
গত ১১ মার্চ শেরে বাংলানগরে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিসটেনসেনের বৈঠকটি বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতির এক জটিল সমীকরণ সামনে এনেছে। বৈঠকের পর যখন জানানো হলো যে ভারত যেভাবে রাশিয়ার তেল কেনার সুযোগ পেয়েছে, বাংলাদেশও ঠিক সেই একই সুযোগ পেতে ওয়াশিংটনে চিঠি পাঠাবে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলে বিতর্কের ঝড় ওঠে।
বিশেষ করে জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে যখন আজাদি বা সার্বভৌমত্বের জয়গান গাওয়া হচ্ছে, তখন জুলাই বিরোধীরা এই সুযোগে সরব হয়ে উঠেছে। তাদের দাবি, ড. ইউনূস আমেরিকার কাছে দেশ বিক্রির চুক্তি করে গিয়েছেন বলেই এখন বিএনপি সরকারকে রাশিয়ার তেল কেনার জন্য ওয়াশিংটনের অনুমতি নিতে হচ্ছে। কিন্তু এই রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে এক ভয়ংকর অর্থনৈতিক বাস্তবতা, যেখানে এই চিঠিটি আসলে কেবল তেলের জন্য নয়, বরং দেশের অস্তিত্ব রক্ষার এক মরিয়া চেষ্টা।
প্রথমে তেলের প্রসঙ্গটা বোঝা দরকার। আমেরিকা রাশিয়ার Rosneft ও Lukoil-কে ব্ল্যাকলিস্ট করার পর প্রায় ৪৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেলবাহী রাশিয়ান জাহাজ গন্তব্যহীন হয়ে সমুদ্রে ভাসছে। কেউ কিনছে না, কারণ কিনলে আমেরিকার রোষে পড়তে হবে। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট মাত্র ৩০ দিনের একটা অস্থায়ী ছাড় দিয়েছেন শুধু এই মুহূর্তে সমুদ্রে ভাসমান জাহাজগুলো থেকে কেনার জন্য, যা ৪ এপ্রিলের পর আর কাজে আসবে না। ভারত সেই সুযোগ পেয়েছে কারণ জামনগরে তাদের বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রিফাইনারি আছে; রাশিয়ার হেভি ক্রুড সেখানে প্রক্রিয়া করার পুরো সক্ষমতা আছে। ভারত কারো কাছে অনুমতি চায়নি, কোনো চিঠি লেখেনি—সুযোগটা দেখেছে এবং নিয়েছে।
বাংলাদেশও সেই একই তেলের কথা বলছে, কিন্তু এখানেই আসল সমস্যা। চট্টগ্রামে আমাদের ইস্টার্ন রিফাইনারি তৈরি হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের অ্যারাব লাইট ক্রুডের কথা মাথায় রেখে। রাশিয়ান ক্রুডে সালফার থাকে ৫,০০০ পিপিএম-এর বেশি, আর আমাদের নিয়ম মাত্র ৫০ পিপিএম পর্যন্ত। এই তেল জোর করে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ঢোকালে যন্ত্রপাতি নষ্ট হবে, আর সেই পরিশোধিত জ্বালানি গাড়িতে দিলে ঢাকার বাতাস বিষাক্ত হয়ে যাবে। অর্থাৎ আমেরিকা অনুমতি দিলেও আমরা এই তেল কারিগরি কারণে ব্যবহার করতে পারব না।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার আমেরিকা, অথচ সেখানে "Sanctioning Russia Act 2025" নামে একটা বিল আনা হয়েছিলো , যেখানে রাশিয়ার তেল কেনা দেশগুলোর ওপর ৫০০ শতাংশ ট্যারিফ আরোপের প্রস্তাব আছে। ভারত নিজের ভূ-রাজনৈতিক ওজন দিয়ে এই চাপ সামলাতে পারলেও বাংলাদেশ পারবে কি না তা বড় প্রশ্ন। তাহলে এত কষ্ট করে চিঠি লেখার কারণ কী?
এখানে পেমেন্টের প্রশ্নটা আরো জটিল। রাশিয়ার বেশিরভাগ বড় ব্যাংক সুইফট থেকে বাদ পড়েছে, তাই সরাসরি ডলার পাঠানো অসম্ভব। ভারত বছরের পর বছর ধরে নিজস্ব কাঠামো - ইউএই দিরহাম, চাইনিজ ইউয়ান বা সিঙ্গাপুরের ট্রেডিং কোম্পানির মাধ্যমে ঘুরিয়ে পেমেন্ট করার সিস্টেম তৈরি করেছে। বাংলাদেশের টাকার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নেই, ইউএই বা সিঙ্গাপুরে প্রতিষ্ঠিত নেটওয়ার্ক নেই, এমনকি ইউয়ানের চ্যানেলও নেই। তাহলে তেল কেনার অনুমতি পেলেও দাম মেটাব কীভাবে? এই প্রশ্নগুলো মাথায় রাখলে একটা ভিন্ন ছবি ভেসে ওঠে—এই চিঠিটা আসলে তেলের চিঠি নয়। কূটনৈতিক ভাষায় একে বলে ডিপ্লোম্যাটিক কভার লেটার। সামনে একটা মানবিক ও গ্রহণযোগ্য কারণ রাখো, কিন্তু ভেতরে আসল কথাটা বলো। আর সেই আসল কথাটা হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের ৯০ শতাংশ ঋণ দিয়েছে রাশিয়া, যা নিষেধাজ্ঞার কারণে তিন বছর পিছিয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসক্রো অ্যাকাউন্টে প্রায় ৮০৯ মিলিয়ন ডলার জমে আছে, কিন্তু পাঠানোর রাস্তা বন্ধ। সোনালী ব্যাংক সরাসরি সতর্ক করেছে যে, এই লেনদেন করলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর সাথে সম্পর্ক নষ্ট হবে। ফলে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা সুদ জমছে এবং তিন বছরে শুধু বিলম্বের কারণে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার গচ্চা গেছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু না হওয়ায় বাড়তি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে এবং সেখানে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
অর্থাৎ তিন দিক থেকে একসাথে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার সরাসরি বলতে পারছে না যে রাশিয়াকে ডলার পাঠাতে দিন, কারণ তাতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিপদ আছে। কিন্তু ভংগুর দেশের মানুষের জন্য সস্তা তেল দরকার- এটা শুনতে অনেক বেশি মানবিক ও গ্রহণযোগ্য। চিঠির ভেতরে যদি কোথাও "energy transactions" বা "Rosatom" শব্দ খুঁজে পাওয়া যায়, তবে বোঝা যাবে এটা তেলের চিঠি নয়, এটা আসলে রূপপুরের চিঠি; তেলটা শুধু একটা মোড়ক মাত্র।
তাহলে এই পুরো উদ্যোগটাকে কীভাবে দেখব? ব্রিলিয়ান্ট কূটনীতি নাকি ডেসপারেট পদক্ষেপ? ব্রিলিয়ান্ট কূটনীতি তখনই হয় যখন বিকল্প থাকে, কিন্তু বাংলাদেশ অনুমতি চাইছে কারণ আমাদের কোনো বিকল্প নেই। একটা চিঠিতে হয়তো জনগণের কাছে সস্তা তেলের বার্তা দেওয়া এবং রূপপুরের পেমেন্ট চ্যানেল খোলার চেষ্টা—দুটো কাজ একসাথে করার চেষ্টা হচ্ছে। এটা যদি সচেতনভাবে করা হয়ে থাকে তবে কৌশলটা মন্দ নয়, কিন্তু বাস্তবে এটা সম্ভবত ৩০ ভাগ কৌশল আর ৭০ ভাগ চাপে পড়া সিদ্ধান্ত।
মন্ত্রী যুদ্ধ স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি বা দীর্ঘস্থায়ী- এই তিন পরিস্থিতির পরিকল্পনার কথা বললেও বাস্তবে বিষয়টা অনেক বেশি জটিল। কারণ প্রতিটি পরিস্থিতির জন্য আলাদা জ্বালানি কৌশল দরকার হয়, যেখানে তেল আনার পথ , টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা , তেল শোধনের ক্ষমতা এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক- এই প্রতিটি ধাপ নিখুঁতভাবে সাজাতে হয়। কিন্তু এই বৈঠকের বিবরণে এমন কোনো বিস্তারিত বা টেকসই পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
শেষ পর্যন্ত এই ঘটনাটি এক সহজ সত্য সামনে নিয়ে আসে যে, বাংলাদেশ জ্বালানি নিরাপত্তার দিক থেকে এখনো একটি রিঅ্যাক্টিভ দেশ—সংকট এলে প্রতিক্রিয়া দেখায়, আগে থেকে কাঠামো তৈরি রাখে না। রিফাইনারি পুরনো, বিকল্প পেমেন্ট চ্যানেল নেই, নিজস্ব কোনো স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ নেই। রূপপুরের ঋণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকায় সরবরাহ বিঘ্নিত হলে আমাদের প্রতিবেশীর কাছে হাত পাততে হয় বা পরাশক্তির কাছে অনুমতি চাইতে হয়। এই বৈঠকটা সেই বাস্তবতারই দৃশ্য-একটা ওয়েভার চাওয়া হয়েছে এবং আমরা উত্তরের অপেক্ষায় আছি। কিন্তু উত্তর যাই আসুক, আসল লড়াইটা রূপপুরের পেমেন্ট চ্যানেল খোলা নিয়েই থেকে যাবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: উপরের ফটোকার্ডটি কোনো আওয়ামী পান্ডার বানানো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

