somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নির্বাচন, গণভোট ও রাজনীতির বিভ্রম: বাংলাদেশের বাস্তবতা

৩১ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো প্রাণপণ চেষ্টা করছে ভোটার উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে, কিন্তু জনমনে কাঙ্ক্ষিত উচ্ছ্বাস যেন অনুপস্থিত। এই উদাসীনতার কারণ খুঁজতে হলে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির গভীরে যেতে হবে।

শেখ হাসিনা গতকাল দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হলে তা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারবে না। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন: এই বোধোদয় গত তিনটি নির্বাচনের সময় কোথায় ছিল? ক্ষমতায় থাকাকালীন কি এই চিন্তা মাথায় আসেনি ?

২০১৪ সালের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচন, ২০১৮ সালের রাতের ভোট, কিংবা ২০২৪ সালের আমি-ডামি নির্বাচন—যেখানে প্রধান বিরোধী দল অংশগ্রহণই করেনি: তখন কি জাতীয় ঐক্যের কথা মনে ছিল? সেই সময় আপনার মুখে একটাই কথা ছিল: বিরোধী দল মানেই রাজাকার, আলবদর। আপনার দলের সদস্যরা সাধারণ মানুষকে রাজাকার-আলবদর ভেবে বুঝি নিজেদের বাবার জমি পুনর্দখল করছিলো।

২০২৪ সালের প্রহসনের নির্বাচনের পর হঠাৎ আপনার মনে হলো মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিজের দলের ছেলেপুলে ঢোকাতে হবে। তাই ঝামেলা বাঁধিয়ে দিলেন নিরীহ চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে, আর শেষমেশ নিজেই পালিয়ে ভারতে চলে গেলেন। স্বৈরাচার শাসকের পতনের পর সাধারণত দেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে, কিন্তু বাংলাদেশে তা পুরোপুরি ধসে পড়েনি। এটিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি সফলতা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

এনজিও ও সিভিল সোসাইটি মিলে জুলাই সনদ প্রণয়ন করেছেন। এখন সেই সনদ ভবিষ্যতে সংবিধানের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য 'হ্যাঁ' ভোটের প্রচারাভিযান চলছে। প্রচার করা হচ্ছে, 'হ্যাঁ' জিতলে দেশ বদলে যাবে, ইউরোপ-আমেরিকার মতো হয়ে উঠবে। কিন্তু যদি 'হ্যাঁ' ভোট দেওয়ার পর জনগণ দেখে দেশ সিরিয়া-লিবিয়ার পথে এগোচ্ছে, তখন? তখন আপনাদের কোথায় খুঁজে পাব আমরা? ফলাফল ভোগ করতে হবে আমাদের, আর আপনারা কেবল ভুল হয়ে গেছে বলে সটকে পড়বেন। এটা কি জনগণের হাতে ছেড়ে দেওয়াই ভালো হতো না?

'হ্যাঁ' ভোটের প্রচারণা চালাচ্ছেন: এতে আপত্তি নেই। কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের কেন 'হ্যাঁ' ভোটে প্রচার চালাতে বলা হলো? ব্যাংকের সিএসআর তহবিল কেন হ্যাঁ ভোটের প্রচারে খরচ করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে? তিনটি মন্ত্রণালয় গণভোটের প্রচারে ১৪০ কোটি টাকা নিয়েছে—তারা আসলে কী কাজ করছে? দেশের গ্রামে-গঞ্জে কয়জন গণভোটের প্রকৃত অর্থ বোঝেন? অপরদিকে, নির্বাচন কমিশন সরকারি কর্মচারীদের নির্দেশ দিয়েছে কোনো পক্ষ নিয়ে গণভোটের প্রচারণা চালানো যাবে না। এখন মানুষ কোন দিকে যাবে? একজন মিটার রিডারকে জনতা গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে 'হ্যাঁ' ভোটের প্রচারের সময়।

প্রশ্ন হলো, কোনটি বেশি জরুরি: গণভোট নাকি জাতীয় নির্বাচন? জাতীয় নির্বাচনে সবাইকে ভোট দিতে উৎসাহিত করার জন্য কি প্রচারণা চলছে? টেলিটক সিমে সরকারি বার্তা আসছে বারবার: 'গণভোটে হ্যাঁ দিন, পরিবর্তনের জন্য হ্যাঁ ভোট দিন।' কেউ যদি ভোটই দিতে না যায়, তাহলে সে কি 'হ্যাঁ' ভোট দেবে? বরং বলা উচিত: 'সবাই ভোট দিতে কেন্দ্রে আসুন, এবং হ্যাঁ ভোট দিয়ে পরিবর্তনের সুযোগ দিন।'

বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। বিএনপি দাবি করেছে, ক্ষমতায় গেলে তারা 'ফ্যামিলি কার্ড' দেবে। এ ধরনের কার্ড আগেও দেখা গেছে। শেখ হাসিনাও 'টিসিবি কার্ড' দিয়েছিলেন গরিবদের জন্য, কিন্তু পরে দেখা গেল ক্ষমতাসীনরা পাইকারি হারে সেই কার্ড নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিল, আর গরিবরা ক্ষুধার জ্বালায় ভুগেছিল। ফ্যামিলি কার্ডের ভাগ্যে যেন এমন কিছু না ঘটে।

সামনে হয়তো প্রশ্ন উঠবে: ফ্যামিলি কার্ড নাকি সরকারি চাকরিজীবীদের পে-স্কেল—কোনটি দিলে ভালো হয়? কোনটি দিলে বিএনপি শান্তিপূর্ণভাবে দেশ চালাতে পারবে, যদি তারা নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসে? তারেক রহমান ফ্যামিলি কার্ড নারীদের হাতে দেবেন, যাতে পুরুষরা সেটির অপব্যবহার করতে না পারে। বিকাশের মাধ্যমে সহজেই টাকা পৌঁছে যাবে নারীদের কাছে। এই ধারণার অনুপ্রেরণা এসেছে অধ্যাপক ইউনূস সাহেবের গ্রামীণ এনজিও থেকে।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী নামের ধর্মভিত্তিক একটি রাজনৈতিক দল মানুষকে বেহেশতের টিকেট পাওয়ার সহজ উপায় শেখাচ্ছে। তারা বলছে, জান্নাতে যেতে হলে জামায়াতকে ভোট দিতে হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, জামায়াত যেসব আসনে জোটের প্রার্থী দিয়েছে, সেখানে মানুষ কীভাবে জান্নাতে যাবে? তারা তো অন্য মার্কায় ভোট দেবে। গতকাল থেকে দেখা যাচ্ছে, জামায়াতের আমির তারেক রহমানের মতো বাসে করে প্রচারণা চালাতে শুরু করেছেন, অথচ তিনি আগে এ ধরনের প্রচারণার সমালোচনা করেছিলেন।

বিএনপি-জামায়াত শেরপুরের সংঘাতে জামায়াতের এক নেতা মারা গেছে। এর আগে ছাত্রলীগের হাজতবাসী নেতার স্ত্রী ও সন্তান আত্মহত্যা করেছে, কিন্তু নেতার জামিন হয়নি। অনেকে বলছে প্যারোলে কেন মুক্তি দেওয়া হলো না, কিন্তু জানা থাকা উচিত সাজাপ্রাপ্ত আসামি ছাড়া কাউকে প্যারোল দেওয়া যায় না। পরে অবশ্য এই নেতা জামিন পেয়েছেন। জামিন পাওয়ার পর তিনি জেলারের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ তুলেছেন; মাসুদেরা আর ভালো হলো না।

শেরপুরের জামায়াত নেতার মৃত্যু এবং ছাত্রলীগের নেতার পরিবারের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা তারেক রহমানকে দলীয় নেতা থেকে দেশনেতা হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ করে দিয়েছিল। তারেক রহমান যদি লাইভ জনসভায় অন্তত মৌখিকভাবে বলতেন যে ছাত্রলীগের নেতাকে তার স্ত্রী ও সন্তানের মৃতদেহ দেখার জন্য জামিন দেওয়া হোক, তবে ইতিহাস সৃষ্টি হতো। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনোভাবেই তারেক রহমানের এমন অনুরোধ ফেলতে পারত না। পুরো দেশে তারেক বসন্ত শুরু হয়ে যেত।

যদি জামায়াত নেতার পরিবারকে সমাবেশ থেকে ফোন দিয়ে তারেক রহমান সমবেদনা জানাতেন, তাহলে অন্যরকম নজির সৃষ্টি হতো। জামায়াত সেই নেতার পরিবারকে সম্পূর্ণ সহায়তা দেবে, কিন্তু এতে তারেক রহমান যে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে পারতেন, তা ভাঙা আগামী পাঁচ বছরে কারও পক্ষে সম্ভব হতো না।

এদিকে এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান দিন দিন বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর মতো হয়ে পড়েছে। জুলাই কোটা আন্দোলনের পোস্টার বয় নাহিদ ইসলামের মধ্যে এখন আর আগের মতো জনপ্রিয়তা খুঁজে পাওয়া যায় না। হাসনাত আবদুল্লাহ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হতে চলেছেন। তার আসনে বিএনপির প্রার্থী মুনশির মনোনয়ন খেলাপি ঋণের দায়ে বাতিল হয়ে গেছে। তবু দৃঢ়চেতা মুনশি হাইকোর্ট থেকে এখন সুপ্রিম কোর্টে ছুটছেন, কিন্তু ভুলে যাচ্ছেন সেখানেও তিনি পরাজিত হবেন। এর ফলে অধ্যাপক ইউনূস সাহেবের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে হাসনাত। আগামী সংসদে আমরা হাসনাতকে পেতে চলেছি।

এক মাস পার হয়ে গেলেও ওসমানী হাদীর বিচারের কোনো অগ্রগতি হলো না। প্রকৃত অপরাধীকে মনে হয় আর ধরা সম্ভব হবে না। এদিকে সবাই গালাগাল করছে ওসমানী হাদীর ভাই ওমর হাদীকে। তাকে সবাই ভাই-ব্যবসায়ী বলছে। যুক্তরাজ্যে সরকার তাকে চাকরি দিয়েছে, আর গর্ত থেকে আওয়ামী লীগাররা স্লোগান তুলছে: কোটা না মেধা? ওমর হাদী এখন ওসমানী হাদীর ছেলেকে নিয়ে যেতে চায়, যা নিয়ে হাদীর স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক সংঘাত চলছে বলেই মনে হচ্ছে। সবাই বলছে, স্নিগ্ধ আর ওমর হাদী—মেসার্স ভাই-ভাই ট্রেডার্স।

প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, উদীচী ও ছায়ানটে হামলার কোনো আপডেট দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু সেই সুযোগে কট্টরপন্থী হুজুর বিক্রমপুরীকে আটক করে রেখেছে সরকার। বিক্রমপুরী কেবল লাইভে বলেছিলেন, যারা প্রথমে উসকানি দিয়েছে, তাদের আগে গ্রেফতার করা হোক। এরপর থেকেই হুজুর সাহেব জেলে আছেন।



সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৩৩
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলঃযাঁর হাত ধরে পাকিস্তানের জন্ম

লিখেছেন কিরকুট, ৩০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৭



দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের ভূমিকা একদিকে যুগান্তকারী, অন্যদিকে গভীরভাবে বিতর্কিত। যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মপ্রক্রিয়ায় তিনি ছিলেন একেবারে কেন্দ্রীয় চরিত্র। অথচ কয়েক... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি অসভ্য জাতির রাজনীতি!

লিখেছেন শেরজা তপন, ৩০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:২১


সাল ২০০৮। ব্লগারদের দারুণ সমাগম আর চরম জোশ। ব্লগে ঝড় তুলে দুনিয়া পাল্টে দেওয়ার স্বপ্ন তখন সবার।
বিএনপি আর জামায়াত জোট তখন ভীষণ কোণঠাসা। কেউ একজন মুখ ফসকে ওদের পক্ষে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিঃস্বঙ্গ এক গাংচিল এর জীবনাবসান

লিখেছেন নীল-দর্পণ, ৩১ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:৪৯

বিয়ের পর পর যখন সৌদি আরব গিয়েছিলাম নতুন বউ হিসেবে দারুন ওয়েলকাম পেয়েছিলাম যা কল্পনার বাইরে। ১০ দিনে মক্কা-মদিনা-তায়েফ-মক্কা জিয়ারাহ, ঘোরাফেরা এবং টুকটাক শপিং শেষে মক্কা থেকে জেদ্দা গাড়ীতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নির্বাচন, গণভোট ও রাজনীতির বিভ্রম: বাংলাদেশের বাস্তবতা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩১ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:০৭


আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো প্রাণপণ চেষ্টা করছে ভোটার উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে, কিন্তু জনমনে কাঙ্ক্ষিত উচ্ছ্বাস যেন অনুপস্থিত। এই উদাসীনতার কারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝগড়াটে মেটা এআই.....বেটা এআই X#(

লিখেছেন অপ্‌সরা, ৩১ শে জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৩


আমি তখন প্রায় সারাদিনই শুয়ে শুয়ে দিন কাটাতে বাধ্য হয়েছি। হঠাৎ করে এমন অপ্রত্যাশিত থমকে যাওয়া মেনে নেওয়া তো দূরের কথা আমাকে যারা একটু আধটুও চেনে তারাও মানতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×