
এই দেশে বিপ্লব করা খুবই কঠিন । কিন্তু বিপ্লব করার পর শান্তিতে থাকা আরোও কঠিন। কারণ রাষ্ট্র বিপ্লবীদের কদর বোঝে না। তাই আমরা আজকে দাবি জানাতে এসেছি : জুলাই যোদ্ধাদের হয়রানি বন্ধ করতে হবে এখনই; নিঃশর্তে।
প্রথমত, ফতুল্লার এনসিপি নেতা ইয়াসিন আরাফাতের কথা বলা দরকার। এই সাহসী মানুষটা নির্বাচনের পর পরই ফুটপাতে নেমে পড়েছেন। না, ঘুরতে না। তিনি জনসেবা করছেন। ফুটপাতের দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলছেন, তাদের খোঁজখবর নিচ্ছেন, কিছু আর্থিক সহযোগিতাও চাইছেন -এটাকে কিছু ঈর্ষাপরায়ণ মানুষ চাঁদাবাজি বলছে। অথচ এই লোক জুলাইতে রাস্তায় ছিল। রাস্তায় থাকলে মানুষ একটু রাস্তার হক পায় না? সেই হক বুঝে নিতে গেলে দলেরই সংগঠক বাধা দিতে আসে, এটা কি ঠিক? তার উপর আবার মারামারিতে জড়িয়ে পড়লে দোষটা কার? স্পষ্টতই রাষ্ট্রের। কারণ রাষ্ট্র এই বিপ্লবীকে এখনো যথাযোগ্য সম্মানী দেয়নি।
দ্বিতীয়ত, বগুড়ার মিজানুর রহমান সাগরের বিষয়টা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা। এত বড় একজন মানুষ একদিন একটু ভুল করে ফেললেন - কোনো এক ব্যবসায়ীর কাছে মাত্র দুই লাখ টাকা চাইলেন, সে না দিলে একটু মারধর করলেন, বিকাশ থেকে ২৮ হাজার আর নগদ ২২ হাজার নিলেন। পঞ্চাশ হাজার টাকার জন্য পুরো একজন বিপ্লবীকে জেলে পুরে দেওয়া হলো! অথচ আওয়ামী লীগ আমলে কোটি কোটি টাকা লুট হয়েছে, সেগুলোর বিচার কোথায় ? মিজান সাগর জুলাইয়ে ছিলেন। জুলাইয়ে থাকলে পঞ্চাশ হাজার টাকা কি মাফ করা যায় না? আমরা দাবি জানাচ্ছি, তাকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে এবং যে ব্যবসায়ী মামলা করেছেন, তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সতর্ক করতে হবে।
তৃতীয়ত, আমাদের প্রিয় মাহদী হাসানের কথা না বললেই না। এই বীর মানুষটা থানার সামনে দাঁড়িয়ে খুনি এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে জ্বালিয়ে দেওয়ার গল্প নিজে মুখে বলেছিলেন। এটা বীরত্ব। তখন সবাই হাততালি দিয়েছিল। তারপর তাকে গ্রেপ্তার করা হলো, ছাড়া পেলেন। এরপর তিনি পর্তুগালের ভিসার জন্য দিল্লি গেলেন - সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সফর, সঙ্গে মাত্র ৪০ লাখ টাকার ক্রিপ্টোকারেন্সি, যেটা আবার তিনি নিজেই গুজব বলেছেন, সুতরাং সেটা নিয়ে আর কথা বলা ঠিক না।
দিল্লিতে গিয়ে ভারতীয় গোয়েন্দারা তাঁকে চিনে ফেলল, নজরে রাখল, এক পর্যায়ে দেশে ফিরতে বাধ্য করল। এটা কি হয়রানি না ? একজন বিদেশে গেলে সেখানকার সরকার তাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না, এটা কোন ধরনের সভ্যতা? তাই আমাদের দাবি : মাহদীকে ভিআইপি লাল পাসপোর্ট দিতে হবে। তিনি যেখানে যেতে চান, রাষ্ট্রীয় খরচে পাঠাতে হবে। ভারতে তাঁর সাথে যা হয়েছে, তার প্রতিবাদে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন ঘেরাও করতে হবে। বিপ্লবীকে অপমান করা মানে বিপ্লবকে অপমান করা।
তারেক রহমানের প্রতি আমাদের একটি বিনীত আবেদন আছে। তিনি এখন দেশে ফিরেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। জুলাই যোদ্ধারা তাদের বিপ্লবের ফল এখনো পাননি। তারেক রহমান যদি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক মানুষ হন, তাহলে এই যোদ্ধাদের গ্রেপ্তার করা উচিত হবে না।
এখানে একটা ব্যাপার বিশেষভাবে বলা দরকার। কারাগারে এখন আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মী আছেন। তাদের মনের অবস্থা কী, সেটা ভাবুন একটু। দলীয় সরকারের আমলে যারা হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন, ক্ষমতার সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করেছেন, তারা এখন ছোট সেলে গাদাগাদি করে বসে আছেন। এই মানুষগুলোর কাছে যদি আমাদের জুলাই যোদ্ধাদের পাঠানো হয়, তাহলে কী হবে সেটা ভাবতেই বুক কাঁপে। জুলাই যোদ্ধারা ফ্যাসিস্ট তাড়িয়েছে — আর সেই ফ্যাসিস্টদের সাথে একই ছাদের নিচে রাখা হবে? এটা কি মানবাধিকার লঙ্ঘন না?
তাই তারেক রহমানের কাছে আমাদের পরিষ্কার দাবি - জুলাই যোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে চাকরি দিন। একেকজনকে একেকটা মন্ত্রণালয় দিয়ে দিন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী বানিয়ে দিন, বেতন দিন, গাড়ি দিন। এতে অন্তত ফুটপাতের দোকানদাররা শান্তিতে ব্যবসা করতে পারবে। না হলে অন্তত সমঝোতার বৈধ টেন্ডার দিন, থানায় জানিয়ে রাখুন যেন পুলিশ বাধা না দেয়। বিপ্লবীদের উপার্জনের পথ বন্ধ করা রাষ্ট্রের কাজ না।
এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধী নেতারা প্রতিদিন বিএনপিকে চাঁদাবাজ বলেন। এটা তাদের নৈতিক দায়িত্ব, কারণ তারা নৈতিকতার ধ্বজাধারী। কিন্তু নিজেদের লোকেরা যখন ফুটপাতে, বাজারে, রোলিং মিলে কাজ করে, সেটা চাঁদাবাজি না - সেটা জুলাইয়ের লভ্যাংশ সংগ্রহ। দুটো জিনিস এক না। বোঝার চেষ্টা করুন। আব্দুল্লাহ আল আমিন সারাদিন বিএনপিকে চাঁদাবাজ বলে গলা ভাঙেন, সেটা তাঁর রাজনৈতিক অধিকার। তাঁর দলের কর্মীরা পাশের ফুটপাতে যা করছে সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় -সেটা হলো তৃণমূল পর্যায়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রম। এই দুটোকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না।
সবশেষে বলতে চাই, এই দেশের মানুষ অকৃতজ্ঞ। রাস্তায় নামলে, স্লোগান দিলে, থানায় বসে বীরত্বের গল্প বললে মানুষ ভালোবাসে। কিন্তু সেই বীরত্বের পুরস্কার হিসেবে একটু ফুটপাত, একটু বাজার, একটু বিকাশ ট্রানজেকশন চাইলেই সবাই চাঁদাবাজ বলে চেঁচায়। মাহদী হাসান বিদেশে যেতে চান - এটা কি অপরাধ? পকেটে কিছু ক্রিপ্টো থাকলে কি মানুষ আর বিপ্লবী থাকে না? বিপ্লব কি শুধু গরিবদের জন্য?
এই হয়রানি বন্ধ হোক। জুলাই যোদ্ধারা মুক্তভাবে বাঁচুক। বাংলাদেশ তাদের ঋণ শোধ করুক — নগদে, না হয় ক্রিপ্টোতে। আর যদি তা না পারেন, তাহলে অন্তত কারাগারে না পাঠান। কারণ কারাগারে যাওয়া বিপ্লবীদের কাজ না - কারাগার খালি করা বিপ্লবীদের কাজ। সেই কাজ তারা করেছে। এখন পুরস্কার চাওয়াটা কি খুব বেশি?
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


