somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাশিয়াকে ড্রোন দিয়ে ইরান নিজে কি পেল ?

০৪ ঠা মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে একটা প্রশ্ন ঘুরেফিরে এসেছে — রাশিয়াকে ড্রোন দিয়ে ইরান আসলে কী পেল? ইরানের Shahed-136 ড্রোন ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করেছে, সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়েছে। রাশিয়া এখন পর্যন্ত ৫৭ হাজারেরও বেশি এই ড্রোন ইউক্রেনে ছুড়েছে। কিন্তু তেহরানে বসে যারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তারা কি একবারও ভেবেছিলেন এর শেষটা কোথায় গিয়ে ঠেকবে?

হিসাবটা মাথায় ছিল সহজ। রাশিয়া বড় শক্তি, তার সাথে থাকলে আমেরিকা সাহস করবে না। বিনিময়ে Su-35 যুদ্ধবিমান পাওয়া যাবে, সামরিক শক্তি বাড়বে। কিন্তু কাগজের হিসাব আর মাঠের বাস্তবতা কখনো এক হয় না। ইসরায়েল যখন ইরানের ভূখণ্ডে একের পর এক হামলা করেছে, মস্কো একটা কথাও বলেনি। প্রতিশ্রুত বিমান? সেগুলো আসেনি। রাশিয়া নিজেই এত সমস্যায় যে মিত্রকে সামলানোর ফুরসত নেই।

কিন্তু সবচেয়ে বড় ঘটনাটা ঘটেছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। আমেরিকা কয়েক বছর আগে একটা Shahed-136 ড্রোন হস্তগত করেছিল। সেটা reverse-engineer করে তারা LUCAS নামের নিজস্ব ড্রোন বানিয়ে ফেলেছে, যার দাম মাত্র ৩৫ হাজার ডলার। আর সেই ড্রোনই Operation Epic Fury-তে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। CENTCOM সরাসরি ঘোষণা দিয়েছে - "এই low-cost ড্রোনগুলো, যা ইরানের Shahed ড্রোনের আদলে তৈরি, এখন আমেরিকান প্রতিশোধ পৌঁছে দিচ্ছে।" ইরান যে অস্ত্র রাশিয়াকে দিয়েছিল, সেই একই নকশার অস্ত্র এখন ইরানের নিজের মাথায় পড়ছে। ইতিহাসে এরকম বিদ্রূপ খুব কমই দেখা গেছে।

অথচ একটু চারপাশে তাকালেই বোঝা যায় অন্যরা কত চালাকি করেছে। তুরস্কের কাছে বিশ্বমানের Bayraktar ড্রোন আছে। চীনের কাছে আরো উন্নত প্রযুক্তি। কিন্তু কেউ রাশিয়াকে এক টুকরো অস্ত্রও দেয়নি। তুরস্ক NATO সদস্য হয়েও রাশিয়ার সাথে ব্যবসা চালিয়ে গেছে, শস্য চুক্তির মধ্যস্থতা করেছে, দুই পক্ষের কাছেই দরকারি থেকেছে। চীন রাশিয়ার অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু এমনভাবে যে আঙুল তোলা কঠিন।

আর ভারতের কথা তো আলাদাভাবেই বলতে হয়। রাশিয়ার Rosneft থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ ব্যারেল তেল কেনার চুক্তি করেছে ভারত ; দুই দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ চুক্তি। কিন্তু এখানেই শেষ না। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ভারত ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় ডিজেল সরবরাহকারী দেশ হয়ে উঠেছে, মোট আমদানির ১৫.৫ শতাংশ একা ভারত থেকে আসছে। এর মানে হলো — ভারত একদিকে রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তায় তেল কিনছে, অন্যদিকে সেই তেল পরিশোধন করে ইউক্রেনের কাছেই বিক্রি করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুই পক্ষ থেকেই মুনাফা।

আমেরিকা টুঁ শব্দটি করেনি। কারণ একটাই : ভারতকে দরকার, চীনকে ঠেকাতে হলে ভারতকে কাছে রাখতে হবে। কিন্তু ইরানকে দরকার নেই। তাই ইরান ড্রোন দিতেই পশ্চিমের কাছে নতুন অজুহাত তৈরি হয়ে গেল। ইউরোপ যে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছিল, সেটা ঠান্ডা ঘরে ঢুকে গেল। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি নতুন নিষেধাজ্ঞার পক্ষে দাঁড়িয়ে গেল। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিয়ম কখনো সবার জন্য সমান না - নিয়ম তাদের জন্য যারা দরকারি।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, ইরান যেটা করেছে সেটা অন্যরাও করেছে - শুধু পার্থক্য হলো লুকিয়ে করেছে। চীনের microchip রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রে পাওয়া গেছে। তুরস্কের বন্দর দিয়ে নিষেধাজ্ঞার পণ্য গেছে। কিন্তু তারা কেউ স্বীকার করেনি, অস্বীকার করার সুযোগ রেখেছে। ইরান সেই সুযোগটাই রাখেনি। প্রকাশ্যে, সরাসরি ড্রোন দিয়ে নিজেকে সহজ টার্গেট বানিয়ে ফেলেছে।

শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়াল; রাশিয়া ড্রোন পেয়ে প্রযুক্তি শিখে নিল। আমেরিকা সেই ড্রোন copy করে ইরানের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করল। ইরান দাঁড়িয়ে রইল একা — না রাশিয়ার কাছ থেকে সুরক্ষা এলো, না পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক ঠিক হলো। যে যুদ্ধ ইরানের ছিল না, যে শত্রু ইরানের ছিল না, সেই যুদ্ধে নিজের সেরা অস্ত্র ঢেলে দিয়ে ইরান তিনটা জিনিস একসাথে হারিয়েছে : সামরিক সুবিধা, কূটনৈতিক সুযোগ, আর নৈতিক অবস্থান। ইউক্রেনের আকাশে যে ড্রোনগুলো উড়েছিল, সেগুলোর দাম শেষমেশ ইরানকেই গুনতে হচ্ছে - শুধু টাকায় না, নিজের মাটিতেও।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:০৫
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বৃষ্টি দিনের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৫



টিভি বা পত্রপত্রিকায় আবহাওয়া'র খবর নিয়ে নিউজ হয়-
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের পূর্বাভাস... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইন দ্যা শ্যাডোস অব ইল্যুশন

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৮



রাজধানীর নিঝুম আবাসিক এলাকার তিনতলা ফ্ল্যাটের শোবার ঘরটি তখন ক্রাইম সিন টেপে ঘেরা। ধুলো জমে থাকা এয়ার কন্ডিশনারের শব্দের মাঝে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে রক্তের হালকা সোঁদা গন্ধ।

পিবিআই ইনভেস্টিগেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

মস্তিষ্ক কাজ করার আগেই যখন উত্তর চলে আসে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০৭


মস্তিষ্ক কাজ করার আগেই যখন উত্তর চলে আসে

একসময় কোনো প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে মানুষকে ভাবতে হতো। বই খুলতে হতো, লাইব্রেরিতে যেতে হতো, কারও সঙ্গে আলোচনা করতে হতো, ভুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্বাবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ-পর্ব ৪

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:১৬


বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ: মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রেমিট্যান্স কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও টেকসই উন্নয়নের বিকল্প কৌশল
একটি অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ফিজিবিলিটি স্টাডি ।
একটি ধারাবাহিক গবেষনামুলক পোস্ট
[link|https://www.somewhereinblog.net/blog/ali2016/3039397|১ম পর্বে থাকা গবেষনাটির পটভুমির লিংক – পর্ব... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকারের ছয় মাসের পোস্টমর্টেম....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:১০



সরকারের ছয় মাসের পোস্টমর্টেমঃ সমর্থনের জায়গা থেকেই কিছু কঠিন কথা.....

ছয় মাস খুব দীর্ঘ সময় নয়- কিন্তু একটি সরকারের দিকনির্দেশনা, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার কিছুটা ধারণা পাওয়ার জন্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

×