
রাত তখন গভীর। বঙ্গভবনের একটি কক্ষে আলো জ্বলছে। বাইরে রাস্তায় মানুষের গর্জন, স্লোগান, ক্রোধের উত্তাপ। আর ভেতরে বসে আছেন একা একজন মানুষ -বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। পালানোর পথ নেই, আত্মসমর্পণের ইচ্ছাও নেই। শুধু একটাই কথা মনে মনে আউড়াচ্ছেন - "আমার রক্ত ঝরে যাবে বঙ্গভবনে, ঝরুক। কিন্তু সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করব।"
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর — বাইরে থেকে যতটা সাধারণ মনে হয়েছে, ভেতরে ততটাই ছিল ঝড়ের মতো। রাষ্ট্রপতি ছিলেন কোনো আলোচনায় নেই, কোনো অনুষ্ঠানে নেই, কোনো মঞ্চে নেই। অথচ তাঁকে নিয়ে চলছিল একের পর এক চক্রান্ত। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ধ্বংস করার পাঁয়তারা, সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরির ছক। কিন্তু প্রতিটি চক্রান্তই শেষ পর্যন্ত মুখ থুবড়ে পড়েছে — কারণ রাষ্ট্রপতি এক মুহূর্তের জন্যও তাঁর অবস্থান থেকে নড়েননি ।
২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর। রাতটি ছিল বিভীষিকার। বঙ্গভবন ঘেরাও হয়েছিল সেদিন। নানা নামে, নানা মঞ্চে, নানা ফোরামে — একই ধরনের মানুষ, রাতারাতি গড়ে ওঠা সংগঠন। ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে ঠেলাগাড়ি, ভ্যান, কাভার্ড ভ্যানে করে ছিন্নমূল মানুষ এসে ভিড় জমাচ্ছে চারদিকে। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছিল, গণভবনের মতো বঙ্গভবনও লুটপাটের পরিকল্পনা আছে কারো। কিন্তু রাষ্ট্রপতি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন — পালাবেন না।
সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশন এসে তিন স্তরে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করল। কাঁটাতারের বেড়ার ওপর লাফ দিয়ে উঠছিল একজন তরুণী, তারপর ঝাঁপ দিয়ে মাটিতে পড়ে থাকছে — আর চিৎকার করে ক্যামেরাম্যানকে ডাকছে, ছবি তুলতে বলছে। পুরো দৃশ্যটা ছিল সাজানো নাটক। শব্দ গ্রেনেডের আওয়াজে ভিড় ছত্রভঙ্গ হলেও কিছু মানুষ থেকে গেল। রাত দুইটা, তিনটা পর্যন্ত জেগে বসে রইলেন রাষ্ট্রপতি। ঠিক মধ্যরাতে ফোন এলো তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের — "ওরা আমাদের লোক না, পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা চলছে।"
একটি বিক্ষোভ ব্যর্থ হলে আরেকটি পথ। গণ-অভ্যুত্থানের কিছু নেতার চাপে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রপতিকে সরানোর পরিকল্পনায় মাঠে নামে। কৌশলটা ছিল রাজনৈতিক দলগুলোকে একমত করিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি করা, তারপর রাষ্ট্রপতির মনোবল ভেঙে দিয়ে পদত্যাগ আদায় করা। প্রতিদিন বিভিন্ন দলের নেতাদের কাছে যাওয়া হয়েছে, গ্রুপে গ্রুপে মিটিং হয়েছে, মিডিয়ার সামনে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে। ভেতরে ভেতরে চলেছে হিসাব মেলানোর চেষ্টা।
কিন্তু এই পরিকল্পনায় একটি বড় ভুল ছিল — বিএনপিকে হিসেবের বাইরে রাখা হয়েছিল। বিএনপি এবং তাদের জোট স্পষ্ট জানিয়ে দিল, অসাংবিধানিক কোনো পথে রাষ্ট্রপতি অপসারণে তারা নেই। একটি বড় রাজনৈতিক শক্তির এই অবস্থান সরকারকে পিছু হটতে বাধ্য করল। উদ্যোগটা আপনাআপনিই নীরব হয়ে গেল। তারেক রহমান নিজে রাষ্ট্রপতিকে আশ্বস্ত করেছিলেন — দুঃসময়ে বিএনপির সমর্থন শতভাগ থাকবে।
রাজনৈতিক পথে ব্যর্থ হয়ে সরকার নতুন পথ বেছে নিল। এবার সরাসরি একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে এসে অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির আসনে বসানোর পরিকল্পনা। একজন উপদেষ্টা সেই বিচারপতির কাছে গেলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৈঠক হলো। কিন্তু সেই বিচারপতি রাজি হলেন না। সাফ বলে দিলেন — রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে সবার ঊর্ধ্বে, সেই পদে অসাংবিধানিক পথে বসা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। একজন মানুষের এই দৃঢ়তায় সরকারের সর্বশেষ চালটিও ব্যর্থ হলো।
পুরো সংকটকালে রাষ্ট্রপতির পাশে দাঁড়িয়েছিল সশস্ত্র বাহিনী। বারবার একটাই কথা জানিয়েছে তারা — রাষ্ট্রপতি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, তাঁর পরাজয় মানে পুরো বাহিনীর পরাজয়। এটা তারা যেকোনো মূল্যে রোধ করবে। বঙ্গভবনের সামনে যখন জনতার ভিড় সৃষ্টি করা হয়েছিল, সশস্ত্র বাহিনী তখনো অবস্থান নিয়েছিল। সরকার যখন আবারও অপসারণের পথ খুঁজছে — তখন তিন বাহিনীর প্রধানরা সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার কাছে গিয়ে জানিয়ে দিলেন, কোনো অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ড তাঁরা হতে দেবেন না।
সেই বিভীষিকার রাতে বঙ্গভবন যখন ঘেরাও, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছ থেকে কোনো ফোন আসেনি। না সমর্থনে, না বিরোধিতায় — কোনো অবস্থানেই তিনি ছিলেন না। রাষ্ট্রপতিও চাননি। তাঁর মনোভাব ছিল — যা হচ্ছে হতে থাকুক, দেখা যাক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
সংবিধান অনুযায়ী প্রধান উপদেষ্টার বিদেশ সফর শেষে রাষ্ট্রপতিকে সব কিছু অবহিত করার বাধ্যবাধকতা আছে। ড. ইউনূস প্রায় ১৪ থেকে ১৫ বার বিদেশ গেছেন — একবারও জানাননি। নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যে চুক্তি হয়েছে, সে বিষয়েও রাষ্ট্রপতি কিছুই জানেন না। প্রধান উপদেষ্টা একবারের জন্যও বঙ্গভবনে আসেননি। যে মানুষটির উদ্যোগে এই সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তাঁকেই সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছে।
একদিন বিদেশের একটি বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে এক উপদেষ্টার চোখে পড়ল দেয়ালে রাষ্ট্রপতির ছবি। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা প্রথা — সারাবিশ্বের বাংলাদেশ হাইকমিশন ও কনস্যুলেটে রাষ্ট্রপতির ছবি থাকে, কারণ তিনিই রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। সেই উপদেষ্টা সেখানেই কনস্যুলেটের প্রধানকে তিরস্কার করলেন। সেই রাতেই সারাবিশ্বের সব হাইকমিশন থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি নামিয়ে ফেলা হলো। বছরের পর বছরের একটি রেওয়াজ এক রাতের মধ্যে শেষ।
পরদিন গণমাধ্যমে খবর আসলে রাষ্ট্রপতি জানতে পারলেন। মনে হলো, এটা হয়তো তাঁকে সরানোর প্রথম ধাপ। পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে প্রতিবাদের চিঠি পাঠালেন। উত্তর এলো না।
শুধু ছবি নামানো নয় — রাষ্ট্রপতিকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য করে দেওয়ার একটি সুচিন্তিত কৌশল চলছিল। দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাবর্তনে যাওয়া বন্ধ। কসোভো থেকে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মূল বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ — যেতে দেওয়া হয়নি। কাতারের আমির নিজে সামিটে আমন্ত্রণ জানালেন — সেখানেও না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজেই একটি চিঠি তৈরি করে পাঠাল, রাষ্ট্রপতি যেন সই করে দেন — "আমি ব্যস্ত, যেতে পারব না।" রাষ্ট্রপতি সই করেননি। পাল্টা চিঠিতে তীব্র প্রতিবাদ জানালেন। কোনো জবাব এলো না।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নতুন কমিটি সৌজন্য সাক্ষাতে বঙ্গভবনে এলেন একদিন। সাধারণ বৈঠক, কিছু কথাবার্তা, ফটোসেশন। পরদিন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং রুষ্ট হয়ে উঠল। তদন্ত শুরু হলো — কে এটা করেছে? শেষমেশ তিনজনকে তুলে নিয়ে গেল — প্রেস সেক্রেটারি, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রেস সেক্রেটারি। তিরিশ বছর ধরে বঙ্গভবনে কাজ করা দুজন ফটোগ্রাফারকেও সরিয়ে দেওয়া হলো।
রাষ্ট্রপতির প্রেস উইং শূন্য হয়ে গেল। বাংলাদেশের ক্রিকেট দল বিদেশে জিতলেও অভিনন্দন জানিয়ে একটা বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার ক্ষমতা নেই। ক্যাবিনেট সেক্রেটারি, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি, এস্টাবলিশমেন্ট সেক্রেটারি — বারবার ফোন করলেন রাষ্ট্রপতি। কেউ পাত্তা দিলেন না। জাতীয় দিবসের ক্রোড়পত্র ঠিকই প্রকাশিত হলো, কিন্তু রাষ্ট্রপতির বাণী ছাপা হলো না ।
দেড় বছরের সেই ঝড় পেরিয়ে রাষ্ট্রপতি এখন বলছেন, এই ঝড় সহ্য করার সামর্থ্য অন্য কারো ছিল কিনা তিনি জানেন না। আল্লাহর ইচ্ছা আর নিজের দৃঢ়তা — এই দুটোকেই তিনি তাঁর টিকে থাকার শক্তি বলে মনে করেন। প্রতিটি ষড়যন্ত্র, প্রতিটি অপমান, প্রতিটি চাপ — সব কিছু সহ্য করেছেন শুধু একটাই লক্ষ্যে, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখতে। সেই রুদ্ধ দেড় বছরের গল্প ইতিহাসের পাতায় হয়তো নেই — কিন্তু ঘটেছিল, একজন মানুষের বুকের ভেতর চেপে।
চমকানো তথ্য দিলেন রাষ্ট্রপতি- সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ
https://youtu.be/REt3uWjCwv0?si=2gCnroa_aSpqhpW1
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




