somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঈদের আগের রাতে দুই মোল্লার কথোপকথন ( (কাল্পনিক)

২২ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১২:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


এশার নামাজ শেষ হয়েছে বেশিক্ষণ হয়নি। মসজিদের ভেতর রফিকুল্লাহ সাহেব একা বসে আছেন। বয়স বাষট্টি। হাতের তসবিটা নাড়ছেন, কিন্তু গোনা হচ্ছে না আসলে। চোখ গেছে দূরে—বাজারে আলো জ্বলছে, রিকশার ভিড়, দোকানের সামনে মানুষের ঠেলাঠেলি। ঈদের আগের রাত। এই রাতটা কতবার দেখেছেন তিনি! একটু পরে ইমরান এসে পাশে বসল। বয়স পঁয়ত্রিশ, মদিনায় পড়েছে কয়েক বছর। ইউটিউবে চ্যানেল আছে, লক্ষের বেশি লোক দেখে। লোকে বলে আধুনিক আলেম—কথাটা তার নিজের কাছেই একটু বেমানান লাগে।

দুজনেই চুপ করে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। মহল্লার কোথাও কেউ তাকবির দিচ্ছে, বাচ্চারা চিৎকার করছে। আকাশে ঈদের চাঁদ উঠেছে। রফিকুল্লাহ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "এই যে মানুষ ছুটছে কাপড় কিনতে—ঠিক হচ্ছে কি?" ইমরান শান্ত স্বরে বলল, "নবীজি নিজে সুন্দর পোশাক পরতেন ঈদে। উমর (রা.) বাজারে গিয়েছিলেন পোশাকের জন্য, নবীজি তাকে থামাননি। পোশাক কেনাটা সমস্যা না, হুজুর।"

রফিকুল্লাহ সাহেব ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, "সমস্যা কী তাহলে?" ইমরান উত্তর দিল, "নিয়ত আর পরিমাণ।"

রফিকুল্লাহ সাহেব একটু থামলেন। তারপর ভেতরের কষ্টটা প্রকাশ করলেন, "আমার পাশের বাড়িতে রহিমার মা থাকেন। ছেলেটা গার্মেন্টসে কাজ করত, ঈদের আগে ছাঁটাই হয়েছে। ওই বাড়িতে বাচ্চার জন্য একটা নতুন জামাও নেই। আর এই পাড়ার মানুষ পাঁচ হাজার টাকার পাঞ্জাবি কিনছে।" ইমরান কিছু বলল না। এই কথার জবাব আসলে যুক্তি দিয়ে হয় না।

খানিক নীরবতার পর ইমরান বলল, "হুজুর, রহিমার মায়ের কথাটা সত্যি। এটা আমাদের ব্যর্থতা। কিন্তু আরেকটা দিকও আমাদের ভাবতে হবে—ঈদে যে কোটি কোটি টাকার কাপড় বিক্রি হয়, সেই টাকায় চলে গার্মেন্টসের মেয়েটা, পুরান ঢাকার দর্জি, মানিকগঞ্জের তাঁতি। তাদের সারা বছরের আয়ের বড় একটা অংশ আসে এই সময়ে। ইসলাম কখনো বলেনি অর্থনীতি থামিয়ে দাও।" রফিকুল্লাহ সাহেব এভাবে ভাবেননি কখনো। একটু অস্বস্তি হলো, কিন্তু মুখে কিছু বললেন না।

প্রসঙ্গ পাল্টে তিনি বললেন, "আচ্ছা, ঈদগাহের মিম্বারের কথা বলো। এটা কি সুন্নাহর খেলাফ না?" ইমরান স্বীকার করল, "হ্যাঁ হুজুর। নবীজি ঈদের মাঠে মিম্বার নিয়ে যেতেন না। এটা তাঁর সচেতন পছন্দ ছিল।" রফিকুল্লাহ সাহেব যেন কিছুটা স্বস্তি পেলেন, "তাহলে স্বীকার করছ?"

ইমরান বুঝিয়ে বলল, "করছি। কিন্তু সুন্নাহর খেলাফ আর বিদআত এক কথা না। বিদআত হয় যখন কোনো কাজকে ইবাদত মনে করা হয়, অথচ দ্বীনে তার কোনো ভিত্তি নেই। মিম্বার কেউ ইবাদত মনে করে রাখে না।" রফিকুল্লাহ সাহেব চুপ করে রইলেন। একটু পরে জিগ্যেস করলেন, "কাল তাকবির কয়টা দেবে?"

ইমরান একটু হেসে বলল, "এই মসজিদে হানাফি মাজহাব, তাই ছয়টা অতিরিক্ত। আমি শাফেয়ী মতে পড়লে বারোটা হতো। দুটোই সহিহ হাদিসে আছে। চোদ্দশো বছর ধরে আলেমরা একমত হননি—আমরা দুজনও একমত হতে পারব না।" রফিকুল্লাহ সাহেব একটু থমকে গেলেন। ভেবেছিলেন ছেলেটা হয়তো বলবে বারোটাই সঠিক। কিন্তু সে যখন বলল দুটোই সহিহ, তখন প্রবীণ মানুষটির জেদ কমে গেল।

তবুও তিনি সাবধান করে দিলেন, "ইমরান, আমি বুঝি তুমি কী বলতে চাও। কিন্তু একটু একটু করে ছাড় দিতে দিতে একদিন দেখব মূলটাই নেই। সুবিধার যুক্তি দিয়েই তো সব কিছু ঢোকানো যায়।" ইমরান এই কথাটা উড়িয়ে দিতে পারল না। ইতিহাস সাক্ষী-এভাবেই অনেক কিছু হারিয়ে গেছে। সে বিষণ্ণ সুরে বলল, "হুজুর, আপনি ঠিকই বলছেন। কিন্তু সমাধান কী? সব কিছু বিদআত বলে বন্ধ করলে মানুষ দ্বীন থেকে মুখ ফেরাবে। আবার সব কিছুতে ছাড় দিলে দ্বীনের আকৃতি থাকবে না। মাঝখানের রাস্তাটা বড় সরু।"

দূরে আতশবাজি ফুটল। আকাশে আলো উঠল, তারপর মিলিয়ে গেল। দুজন আর কিছু বললেন না। রফিকুল্লাহ সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তসবিটা হাতে নিয়ে বিদায় জানালেন, "তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম।" ইমরান প্রতিউত্তরে বলল, "ঈদ মোবারক, হুজুর।" রফিকুল্লাহ সাহেব দুই পা সামনে এগিয়ে হটাত থেমে গেলেন। পেছন ফিরে বললেন, "কাল নামাজের পর রহিমার মায়ের বাড়িতে যাবে আমার সাথে?"ইমরান বিনয়ের সাথে বলল, "যাব।" রফিকুল্লাহ সাহেব আর কিছু না বলে মসজিদ থেকে বেরিয়ে গেলেন।

সর্বশেষ এডিট : ২২ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১২:২৯
১৫টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সামুর ব্লগারদের পোস্ট নিয়ে একটা সংকলন বের করতে চাই

লিখেছেন ডার্ক ম্যান, ০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:৫১

আমি একটা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান চালু করতে চাচ্ছি। তাই আমার প্রত্যাশা প্রথম বইটা হবে সামুর ব্লগারদের পোস্ট সংকলন।
আপনারা যদি চান, তাহলে আপনাদের লেখা যেকোনো প্রিয় পোস্ট সেখানে দিতে পারেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছায়ার মোনাজাত

লিখেছেন কাবিল, ০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:৫১



ফজরের আগের সেই নীরব সময়টা—যখন আকাশ আর জমিনের মাঝে এক অদৃশ্য দরজা খুলে যায়।
আমি ওযু করে নামাজের জন্য দাঁড়ালাম। চারপাশে এমন নীরবতা, যেন পৃথিবীটা কারো গভীর চিন্তার মধ্যে ডুবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনু কবিতা

লিখেছেন সামিয়া, ০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৫১



(১)
গল্প স্বল্প আড্ডার ভেতর
ডাকে পুরোনো দিন,
বিষন্ন স্মৃতির পাতা
ক্লান্ত বিলীন।

(২)
শোকের ধুলো জানালাতে,
বসে থাকে রোদ না মেখে,
হারিয়ে গেলো কারো মুখ
ভুল ঠিকানায় নাম লিখে।

(৩)
চায়ের ধোঁয়ায় মুখ লুকিয়ে
একাকী নিরালায়,
গল্প শেষেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন 2026 : BJP কি জিততে চলেছে ?

লিখেছেন গেছো দাদা, ০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৪৫

আসন্ন বিধান সভা নির্বাচনে(2026) কি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে BJP জিততে চলেছে?
আসুন জেনে নিই প্রকৃত সম্ভাব্য রেজাল্ট।
রাজ্য সরকারের IB এবং মোদী সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র অনুসারে,কোন দল কত আসন পেতে পারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা যে আসলে কী চাই, নিজেরাও জানি না

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:৫৬



কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই একটাই দৃশ্য—হতাশার গল্প আর সমালোচনার স্রোত। বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন সাহেবকে নিয়ে নানামুখী আলোচনা বেশ জমে উঠেছে। ক্ষমতায় আসার দুই মাসও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×