somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইরানের পেছনে আদা জল খেয়ে নেমেছে আমেরিকা

১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আজকাল মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে মনে হয়, যেন একটা অদৃশ্য জাল ধীরে ধীরে টানটান হয়ে উঠছে ইরানের চারপাশে। প্রথমে মনে হয় এগুলো আলাদা আলাদা ঘটনা—কোনোটা স্যাংশন, কোনোটা কূটনৈতিক আলোচনা, কোনোটা সীমান্তের অশান্তি। কিন্তু যত গভীরে যাওয়া যায়, ততই পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে এটা কোনো সংযোগহীন দুর্ঘটনা নয়। এটা একটা পরিকল্পিত চাপের জাল, যার একমাত্র লক্ষ্য ইরানকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পুরোপুরি দুর্বল করে দেওয়া।

সবকিছু শুরু হয়েছে গত বছরের জুন মাসে, যখন ইসরায়েল হঠাৎ করে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় আক্রমণ চালায়। সেই আক্রমণের পর আমেরিকা সরাসরি ঢুকে পড়ে—অপারেশন মিডনাইট হ্যামারে ফোর্ডো, নাতানজ, ইসফাহানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাইটগুলোতে বোমা ফেলে। মাত্র বারো দিনের যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক স্বপ্ন কয়েক দশক পিছিয়ে যায়। সেই ধাক্কা এখনো কাটেনি। মুদ্রা ডলারের বিপরীতে রেকর্ড নিম্নে নেমেছে, মুদ্রাস্ফীতি আকাশছোঁয়া। তেহরান, ইসফাহান, মাশহাদের রাস্তায় জানুয়ারি থেকে প্রতিবাদের আগুন জ্বলছে। মানুষ আর ভয় পাচ্ছে না—সাতচল্লিশ বছরের নীরবতা ভেঙে তারা গর্জন করছে।

এই অভ্যন্তরীণ অশান্তির মাঝেই বাইরের চাপ আরও তীব্র হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে আমেরিকা ইরানের তেল পরিবহনকারী চৌদ্দটা জাহাজ আর পনেরোটা সত্তার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ট্রাম্প একটা এক্সিকিউটিভ অর্ডারে সই করেছেন—যে কোনো দেশ যদি ইরানের কাছ থেকে পণ্য বা সেবা কেনে, তাহলে তার ওপর অতিরিক্ত শুল্কের হুমকি। এর মানে সোজা—ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করলে আমেরিকার বাজার হারানোর ঝুঁকি। কোনো দেশই সেটা চায় না। ফলে ইরান আন্তর্জাতিকভাবে একা হয়ে পড়ছে।

ভারতও পিছিয়ে গেছে। চাবাহার বন্দর—ইরানের জন্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ—এখন ভারতের ২০২৬-২৭ বাজেটে কোনো বরাদ্দ নেই। আগে বছরে একশো-চারশো কোটি টাকা যেত, এখন শূন্য। ভারত আগেই তার আর্থিক দায়িত্ব শেষ করে হাত গুটিয়ে নিয়েছে। এটা ইরানের জন্য বড় ধাক্কা—আফগানিস্তান আর মধ্য এশিয়ায় পৌঁছানোর একটা বড় রাস্তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

রাশিয়াও আর আগের মতো নেই। জুনের আক্রমণের পর বুশেহর পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে রুশ বিজ্ঞানীদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। তারা ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মেরুদণ্ড। এখন সেই কর্মসূচি স্থবির। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে আছে, পশ্চিমের সঙ্গে নতুন সংঘাত চায় না।

ওমানে ফেব্রুয়ারি ছয় তারিখে ইরান আর আমেরিকার মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা হয়েছে। প্রথমবারের মতো সেন্টকমের প্রধানও উপস্থিত ছিলেন। দেখে মনে হতে পারে সমাধানের পথ খুলছে। কিন্তু শর্তগুলো এমন যে ইরানের পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব—শুধু পারমাণবিক নয়, ব্যালিস্টিক মিসাইল আর আঞ্চলিক প্রক্সিগুলোও বন্ধ করতে হবে। এটা মূলত আত্মসমর্পণের দাবি। আলোচনা তাই একটা আড়াল মাত্র—তার পেছনে সামরিক আর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে।

ইরাকের খেলাটা আরও জটিল। ট্রাম্প খোলাখুলি হুমকি দিয়েছেন—নুরি আল-মালিকি প্রধানমন্ত্রী হলে আমেরিকা সাহায্য বন্ধ করবে। মালিকি ইরানের সবচেয়ে কাছের লোক। তার ক্ষমতায় আসা মানে ইরাক আবার ইরানের কক্ষপথে। আমেরিকা তাই ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে। ইরাক ইরানের জন্য ল্যান্ড ব্রিজ—সিরিয়া হয়ে হিজবুল্লাহর কাছে অস্ত্র যায় এই পথে। শিয়া জনসংখ্যা বেশি, পপুলার মবিলাইজেশন ফোর্সের মতো মিলিশিয়া ইরানের প্রশিক্ষিত। এই করিডর কেটে ফেললে ইরানের পুরো আঞ্চলিক কৌশল ভেঙে পড়ে।

পাকিস্তানের ঘটনাটাও অদ্ভুত। ফেব্রুয়ারি ছয় তারিখে ইসলামাবাদের একটা শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী হামলায় ত্রিশের বেশি মানুষ মারা যায়। আইএস দায় স্বীকার করেছে। পাকিস্তান ভারতকে দোষ দিচ্ছে, কিন্তু সেটা লজিকে মেলে না। শিয়ারা ইরানের কাছের সম্প্রদায়, চাবাহারের মতো প্রজেক্ট আছে ভারতের সঙ্গে। তাহলে ভারত কেন নিজের হাতে ইরানকে আরও বিচ্ছিন্ন করবে? বরং এই হামলা পাকিস্তান-ইরান সীমান্তে অশান্তি বাড়াবে, ইরানের জন্য নতুন মাথাব্যথা।

এই সব মিলিয়ে মনে হয়, ইরানের অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স ভেঙে পড়ছে। গাজায় হামাস দুর্বল, লেবাননে হিজবুল্লাহ পিছু হটেছে, সিরিয়ায় আসাদের পতন হয়েছে। এখন ইরান একা। চীন-রাশিয়া কথায় সমর্থন দেয়, কিন্তু কাজে কিছু নেই। আরব দেশগুলো তো শত্রু।

এই চাপের মুখে ইরানের সামনে পথ কম। হয় শর্ত মেনে নেওয়া—যা গর্বের জন্য কঠিন। নয়তো শেষ চেষ্টায় পারমাণবিক বোমার দিকে ছোটা—যা আরও বড় যুদ্ধ ডেকে আনবে। নয়তো ঝড় পার করার আশায় অপেক্ষা। কিন্তু সময় তাদের পক্ষে নেই। জাল আরও শক্ত হচ্ছে প্রতিদিন।

ইতিহাস বলে, এত চাপে কখনো অপ্রত্যাশিত ফলাফল আসে। কোণঠাসা প্রাণী সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়। ইরান যদি মনে করে হারানোর আর কিছু নেই, তাহলে হয়তো এমন কিছু করে বসবে যা পুরো অঞ্চলকে আগুনে জ্বালিয়ে দেবে। আর সেটা কারও স্বার্থে যাবে না। শেষ পর্যন্ত ফলাফল নির্ভর করবে ইরানের জনগণের ওপর।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৩:০২
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

১৮ বছর ১ সপ্তাহ পার !

লিখেছেন মেহবুবা, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৯


এমনি করে দিন চলে যায়। ১৮ বছর কখন পেরিয়ে গেল এখানে বুঝতে পারিনি। কত জনের কথা, কত ঘটনা মনে আসছে ! এমনি করে সূর্যাস্তের দিকে যেতে যেতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটা অপরাধ দশটা অপরাধের সুযোগ করে দিতে পারে ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


রাড্ডা হাসপাতালে লুটপাট
ঢাকার মিরপুর এক নম্বরে রাড্ডা ক্লিনিকের ওপর দিয়ে যেন টর্নেডো বয়ে গেছে! গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতের অন্ধকারে ১৫০-২০০ জন দুর্বৃত্ত রাড্ডা ক্লিনিকের ভেতরে প্রবেশ করে রীতিমতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিজন দাদা, হারালে কোথায় ?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


নিত্য নতুন পোস্টের ভিড়ে
সেই চেনা মুখটি আজ আর দেখি না
কোথায় হারালে বিজন দাদা
ব্লগের উঠোনে তোমার সেই ছায়াটি আর মেলে না।

কোনো লেখা যখন সদ্য প্রসবের ব্যথায়
শব্দেরা যখন খুঁজত একটু... ...বাকিটুকু পড়ুন

সক্রেটিস ঈশ্বরের বাণী প্রচার করতেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১৫



সক্রেটিস মানুষের সাথে কথা বলতে ভালোবাসতেন। তিনি যখনই সময়ে পেতেন, মানুষের সমাগম যেখানেই হতো, সেখানেই তিনি বক্তব্য দিতেন। সেই বক্তব্যগুলো ছিলো, সক্রেটিসের ভাষায়, 'দৈব বাণী' বাঁ 'ঈশ্বরের বাণী'। এজন্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

লাল বদর, কালা বদর এবং ছাপরি.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১১

লাল বদর, কালা বদর এবং ছাপরি.....

লাল বদরঃ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া একটি নতুন ও রাজনৈতিক কটূক্তিবাচক শব্দ বা স্লোগান। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও সরকার পতনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×