somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন ইমাম এত নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেবেন কেন ?

০৮ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার জামিরদিয়া এলাকায় একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির গেটে শুরু হয় অস্বাভাবিক গোলমাল। মিনিটের মধ্যে সেখানে জড়ো হয় দেড়শো মানুষের উত্তেজিত ভিড়। তাদের টার্গেট ২৭ বছর বয়সী এক সাধারণ গার্মেন্টস শ্রমিক - দিপু চন্দ্র দাস। অভিযোগ, তিনি ধর্ম অবমাননা করেছেন। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দিপুকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, তার লাশ রশি দিয়ে বেঁধে প্রায় এক কিলোমিটার টেনে নিয়ে যাওয়া হয়, বিবস্ত্র করে গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পুরো ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে দেশ স্তম্ভিত হয়ে যায়। কিন্তু এই নৃশংসতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর ষড়যন্ত্রের গল্প।

সেদিন ছিল বিশ্ব আরবি ভাষা দিবস। পাইওনিয়ার নিট কম্পোজিট লিমিটেড ফ্যাক্টরিতে এই উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। দিপু সেই ফ্যাক্টরিতে প্রায় তিন বছর ধরে কাজ করছিলেন। তিনি ছিলেন তারাকান্দা উপজেলার মুকামিয়াকান্দা গ্রামের মানুষ, বিবাহিত এবং দেড় বছরের এক শিশু কন্যার বাবা। কাজের সুবিধার জন্য ভালুকার ডুবালিয়াপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। একজন সাধারণ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। তার পরিবার জানায়, দিপু শিক্ষিত এবং ধর্মসচেতন ছিলেন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং পরিকল্পিত।

অনুষ্ঠান চলাকালীন হঠাৎ দিপুর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উত্থাপিত হয়। কথিত আছে, তিনি ফ্যাক্টরির কাছের চায়ের দোকানে বসে নবী (সা) সম্পর্কে কটূক্তিমূলক মন্তব্য করেছেন। তবে র‍্যাবের তদন্তে পরবর্তীতে স্পষ্টভাবে জানানো হয় যে ধর্ম অবমাননার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যাদের সাথেই কথা বলা হয়েছে, তারা সবাই বলেছেন যে তারা শুনেছেন কেউ একজন এমন কিছু বলেছে, কিন্তু কেউই সরাসরি দিপুকে এমন কিছু বলতে দেখেননি বা শোনেননি। এই "শুনেছি" এবং "বলা হচ্ছে" টাইপের গুজবই ছিল পুরো ঘটনার ভিত্তি।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দিপুর বাবা রবি চন্দ্র দাস এবং বোন চম্পা দাস দাবি করেন যে উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে বিরোধের জের ধরে পরিকল্পিতভাবে দিপুকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই দাবিটি যখন পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করি, তখন অনেক কিছুই পরিষ্কার হতে শুরু করে।

ঘটনার শুরু হয় ফ্যাক্টরির ভেতর থেকে। সন্ধ্যার পর কিছু শ্রমিক দলবদ্ধ হয়ে দিপুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তার বিরুদ্ধে নবীকে কটূক্তি করার অভিযোগ তুলতে থাকে। এই খবর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে এবং মিনিটের মধ্যে ফ্যাক্টরির বাইরে জড়ো হতে থাকে বিপুল সংখ্যক মানুষ। ঠিক এই সময়ে ঘটে যা পুরো বিষয়টিকে সন্দেহজনক করে তোলে। ফ্যাক্টরির বাইরে স্লোগান দিয়ে মানুষজন জড়ো করতে থাকে কাশর এলাকার মসজিদের ইমাম ইয়াছিন আরাফাত নামের এক ২৫ বছর বয়সী যুবক।

প্রশ্ন হলো, একজন ইমাম যিনি ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন না, যিনি সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না, তিনি কীভাবে এত দ্রুত এই ঘটনার খবর পেলেন এবং কেন তিনি ফ্যাক্টরির গেটে এসে মানুষ জড়ো করতে শুরু করলেন? কে তাকে খবর দিয়েছিল? ফোনে, নাকি কেউ গিয়ে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তদন্তে এখনো পাওয়া যায়নি।

ইয়াছিন আরাফাত এই ঘটনার একদম কেন্দ্রীয় চরিত্র। তিনি হবিরবাড়ি ইউনিয়নের দক্ষিণ হবিরবাড়ি এলাকার বাসিন্দা এবং গত ১৮ মাস ধরে একই ইউনিয়নের কাশর এলাকায় শেখবাড়ি মসজিদে ইমামতি এবং মদিনা তাহফিজুল কুরআন মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছিলেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনিই ফ্যাক্টরির গেটে স্লোগান দিয়ে লোকজন জড়ো করেন, উত্তেজিত জনতাকে উসকানি দেন এবং দিপুকে নির্মমভাবে মারধর করেন। শুধু তাই নয়, দিপুকে হত্যার পর তার নিথর দেহ রশি দিয়ে টেনে-হিঁচড়ে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে স্কয়ার মাস্টারবাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া এবং সেখানে লাশ পোড়ানোর পুরো ঘটনায় তিনি সরাসরি নেতৃত্ব দেন। এই ধরনের সংগঠিত এবং পরিকল্পিত কাজ কোনো তাৎক্ষণিক ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ নয়। এটি একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনার অংশ।

ভৌগোলিক বিশ্লেষণ করলে আরও অনেক কিছু পরিষ্কার হয়। পুরো ঘটনা ঘটেছে হবিরবাড়ি ইউনিয়নের মধ্যে, যেটি ভালুকা উপজেলার ১০ নম্বর ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের অধীনে ১৬টি গ্রাম বা এলাকা রয়েছে। দিপু যে পাইওনিয়ার ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন সেটি অবস্থিত জামিরদিয়া এলাকায়, যেটি ডুবালিয়াপাড়ার অংশ। দিপু নিজে থাকতেন ডুবালিয়াপাড়ায়। ইমাম ইয়াছিন আরাফাত কাজ করতেন কাশর এলাকায়, যেটি একই হবিরবাড়ি ইউনিয়নের অন্তর্গত। তার বাড়ি ছিল দক্ষিণ হবিরবাড়িতে, যেটিও এই একই ইউনিয়নে। আর লাশ পোড়ানো হয় স্কয়ার মাস্টারবাড়ি এলাকায়, যেটিও এই ইউনিয়নের মধ্যেই পড়ে এবং ফ্যাক্টরি থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে। অর্থাৎ, পুরো ঘটনা একটি ছোট্ট ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ, যেখানে সবাই সবাইকে চেনে, স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো পরিষ্কার এবং একজন মসজিদের ইমামের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।

এই ভৌগোলিক সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি প্রমাণ করে যে ইয়াছিন আরাফাত এই এলাকার মানুষ, এই এলাকার লোকজনকে চেনেন, তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন এবং খুব সহজেই তাদের মবিলাইজ করতে সক্ষম। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, ফ্যাক্টরির ভেতরের একটি ঘটনা সম্পর্কে একজন বাইরের ইমাম কীভাবে এত দ্রুত জানতে পারলেন? এর একটাই যুক্তিসঙ্গত উত্তর - ফ্যাক্টরির ভেতরে কেউ তাকে খবর দিয়েছে। কেউ যার স্বার্থ ছিল দিপুকে সরিয়ে দেওয়ার, কেউ যিনি জানতেন যে ইয়াছিন আরাফাতকে ব্যবহার করলে এই কাজটি সহজেই করা সম্ভব। আর এখানেই আসে ফ্যাক্টরি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা, যা অত্যন্ত সন্দেহজনক এবং উদ্বেগজনক।

র‍্যাবের তদন্তে উঠে আসে যে ফ্যাক্টরির ফ্লোর ইনচার্জ এবং কোয়ালিটি ইনচার্জ দিপুকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করার পর উত্তেজিত জনতার কাছে তুলে দেন। পুলিশের অতিরিক্ত সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান যে গ্রেপ্তারকৃত ছয় আসামি ফ্যাক্টরির ভেতরে উপস্থিত কর্মচারীদের উসকানি দিয়েছে, স্লোগান দিয়ে ফ্যাক্টরির বাইরে সংবাদ ছড়িয়ে দিয়েছে এবং দিপুকে চাকরিচ্যুতির জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে। র‍্যাবের ময়মনসিংহ কমান্ডার মো. সামসুজ্জামান বলেন যে পরিস্থিতি টালমাটাল হয়ে গেলে ফ্যাক্টরি রক্ষার জন্য সেখানকার কর্মকর্তারা দিপুকে কথিত জনতার হাতে তুলে দিয়েছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিকেল পাঁচটার ঘটনা রাত আটটায় পুলিশকে জানানো হয়েছে। তিন ঘণ্টা দেরি। কেন? কী করা হচ্ছিল এই তিন ঘণ্টায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।

এই পয়েন্টগুলো মিলিয়ে দেখলে একটি ছবি পরিষ্কার হয়। ফ্যাক্টরির ভেতরে একটি গ্রুপ ছিল যারা দিপুকে সরাতে চাইছিল। দিপুর পরিবারের দাবি অনুযায়ী, উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে বিরোধ ছিল। সম্ভবত দিপু তার কাজে ভালো ছিলেন, সম্ভবত তার প্রমোশন হওয়ার কথা ছিল, অথবা তিনি কারো স্বার্থে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ফ্যাক্টরির কোনো ইনচার্জ বা সুপারভাইজার হয়তো তাকে সরাতে চাইছিলেন। কিন্তু সরাসরি চাকরিচ্যুত করা বা অভিযোগ আনা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন তারা খুঁজে পান একটি নিখুঁত সমাধান - ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তারা ব্যবহার করেন স্থানীয় একজন ধর্মীয় নেতাকে, যার প্রভাব আছে, যিনি মানুষকে দ্রুত জড়ো করতে পারেন। ইয়াছিন আরাফাত ছিলেন সেই পারফেক্ট টুল।

গ্রেপ্তারকৃতদের তালিকা দেখলে আরও কিছু প্যাটার্ন চোখে পড়ে। প্রথম ১০ জনের মধ্যে ফ্যাক্টরির ফ্লোর ইনচার্জ মো. আলমগীর হোসেন, কোয়ালিটি ইনচার্জ মিরাজ হোসেন এবং ডুবালিয়াপাড়া এলাকার বেশ কয়েকজন স্থানীয় যুবক রয়েছে। কাশর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছে আশিকুর রহমান এবং কাইয়ুম নামের দুই যুবক। এটি প্রমাণ করে যে কাশর এলাকার একটি গ্রুপ সক্রিয়ভাবে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। এরা সম্ভবত ইমাম ইয়াছিনের অনুসারী ছিল। নয়জন আসামি ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, যার মধ্যে ফ্যাক্টরির দুই ইনচার্জও রয়েছেন। তারা কী স্বীকার করেছেন সেটা জনসমক্ষে আসেনি। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে ফ্যাক্টরির ভেতর থেকে একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হয়েছিল।

ঘটনার সময়রেখা দেখলে পরিকল্পনার স্বাক্ষর আরও স্পষ্ট হয়। বিকেল পাঁচটার দিকে ফ্যাক্টরিতে ঘটনা শুরু হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইয়াছিন আরাফাত হাজির হন এবং স্লোগান দিয়ে মানুষ জড়ো করতে থাকেন। সন্ধ্যার মধ্যে দেড়শো মানুষের একটি ভিড় তৈরি হয়ে যায়। দিপুকে ফ্যাক্টরির ভেতরে মারধর করা হয়, বাইরে জনতা তাকে হাতে পাওয়ার দাবি জানাতে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে ফ্যাক্টরির প্রোডাকশন ম্যানেজার দিপুকে তখনই বরখাস্ত ঘোষণা করেন। কিন্তু জনতা শান্ত হয় না। রাত নয়টার দিকে দিপুকে ফ্যাক্টরি থেকে জোর করে বের করে আনা হয়। তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তারপর তার নিথর দেহ রশি দিয়ে বেঁধে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের স্কয়ার মাস্টারবাড়ি এলাকায় টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে বিবস্ত্র করে একটি গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। রাত আড়াইটার দিকে পুলিশ এসে অর্ধপোড়া লাশ উদ্ধার করে। পুরো ঘটনায় নয় থেকে দশ ঘণ্টা সময় লেগেছে। এই পুরো সময়টায় কোথায় ছিল স্থানীয় প্রশাসন? কোথায় ছিল পুলিশ? ফ্যাক্টরি কর্তৃপক্ষ কেন তিন ঘণ্টা পর পুলিশকে খবর দিয়েছে?

হত্যার পর লাশ পোড়ানোর ঘটনাটিও অত্যন্ত পরিকল্পিত। একটি গাছে ঝুলিয়ে লাশ পোড়ানো কোনো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নয়। কেউ জানত যে এটি করতে হবে। কেউ জানত কোথায় নিয়ে যেতে হবে। স্কয়ার মাস্টারবাড়ি একটি জনবহুল এলাকা, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে। সেখানে লাশ পোড়ানোর উদ্দেশ্য ছিল পাবলিক মেসেজ পাঠানো। এটি একটি ভীতি প্রদর্শন। এটি দেখানো যে ধর্মের নামে যেকোনো কিছু করা যায়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কিছু করতে পারবে না। আর পুরো ঘটনার ভিডিও করা এবং সেটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনেও একই উদ্দেশ্য - ভয় দেখানো, শক্তি প্রদর্শন করা। এই ধরনের পাবলিক এক্সিকিউশন ইতিহাসে মাফিয়া, কার্টেল বা সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো করে থাকে। এটি কোনো সাধারণ জনতার কাজ নয়।

ইয়াছিন আরাফাতকে কে নিয়োগ দিয়েছিল? তার মোটিভ কী ছিল? একজন মসজিদের ইমাম এবং মাদ্রাসার শিক্ষক এত নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেবেন কেন? এর কয়েকটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা থাকতে পারে। প্রথমত, তিনি আদর্শগতভাবে র‍্যাডিকাল ছিলেন এবং ধর্মের নামে যেকোনো সহিংসতায় বিশ্বাস করতেন। দ্বিতীয়ত, তাকে আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। তৃতীয়ত, তার নিজের কোনো ব্যক্তিগত এজেন্ডা ছিল - হয়তো এলাকায় প্রভাব বিস্তার করা, ভয় তৈরি করা, নিজের শক্তি প্রদর্শন করা। অথবা এই তিনটার কম্বিনেশন। কিন্তু যেটা স্পষ্ট সেটা হলো, ফ্যাক্টরির ভেতরের কেউ তাকে ব্যবহার করেছে। হয়তো তারা জানত যে ইয়াছিনকে একটু ইনসিটিগেট করলেই তিনি কাজ করবেন। হয়তো তারা তাকে কিছু দিয়েছে। হয়তো তাদের মধ্যে আগে থেকেই কোনো সম্পর্ক ছিল। এই সংযোগটা খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি।

হত্যাকাণ্ডের পর ইয়াছিন আরাফাত আত্মগোপনে চলে যান। দীর্ঘ ১২ দিন তিনি পলাতক ছিলেন। কিন্তু তিনি কোথায় ছিলেন? তিনি ছিলেন ঢাকার ডেমরা থানার সারুলিয়া এলাকায় বিভিন্ন মাদ্রাসায়। শুধু তাই নয়, তিনি সেখানে সুফফা মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। একজন খুনি, যার বিরুদ্ধে চারদিকে খোঁজ চলছে, সেই ব্যক্তি কীভাবে এত সহজে একের পর এক মাদ্রাসায় আশ্রয় পাচ্ছে এবং চাকরি পাচ্ছে? এটি শুধু সম্ভব যদি একটি নেটওয়ার্ক থাকে যারা তাকে সাহায্য করছে। এটি প্রমাণ করে যে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি সংযোগ রয়েছে, যারা এই ধরনের অপরাধীদের আশ্রয় দিতে দ্বিধা করে না। প্রশ্ন হলো, কারা এই মাদ্রাসাগুলো পরিচালনা করে? তাদের ফান্ডিং কোথা থেকে আসে? তাদের সাথে কোনো র‍্যাডিকাল নেটওয়ার্কের যোগাযোগ আছে কি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পেলে আমরা কখনো এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে পারব না।

দিপু চন্দ্র দাসের পরিবার ন্যায়বিচার চায়। তার বাবা, মা, স্ত্রী এবং দেড় বছরের শিশু কন্যা - যারা রাতারাতি সবকিছু হারিয়েছে - তারা চায় আসল অপরাধীদের শাস্তি হোক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের বিচার ব্যবস্থা কি তাদের সেই ন্যায়বিচার দিতে পারবে? শুধু ইয়াছিন আরাফাত এবং তার কয়েকজন সহযোগীকে শাস্তি দিলেই কি যথেষ্ট হবে? নাকি আমাদের খুঁজে বের করতে হবে যে কারা এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের মাস্টারমাইন্ড? ফ্যাক্টরির কোন ইনচার্জ বা ম্যানেজার এই ষড়যন্ত্রের মূল পরিকল্পনাকারী? তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল? কেন দিপুকে সরাতে চেয়েছিল?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়ার জন্য প্রয়োজন গভীর এবং নিরপেক্ষ তদন্ত। প্রয়োজন ফ্যাক্টরির সব রেকর্ড, সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর জিজ্ঞাসাবাদ, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ, ব্যাংক ট্রানজেকশন চেক করা, ইয়াছিনের সাথে কাদের যোগাযোগ ছিল তা খুঁজে বের করা। শুধু ভূপৃষ্ঠের অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলে হবে না, যারা মূল শেকড়, তাদেরও চিহ্নিত করতে হবে।

দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড একটি জটিল মামলা। এটি একটি সাধারণ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নয়, এটি একটি টার্গেটেড কিলিং যা ধর্মের আবরণে ঢাকা দেওয়া হয়েছে। এটি একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে স্থানীয় ক্ষমতা কাঠামো, ধর্মীয় নেতা এবং সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি। এই ঘটনার সঠিক তদন্ত এবং সব অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের ঘটনা আবার ঘটবে। আর প্রতিবার একজন নিরীহ মানুষ, একটি পরিবার চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে। দিপু চন্দ্র দাসের শেষ কথা ছিল তার পরিবারের জন্য উদ্বেগ। তার স্ত্রী এবং দেড় বছরের মেয়ে এখন একা। তাদের জীবন থেমে গেছে সেই ভয়াবহ রাতে। আর এই ট্র্যাজেডির জন্য দায়ী শুধু যারা সরাসরি হত্যায় জড়িত ছিল তারা নয়, দায়ী আমাদের পুরো সমাজ ব্যবস্থা, যা এই ধরনের অন্যায়কে বারবার ঘটতে দিচ্ছে।

ভিডিও দেখুন : Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৫৭
২২টি মন্তব্য ২২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পিঠে কোদাল, হাতে মোবাইল

লিখেছেন মুনতাসির, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:২৪



শীতের সকাল।
কুয়াশার চাদরে মোড়ানো মাঠ,
পিঠে কোদাল, হাতে সময়—
মাটি আর মানুষের প্রতিদিনের নিরব সংলাপ।

বগুড়া, ২০২৬। ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন কিরকুট, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৫৪

*** জামাত শিবির এর যারা আছেন তারা দয়ে করে প্রবেশ করবেন না ***


বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এখন আর কেবল একটি দলের ভাগ্যের প্রশ্ন নয় এটি রাজনৈতিক ভারসাম্য, গণতান্ত্রিক কাঠামো... ...বাকিটুকু পড়ুন

পৃথিবীর বুকে এই দুর্যোগ যেন কোনওদিন না আসে

লিখেছেন অর্ক, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:২২



পৃথিবীর বুকে এই দুর্যোগ যেন কোনওদিন না আসে। দুর্ধর্ষ মাফিয়া একটি রাষ্ট্রের মালিক হতে যাচ্ছে। দেশ সীমানা ভূখণ্ডের গণ্ডি পেরিয়ে, পৃথিবীর জন্যই অত্যন্ত বিপদজনক। অবশ্য নির্মম বাস্তবতা হলো, আগাগোড়া অসভ্য,... ...বাকিটুকু পড়ুন

অবশেষে দেশে গণতন্ত্র কায়েম হইলো

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৩

দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে এখন আমাদের আর কোন টেনশন রইলো না। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের বিজয়ী প্রার্থীদের আজ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই মূলত দেশ আবার গণতন্ত্রের ট্রেনে যাত্রা শুরু করলো।... ...বাকিটুকু পড়ুন

রঙিন ডালিম ফলের একটি ব্যতিক্রমি অঙ্গ বিশ্লেষন ( Anatomy of Pomegranate )

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১১


সবুজ পাতার আড়াল ভেঙে
ডালিম ঝুলে লাজুক রঙে
বাইরে রক্তিম খোলস কঠিন
ভিতরে দারুন জীবন রঙিন।
শত দানার গোপন ভুবন
একসাথে বাঁধা মধুর টান
হৃদয়ের হাজার স্বপ্ন যেন
লুকিয়ে থাকা রক্তিম গান।

উপরে প্রচ্ছদ চিত্রে রেনেসাঁ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×