছে সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস নামে ভারতীয় এক লেখকের উদ্ধৃতি দিয়ে রবীন্দ্রনাথের এসব কথা আবারো প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা। কথা হচ্ছে এই সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস যে আসলেই এই কথা বলেছিলেন সেটারই বা কোন নিশ্চয়তা আছে? আর যদি সত্যিই বলে থাকেন তাহলেই কি এটা সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়? সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস কোনও বিখ্যাত লেখক নন, কোনও প্রখ্যাত গবেষক নন, কোনও ইতিহাসবিদও নন। ধরে নিলাম সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস এসব কথা বলেছেন। তা সত্বেও তিনি অমন কথা বলে দিলে সেটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য এটা প্রতিষ্ঠা পায় কি করে যেখানে তিনি কোনও প্রখ্যাত গবেষক নন বা প্রখ্যাত কোনও ইতিহাসবিদও নন? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে দুই বাংলায় কম লেখালেখি হয়নি, গবেষণাও নিতান্ত কম হয়নি। রবীন্দ্রনাথ যদি এসব কথা বলে থাকতেন তাহলে তাঁর ওপর চালানো সেসব গবেষণায়ও তো এসব তথ্যের প্রমাণ পাওয়া যেতো। কৈ, সেটাও তো পাওয়া যায়নি।
কথা হচ্ছে এসব কথা বানিয়ে বানিয়ে তো যে কোনও লেখকই এ ধরণের দাবী করতে পারেন যে রবীন্দ্রনাথ এসব বলেছেন। আমাদের দেশে আব্দুল মান্নান নামে এক অখ্যাত লেখকও তার নিজের লেখা এক বইতে এই দাবী করেছিলেন। তবে তিনিও খুব স্বাভাবিকভাবে তার বক্তব্যের সপক্ষে কোনও ঐতিহাসিক/দালিলিক প্রমাণ বা রেফারেন্স দেখাতে পারেন নি। জাস্ট বলেই খালাস যে রবীন্দ্রনাথ অমুক কথা তমুক জায়গায় বলেছেন। এসব কথা যে কোনও লেখক বা গবেষক তো বানিয়ে বানিয়ে দাবী করতেই পারেন। কিন্তু কথা হচ্ছে কোনও ঐতিহাসিক বা দালিলিক প্রমাণ যদি নাই থাকে তাহলে এসব কথা (তা যতো গায়ের জোরেই হোক বা চাপাবাজির জোরেই হোক) তা কী করে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয়?
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এই বিশ্ববিদ্যালয়তেই এনে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিলো। তা সে যুগে তিনি যদি অমন কথা বলেই থাকতেন তাহলে তাঁর মতো ব্যক্তিত্বকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এনে কি সংবর্ধনা দিতো সে যুগের সচেতন ছাত্রসমাজ?
এবার আসুন একটু দেখে নিই মুসলমানদের সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আসলেই কতোখানি বিদ্বেষী ছিলেন --
…… ১৯০০ সালেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'ব্যাধি ও প্রতিকার' প্রবন্ধে লিখলেন, আজ আমরা সকলেই এই কথা বলিয়া আক্ষেপ করিতেছি যে, ইংরেজ মুসলমানদিগকে গোপনে হিন্দু বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিয়া দিতেছে। কথাটা যদি সত্যই হয় তবে ইংরেজের বিরুদ্ধে রাগ করিব কেন। দেশের মধ্যে যতগুলি সুযোগ আছে ইংরেজ তাহা নিজের দিকে টানিয়ে না, ইংরেজকে আমরা এতবড় নির্বোধ বলিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া থাকিব এমন কী কারণ ঘটিয়াছে। মুসলমানকে যে হিন্দুর বিরুদ্ধে লাগানো যাইতে পারে এই তথ্যটাই ভাবিয়া দেখিবার বিষয়, কে লাগাইল সেটা তত গুরুতর বিষয় নয়। শনি তো ছিদ্র না পাইলে প্রবেশ করিতে পারেনা; অতএব শনির চেয়ে ছিদ্র সম্বন্ধেই সাবধান হইতে হইবে। আমাদের মধ্যে যেখানে পাপ আছে শত্রু সেখানে জোর করিবেই— আজ যদি না করে তো কাল করিবে, এক শত্রু যদি না করে তো অন্য শত্রু করিবে- অতএব শত্রুকে দোষ না দিয়া পাপকেই ধিক্কার দিতে হইবে। হিন্দু মুসলমানের সম্বন্ধ লইয়া আমাদের দেশে একটা পাপ আছে; এ পাপ অনেক দিন হইতে চালিয়া আসিতেছে। ইহার যা ফল তাহা না ভোগ করিয়া আমাদের কোন মতেই নিষ্ক্রিতি নাই...”।
রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন ভদ্রলোকদের সঙ্গে চাষাদের ব্যবধান দুস্তর। এই ব্যবধান যে অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি করেছিল তা শুধু মিষ্টভাষণে অপসারিত হতে পারে না। গ্রামের এই চাষারা অধিকাংশই ছিল মুসলমান প্রজা। তিনি তাঁর ‘ব্যাধি ও প্রতিকার' প্রবন্ধে আরে লিখেছেন, “আজ আমাদের ইংরেজি পড়া শহরের লোক যখন নিরক্ষর গ্রামের লোকে। কাছে গিয়ে বলে 'আমরা উভয়েই ভাই'- তখন এই ভাই কথাটির মানে সে বেচার কিছুই বুঝিতে পারেনা। যাহাদিগকে আমরা 'চাষা বেটা' বলিয়া জানি, যাহাদের দুঃখের মূল্য আমাদের কাছে অতি সামান্য, যাহাদের অবস্থা জানিতে হইলে আমাদিগকে গভর্নমেন্টের প্রকাশিত তথ্য তালিকা পড়িতে হয়, সুদিনে দুর্দিনে আমর যাহাদের ছায়া মাড়াইনা, আজ হঠাৎ ইংরেজের প্রতি স্পর্ধা প্রকাশ করিবার বেলায় তাহাদের নিকট ভাই সম্পর্কের পরিচয় দিয়া তাহাদিগকে চড়া দামে জিনিস কিনিতে গুর্খার গুঁতা খাইতে আহবান করিলে আমাদের উদ্দেশ্যের প্রতি সন্দেহ জন্যিবার কথা সন্দেহ জন্মিয়াও ছিল। কোনো বিখ্যাত 'স্বদেশী' প্রচারকের নিকট শুনিয়াছি যে পূর্ববঙ্গে মুসলমান শ্রোতারা তাঁহাদের বক্তৃতা শুনিয়া পরস্পর বলাবলি করিয়াছে যে, বাবুরা বোধ করি বিপদে ঠেকিয়াছে। ইহাতে তাহারা বিরক্ত হইয়াছিলেন, কিন্তু চাষা ঠিক বুঝিয়াছিল। বাবুদের স্নেহভাষণের মধ্যে ঠিক সুরটা যে লাগে না তাহা তাহাদের বুঝিতে বিলম্ব হয় নাই । উদ্দেশ্য সাধনের উপলক্ষে প্রেমের সম্বন্ধ পাতাইতে গেলে ক্ষুদ্র ব্যক্তির কাছেও তাহা বিস্বাদ বোধ হয়— সে উদ্দেশ্য খুব বড় হইতে পারে, হউক তাহার নাম বয়কট' বা স্বরাজ' দেশের উন্নতি বা আর কিছু। ( সূত্র -বঙ্গভঙ্গ : তৎপরবর্তী সমাজ ও রাজনীতি)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন – “আমাদের দেশে যখন স্বদেশী আন্দোলন উপস্থিত হয়েছিল তখন আমি তার মধ্যে ছিলেম। মুসলমানরা তখন তাতে যোগ দেয়নি, বিরুদ্ধ ছিল। জননায়কেরা কেউ কেউ তখন ক্রুদ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ওদের একেবারে অস্বীকার করা যাক। জানি, ওরা যোগ দেয়নি। কিন্তু কেন দেয়নি? তখন বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে এত প্রবল যোগ হয়েছিল সে আশ্চর্য। কিন্তু, এত বড় আবেগ শুধু হিন্দু সমাজের মধ্যেই আবদ্ধ রইল, মুসলমান সমাজকে স্পর্শ করল না। সেদিনও আমাদের শিক্ষা হয়নি... আমি যখন আমার জমিদারি সেরেস্তায় প্রথম প্রবেশ করলেম তখন একদিন দেখি, আমার নায়েব তাঁর বৈঠকখানায় এক জায়গায় জাজিম খানিকটা তুলে রেখে দিয়েছেন। যখন জিজ্ঞেস করলেম এ কেন তখন জবাব পেলেম, যে সব সম্মানী মুসলমান প্রজা বৈঠকখানায় প্রবেশের অধিকার পায় তাদের জন্য ঐ ব্যবস্থা। এক তক্তপোশে বসাতেও হবে, অথচ বুঝিয়ে দিতে হবে আমরা পৃথক। এ প্রথা তো অনেকদিন ধরেই চলে এসেছে; অনেকদিন মুসলমান এ মেনে এসেছে, হিন্দুও মেনে এসেছে। জাজিম-তোলা আসনে মুসলমান বসেছে, জাজিম পাতা আসনে অন্যে বসেছে। তারপর ওদের ডেকে একদিন বলেছি, ‘আমরা ভাই, তোমাকেও আমার সঙ্গে ক্ষতি স্বীকার করতে হবে, কারাবাস ও মৃত্যুর পথে চলতে হবে'। তখন হঠাৎ দেখি অপর পক্ষ লাল টকটকে নতুন ফেজ মাথায় দিয়ে বলে, 'আমরা পৃথক'। আমরা বিস্মিত হয়ে বলি, রাষ্ট্র ব্যাপারে পরস্পর পাশে এসে দাঁড়াবার বাধাটা কোথায়? বাধা ঐ জাজিম তোলা আসনে। বহু দিনের মস্ত ফাঁকটার মধ্যে। ওটা ছোট নয়। ওখানে অকূল অতল কালাপানি। বক্তৃতা মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে ডাক দিলেই পার হওয়া যায় না।“ ( সূত্র -বঙ্গভঙ্গ : তৎপরবর্তী সমাজ ও রাজনীতি)

রবীন্দ্রনাথ “লোকহিত” প্রবন্ধে (সবুজপত্র, ভাদ্র, ১৩২১ [১৯১৪]) লিখেছেন -- "হিন্দু মুসলমানের পার্থক্যটাকে আমাদের সমাজে আমরা এতই কুশ্রীভাবে বেআব্রু করিয়া রাখিয়াছি যে, কিছুকাল পূর্বে স্বদেশী অভিযানের দিনে একজন হিন্দু স্বদেশী-প্রচারক এক গ্লাস জল খাইবেন বলিয়া তাহার মুসলমান সহযোগীকে দাওয়া হইতে নামিয়া যাইতে বলিতে কিছুমাত্র সংকোচ নাই। কাজের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার বশে মানুষ মানুষকে ঠেলিয়া রাখে, অপমানও করে তাহাতে বিশেষ ক্ষতি হয়না। কুস্তির সময়ে কুস্তিগীরদের গায়ে পরস্পরের পা ঠেকে, তাহার হিসাব কেহ জমাইয়া রাখে না; কিন্তু সামাজিকতার স্থলে কথায় কথায় কাহারও গায়ে পা ঠেকাইতে থাকিলে তাহা ভোলা শক্ত হয়। আমরা বিদ্যালয়ে ও আপিসে প্রতিযোগিতার ভীড়ে মুসলমানকে জোরের সঙ্গে ঠেলা দিয়াছি, সেটা সম্পূর্ণ প্রীতিকর নহে, তাহা মানি তবু সেখানকার ঠেলাঠেলিটা গায়ে লাগিতে পারে, হৃদয়ে লাগেনা। কিন্তু সমাজের অপমানটা গায়ে লাগে না হৃদয়ে লাগে। কারণ সমাজের উদ্দেশ্যই এই যে, পরস্পরের পার্থক্যের উপর সুশোভন সামঞ্জস্যের আস্তরণ বিছাইয়া দেওয়া। বঙ্গবিচ্ছেদ ব্যাপারটা আমাদের অন্ন বস্ত্রে হাত দেয়নি, আমাদের হৃদয়ে আঘাত করেছিল। সেই হৃদয়টা যতদূর পর্যন্ত অখণ্ড, ততদূর পর্যন্ত তাহার বেদনা অপরিমেয় ছিল। বাংলার মুসলমান যে এই বেদনায় আমাদের সঙ্গে এক হয় নাই তাহার কারণ, তাহাদের সঙ্গে আমরা কোনোদিন হৃদয়কে এক হইতে দিই নাই।“( সূত্র -বঙ্গভঙ্গ : তৎপরবর্তী সমাজ ও রাজনীতি)

তাহলে দেখতেই পাচ্ছেন যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যে সত্যিকার অর্থে মুসলমানদের প্রতি কোনও বিরূপ মনোভাব বা মুসলমানবিরোধী কোনও মনোভাব ছিল না, বরং হিন্দু মুসলমানের ভেদাভেদ নিয়ে সমাজে যা চলছিলো সেটার ব্যাপারে তার মনে প্রবল দুঃখবোধ ছিল, বেদনা ছিল। এটা উনার সাহিত্য ভালো করে পড়লেই দেখতে পাবেন।
সমস্যা হচ্ছে আমাদের মনোভাবটা হয়েছে সেই “কান নিয়েছে চিলে” এর মতো। কেউ একজন বলে বসলো রবীন্দ্রনাথ এসব কথা বলেছেন আর ব্যস, তারপর সবাই “কান নিয়েছে চিলে” এর মতো কোনও কিছু অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই সেসব বিশ্বাস করতে শুরু করে দিল আর কি!! রবীন্দ্রনাথবিরোধী এসব মানসিকতার মূলে রসদ যুগিয়েছে মূলত পাকিপ্রেমীরা আর জামায়াতি ঘরানার বিভিন্ন মিডিয়ার প্রচারণা (মূলত সাম্প্রদায়িকতার খাতিরে) যারা চিরকালই এসব মিথ্যাচার করে এসেছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে এদের প্রভাব আগের যে কোনও সময়ের তুলনায় অনেক বেড়েছে। আর তার সাথে এদেশের মানুষের মধ্যে যে রুচির দৈন্যতা এবং বিচার-বিবেচনাবোধের অভাবের যে মহা উল্লম্ফন ঘটেছে সেসব মিলেমিশে একাকার হয়ে তৈরি হয়েছে এক চরম হতশ্রী অবস্থার। যার কারণে কোনও কিছু বাছ-বিচার না করে, কোনও কিছু স্টাডি না করে এসব মিথ্যাচারই বরং মানুষ আগ্রহের সাথে গ্রহণ করছে।
একটা ব্যাপার ভুলে গেলে চলবে না। সেটা হল দেশের ভাগাভাগি হয়, সাহিত্য বা সংস্কৃতির ভাগাভাগি হয় না। এটাও ভুলে গেলে চলবে না যে ভারতের হাতে থাকা একটা অংশ কিন্তু আমাদের বাংলারই আরেকটি ভাগ। বাংলার ভাগ হয়েছে কিন্তু সংস্কৃতির ভাগ তো আর হয়নি। তারাও ভাত খায় আমরাও ভাত খাই। দেশ ভাগ হয়েছে কিন্তু এই যে সংস্কৃতি এর তো কোনও পরিবর্তন হয়নি, ভাগ হয়নি। বাংলা সাহিত্য বলতে দুই বাংলার মিলিত বাংলা সাহিত্যকেই বোঝায়। এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় বলা দরকার। যেমন ইংরেজি সাহিত্য বলতে কিন্তু ব্রিটিশ, মার্কিনী বা আইরিশ সাহিত্য এভাবে ভাগাভাগি হয় না। সব ইংরেজিভাষী লেখকদের লেখাজোকাই ইংরেজি সাহিত্যের অংশ। এখানে জাতীয়তা দিয়ে ভাগাভাগি অসম্ভব। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা সত্যি। সংস্কৃতি এমন একটা ব্যাপার যে এখানে ভাগাভাগি করা একটা অসম্ভব এবং অবাস্তব একটা ব্যাপার। বাংলার সাহিত্য, বাংলার সংস্কৃতির সাথে রবীন্দ্রনাথ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। সেই শেকড় এতোটাই গভীর যে তাকে আপনি চাইলেও বিচ্ছিন্ন করতে পারবেন না।
রবীন্দ্রনাথ হচ্ছেন বাঙালীর আত্মার আত্মীয়। আত্মার আত্মীয়কে কীভাবে ভুলে যাওয়া যায়? কীভাবে অস্বীকার করা যায়? রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় না বাংলাদেশী এ প্রশ্ন নিতান্তই অবান্তর এবং বাতুলতা। কিছু কিছু ব্যক্তি কোনও কোনও ক্ষেত্রে নিজেদের প্রখর উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের মহিমায় এমন এক সুমহান মর্যাদার উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হন যেখানে তাঁর জাতীয়তা বা তাঁর নাগরিকত্ব শুধু তুচ্ছই হয়ে যায় না, সেটা দেশ-কাল-পাত্র ছাপিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিক তেমনি একজন ব্যক্তি। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন বাঙালী। আপনি যেমন একজন বাঙালী তিনিও তেমন একজন বাঙালী । আর তিনি এমন একজন বাঙালী যাকে সারা বিশ্ব অত্যন্ত মর্যাদার সাথে দেখে, অত্যন্ত সম্মানের সাথেই দেখে। বিশ্বের নানা দেশে নানা শহরে তাঁর ভাস্কর্য আছে। এই ভাস্কর্য তাঁকে পূজা করার জন্য নয়, তাঁকে সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় যে এসব ক্ষেত্রে দেশ-কাল-পাত্র-জাতীয়তা এসব ব্যাপার কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। এসব আমলে না নিয়ে তিনি “ভারতীয়” না “বাংলাদেশী” এসব বিতর্ক ( এগুলো আসলে বিতর্ক নয়, কুতর্ক ) তারাই করে বা করতে পারে যাদের মানসিকতা খুবই নিম্নশ্রেণীর, খুবই নিচুমনা এবং দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ। অথচ তিনি মুসলমানদের প্রতি ছিলেন সহমর্মী।
মানেটা দাঁড়াচ্ছে এরকম যে তাঁর যোগ্যতা তাঁর মহিমার গুণে তিনি সারা বিশ্বে সমাদৃত এবং সম্মানিত আর এরা তাঁর স্বজাতির লোক হয়ে (অর্থাৎ বাঙালী হয়েও) সম্পূর্ণ বাজে কারণে তাঁকে ঘৃণা করতে উঠেপড়ে লেগেছে!!
পাকিস্তানী আমলে পাকিস্তানীরাও রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এ জাতীয় নানা বিষেদ্গার করে রবীন্দ্রনাথকে আমাদের থেকে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিল, মুছে দিতে চেয়েছিল। পাকিদের সে প্রচেষ্টা যে মোটেই সফল হয়নি তা বলাই বাহুল্য।
এখনো রবীন্দ্র বিদ্বেষের মাধ্যমে তাঁকে ভুলিয়ে দেয়ার একটা অপচেষ্টা রয়ে গেছে এদেশে। এটা মূলত তাদের মধ্যেই বেশী যারা চিন্তাধারার দিক দিয়ে মূলত পাকিমনা বা পাকিস্তানী মাইন্ডেড। তারা ছাড়াও যারা চিন্তাধারার দিক দিয়ে মৌলবাদী বা ধর্মান্ধ তাদের মধ্যেও এসব আছে। তাঁকে বাংলা সাহিত্য থেকে, এদেশের সাহিত্যমনা সংস্কৃতিমনা মানুষের মধ্যে তাঁর প্রতি যে একটা সুউচ্চ শ্রদ্ধার আসন আছে সেটা অস্বীকার করতে না পেরে ব্যর্থ হয়ে তারা এখন কৌশল বদলেছে। সেই কৌশল হচ্ছে তাঁর চরিত্রহনন করা, তাঁর চরিত্রকে কালিমালিপ্ত করা।
এগুলোর মধ্যে খুব কমন একটা বিষয় হচ্ছে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধী, মুসলমান বিদ্বেষী, অত্যাচারী জমিদার, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী এমনকি পতিতাবৃত্তির সাথে জড়িত এ জাতীয় অসংখ্য আজেবাজে জঘন্য তকমা দিয়ে, নানা মিথ্যে অপবাদ আর নানা বানোয়াট কাহিনী রটিয়ে, কুৎসা রটিয়ে তাঁর চরিত্রকে কালিমালিপ্ত করা। তার ওপর মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান সমাজের নানামুখী সাংস্কৃতিক দৈন্যতা, রুচির ব্যাপক দারিদ্র্য, চরম অনৈতিকতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং সুকঠিন ধর্মীয় মৌলবাদের উল্লম্ফন। যার কারণে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এসব ভয়াবহ মিথ্যাচার খুব ভালোভাবেই হালে পানি পেয়ে যাচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বাঙালীদের একজন। তাঁকে যতোই কুৎসা রটিয়ে, হিংসা-বিদ্বেষের ঘূর্ণিস্রোতে ভেসে দূরে ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টাই হোক না কেন, তিনি তাঁর স্বমহিমায় উজ্জ্বল থাকবেন চিরকাল। আপনি সবকিছু ইগনোর আপনার নিচু মানসিকতার বাহার দেখিয়ে তাঁকে সম্পূর্ণ বাজে কারণে ঘৃণায় দূরে ঠেলে দিতেই পারেন, কিন্তু বাকি বিশ্বের কাছে তিনি তাঁর নিজের যোগ্যতায় স্মরণীয় বরণীয় হয়েই থেকে যাবেন। তাঁকে অসম্মান করলেন তো আপনি সারা বিশ্বের কাছে নিজেকেই ছোট করলেন, ছোটলোকি করলেন। তাঁর মতো ব্যক্তিকে অসম্মান করে আপনি সারা বিশ্বের মানুষের কাছ থেকে কোনও সম্মান পাবেন না, বরং অসম্মানই পাবেন।

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৫৫
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×